প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনে বড় ধরনের চমক হিসেবে উঠে এসেছেন সিলেট অঞ্চলের দুই নারী নেতৃত্ব। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও মাঠপর্যায়ের সক্রিয়তার স্বীকৃতি হিসেবে মোসাম্মৎ শাম্মী আক্তার এবং নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বে ব্যারিস্টার জহরত আদিব চৌধুরী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য হতে যাচ্ছেন। দলীয় মনোনয়ন প্রক্রিয়া ও আইনি জটিলতার পর শেষ পর্যন্ত ৪৯ জন প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ হওয়ায় তারা সবাই বিনা ভোটে নির্বাচিত হওয়ার পথে রয়েছেন।
নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সংরক্ষিত নারী আসনের তফসিল অনুযায়ী প্রার্থিতা প্রত্যাহারের নির্ধারিত সময় শেষ হলেও কোনো প্রার্থীই মনোনয়ন প্রত্যাহার করেননি। ফলে নির্ধারিত আসনের সমান সংখ্যক প্রার্থী থাকায় ভোটের প্রয়োজন হয়নি। আইন অনুযায়ী, এ প্রার্থীদের বেসরকারিভাবে বিজয়ী ঘোষণা করে বৃহস্পতিবার গেজেট প্রকাশ করা হবে।
নতুন এই তালিকায় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সিলেটের শাম্মী আক্তার ও ব্যারিস্টার জহরত আদিব চৌধুরী। রাজনৈতিক মহল বলছে, একদিকে অভিজ্ঞ রাজনৈতিক কর্মীর উত্থান, অন্যদিকে কর্পোরেট ও আইন অঙ্গনের নতুন মুখের প্রবেশ—এই দুইয়ের সমন্বয়ই এবার সংরক্ষিত নারী আসনের নতুন রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, মোসাম্মৎ শাম্মী আক্তার দীর্ঘদিন ধরে রাজপথের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তিনি এর আগে হবিগঞ্জ-৪ (মাধবপুর–চুনারুঘাট) আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। তবে সরাসরি নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন না পেলেও তিনি দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা রেখে নেতৃত্বের আস্থা অর্জন করেন। বিশেষ করে রাজনৈতিক সংকটকালীন সময়ে মাঠপর্যায়ে তার সক্রিয় অবস্থান দলীয় সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে বলে জানা গেছে। শেষ পর্যন্ত সেই অভিজ্ঞতা ও দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পৃক্ততাকে বিবেচনায় নিয়ে তাকে সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, ব্যারিস্টার জহরত আদিব চৌধুরীকে ঘিরে রয়েছে ভিন্নধর্মী এক রাজনৈতিক আগমন। তিনি মূলত আন্তর্জাতিক কর্পোরেট আইন অঙ্গনের পরিচিত মুখ। আইন পেশার পাশাপাশি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। পারিবারিকভাবে তিনি প্রয়াত আইনজীবী অ্যাডভোকেট এবাদুর রহমান চৌধুরীর কন্যা, যা তার রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে একটি ঐতিহ্যগত যোগসূত্র তৈরি করেছে। প্রথমবারের মতো সরাসরি জাতীয় সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিসরে যুক্ত হয়ে তিনি নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করবেন বলে দলীয় নেতারা মনে করছেন।
সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনে মোট ৫০টি আসনের মধ্যে ৪৯টি আসনে প্রার্থিতা বৈধ হওয়ায় কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়নি। নির্বাচন কমিশনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. মঈন উদ্দীন খান জানিয়েছেন, আইন অনুযায়ী নির্ধারিত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেই গেজেট প্রকাশ করা হবে। তিনি বলেন, প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর কোনো প্রত্যাহার না থাকায় এবং আসনের সমান সংখ্যক প্রার্থী থাকায় ভোটের প্রয়োজন হয়নি। ফলে নির্বাচন আইন অনুসারে তারা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারিভাবে নির্বাচিত ৪৯ জনের নাম, ঠিকানা ও বিস্তারিত তথ্যসহ গেজেট প্রকাশ করা হবে। গেজেট প্রকাশের পর সংসদ সচিবালয়ে পাঠানো হবে, যেখানে শপথ গ্রহণের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, পুরো প্রক্রিয়া আইনি কাঠামোর মধ্যেই স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সংরক্ষিত নারী আসনের এই নির্বাচনে দলীয় সমীকরণ এবং জোটগত হিসাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ক্ষমতাসীন জোট ও তাদের মিত্ররা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পাওয়ায় রাজনৈতিক ভারসাম্য তাদের পক্ষেই গেছে। সূত্র অনুযায়ী, বিএনপি জোট ও তাদের মিত্ররা ৩৬টি আসন, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপ) জোট ১২টি আসন এবং একটি আসন স্বতন্ত্র প্রার্থীর জন্য নির্ধারিত হয়েছে।
এদিকে এনসিপির প্রার্থী নুসরাত তাবাসসুমের মনোনয়ন নিয়ে আদালতে চলমান রিটের বিষয়েও নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী বিষয়টি ৭২ ঘণ্টার মধ্যে নিষ্পত্তি করার কাজ চলছে। রিটার্নিং কর্মকর্তা জানান, আদালতের নির্দেশের পর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে এবং আইনগতভাবে সমাধান দেওয়া হবে।
মনোনয়ন বাতিল হওয়া আরেক প্রার্থী মনিরা শারমিনের বিষয়ে আপিলের কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য এখনো কমিশনের কাছে পৌঁছায়নি বলেও জানান তিনি। ফলে পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে।
রাজনৈতিক মহলে এই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ এটিকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ মনে করছেন এতে প্রতিযোগিতামূলক গণতান্ত্রিক চর্চার সুযোগ সীমিত হয়েছে। তবে দলীয় নেতারা বলছেন, সংরক্ষিত নারী আসনের উদ্দেশ্যই হলো নারীদের নেতৃত্বের সুযোগ তৈরি করা, এবং এই নির্বাচন সেই লক্ষ্য পূরণে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
সিলেটের রাজনৈতিক অঙ্গনে শাম্মী আক্তার ও জহরত আদিব চৌধুরীর নাম ঘিরে ইতোমধ্যেই নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা বলছেন, অভিজ্ঞতা ও নতুন প্রজন্মের সমন্বয় ভবিষ্যতের রাজনীতিতে নতুন গতিপথ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে নারী নেতৃত্বের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ক্ষেত্রে এই নির্বাচনকে একটি ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে সংরক্ষিত নারী আসনের এই নির্বাচন শুধু সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়, বরং রাজনৈতিক বাস্তবতার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এখন গেজেট প্রকাশ ও শপথ গ্রহণের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন সংসদ সদস্যদের যাত্রা শুরু হবে, যেখানে সিলেটের দুই নারী প্রতিনিধি কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক পরিসরে নতুন ভূমিকা রাখবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

