প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
হবিগঞ্জের হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ বোরো ধানের ক্ষেত। এক অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে প্রায় ২ হাজার ৭১০ হেক্টর জমির পাকা ধান পানির নিচে চলে গেছে, যার ফলে দেড় হাজারের বেশি কৃষক সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়েছেন। কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ১০ হাজার ৮৪০ মেট্রিক টন ধান এখন পানির নিচে তলিয়ে রয়েছে, যা কৃষকের সারা বছরের স্বপ্ন ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
হাওরাঞ্চলের এই দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বানিয়াচং উপজেলার ভাবনা হাওর এলাকা। সেখানে হাজারো কৃষক পাকা ধান ঘরে তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু টানা বৃষ্টি ও হঠাৎ পানি বৃদ্ধির কারণে জমির ফসল আর রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। একদিনের ব্যবধানে বহু কৃষকের চোখের সামনে সবুজ সোনালি ধানক্ষেত পরিণত হয়েছে পানির নিচে ডুবে থাকা নিঃশব্দ এক দৃশ্যে।
বানিয়াচংয়ের ভাবনা হাওরের কৃষক ঈমানী মিয়ার গল্প এখন এই দুর্যোগের প্রতীক হয়ে উঠেছে। তিনি ২৪ বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন। সার, বীজ, সেচ ও পরিচর্যায় তার প্রায় ২ লাখ টাকা খরচ হয়েছিল। পরিবারের স্বপ্ন ছিল এই ফসল বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ ও সংসারের খরচ মেটানো। কিন্তু আগাম বন্যায় পুরো জমি তলিয়ে যাওয়ায় এক মুঠো ধানও ঘরে তুলতে পারেননি তিনি। কৃষকের ভাষায়, প্রায় ৮০০ মণ ধান পাওয়ার আশা ছিল, যার বাজারমূল্য প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা হতে পারত।
সব হারিয়ে এখন দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে ঈমানী মিয়ার ১০ সদস্যের পরিবারে। তিনি জানান, শুধু নিজের জমিই নয়, পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও এই ফসলের ওপর নির্ভর করছিল। তার কণ্ঠে এখন শুধু হতাশা আর ঋণের বোঝার চাপ। একই হাওরে শাহাবুদ্দিন, মুহিত মিয়া, কবির মিয়া ও ফজল মিয়ার ক্ষেতেও একই চিত্র দেখা গেছে। তাদের ক্ষেতের পাকা ধানও সম্পূর্ণভাবে পানির নিচে চলে গেছে।
স্থানীয় সূত্র বলছে, কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি এবং পাহাড়ি ঢলের কারণে হাওরের পানি দ্রুত বেড়ে যায়। ফলে যেসব জমিতে ধান কাটা প্রায় শেষ পর্যায়ে ছিল, সেগুলোও হঠাৎ পানির নিচে তলিয়ে যায়। অনেক কৃষক দ্রুত ধান কাটার চেষ্টা করলেও পানি ও কাদা মিশ্রিত অবস্থার কারণে তা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, শুধু বানিয়াচং উপজেলাতেই প্রায় ১ হাজার ৪০০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার পরিমাণ প্রায় ৫ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন ধান। এই এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা প্রায় এক হাজারে পৌঁছেছে। মাঠপর্যায়ে অনেক কৃষকই এখনো ধান কাটার চেষ্টা করছেন, তবে তা খরচসাপেক্ষ এবং লাভের চেয়ে লোকসান বেশি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
বানিয়াচং উপজেলার দক্ষিণ-পূর্ব ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য শাহেদ আলী জানান, এ বছর ধানের গড় ৭০ শতাংশ ইতোমধ্যে পেকে গিয়েছিল। কয়েকদিন আগেও হাওরের দৃশ্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। কৃষকেরা হাসিমুখে মাঠে কাজ করছিলেন, এখন সেই দৃশ্য বদলে গেছে। পানির নিচে পড়ে থাকা ফসল এখন শুধু ক্ষতির হিসাব বাড়াচ্ছে।
একই এলাকার কৃষক পরিবারের সদস্য কলেজছাত্র দেলোয়ার হোসেন রাজু জানান, মাত্র দুই দিনের পানিতে ধান নষ্ট হয়ে গেছে। কেউ কেউ ঝুঁকি নিয়ে ধান কাটার চেষ্টা করছেন, কিন্তু শ্রমিক ও পরিবহন খরচ বেশি হওয়ায় শেষ পর্যন্ত লোকসানই বাড়ছে।
এদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, হবিগঞ্জ জেলায় এ বছর মোট ১ লাখ ২৩ হাজার ৬৪৪ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল প্রায় ৭ লাখ ৯৪ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন ধান। তবে হাওরের এই আকস্মিক বন্যা সেই লক্ষ্যমাত্রাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
কৃষি বিভাগের অতিরিক্ত উপপরিচালক দীপক কুমার জানিয়েছেন, এখনও জেলায় মোট আবাদকৃত ধানের প্রায় ৪৯ শতাংশ কাটা বাকি রয়েছে। আবহাওয়া পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তিনি জানান, মাঠপর্যায়ে কৃষকদের দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
হাওরাঞ্চলের কৃষকরা বলছেন, প্রতি বছরই তারা প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে ফসল ঘরে তোলেন। কখনো অকাল বৃষ্টি, কখনো পাহাড়ি ঢল, আবার কখনো শ্রমিক সংকট—সব মিলিয়ে এই অঞ্চলের কৃষি সবসময়ই ঝুঁকির মধ্যে থাকে। তবুও তারা আশা নিয়ে বোরো ধান আবাদ করেন, কারণ এই একটি ফসলই তাদের সারা বছরের জীবিকা।
এই দুর্যোগে অনেক কৃষক এখন ঋণের বোঝায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। কেউ বেসরকারি ঋণ নিয়েছেন, কেউ এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছেন, আবার কেউ আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার করে কৃষিকাজ চালিয়েছেন। ফসল হারিয়ে এখন তাদের সামনে ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, হাওরের কৃষি রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অত্যন্ত জরুরি। শুধু ফসল কাটার মৌসুমে নয়, সারা বছর ধরে পানি ব্যবস্থাপনা, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং টেকসই বাঁধ নির্মাণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। নইলে প্রতি বছরই একই ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে কৃষকরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হাওরাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি এখন আরও অনিয়মিত ও অপ্রত্যাশিত হয়ে উঠছে। ফলে কৃষকদের জন্য ঝুঁকি বাড়ছে বহুগুণে। এই বাস্তবতায় প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি ব্যবস্থাপনা, দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান এবং মাঠপর্যায়ের সমন্বয় আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে হবিগঞ্জের হাওরে এই আগাম বন্যা শুধু ফসলহানি নয়, হাজারো কৃষকের জীবনে এক গভীর অনিশ্চয়তার ছায়া ফেলেছে। সারা বছরের কষ্টের ফল পানির নিচে হারিয়ে যাওয়ায় এখন কৃষকের চোখে শুধু হতাশা, আর অপেক্ষা—কবে আবার নতুন করে ঘুরে দাঁড়াবে হাওরের জীবন।


