প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর পর্যটন ও খনিজ সম্পদসমৃদ্ধ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকাকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবে ঘোষণা করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাদাপাথর, শাহ আরেফিন টিলা এবং সিলেটের আরও কয়েকটি স্পর্শকাতর অঞ্চলকে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মনে করছে, এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিন ধরে চলা বালু ও পাথর লুটপাট বন্ধ করা সম্ভব হবে এবং ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার হবে এসব এলাকার পরিবেশগত ভারসাম্য।
প্রস্তাবিত ইসিএ তালিকায় সাদাপাথর ও শাহ আরেফিন টিলার পাশাপাশি আরও যে অঞ্চলগুলো রয়েছে সেগুলো হলো রতনপুর, উত্তমছড়া, লোভাছড়া, শ্রীপুর ও লালাখাল। এসব এলাকাই মূলত সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে পরিচিত হলেও দীর্ঘদিন ধরে অবাধ বালু ও পাথর উত্তোলনের কারণে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত সাদাপাথর ও লালাখালের মতো স্থানগুলোতে অনিয়ন্ত্রিত উত্তোলনের ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, ভূ-প্রাকৃতিক গঠন এবং জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবিদদের মতে, বছরের পর বছর ধরে অবৈধভাবে বালু ও পাথর উত্তোলনের ফলে এসব এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য প্রায় ধ্বংসের পথে। এক সময় যে স্থানগুলো ছিল স্বচ্ছ পানির প্রবাহ ও সাদা পাথরের বিছানায় ভরা, সেখানে এখন বড় বড় গর্ত, ভাঙা ভূমি এবং ক্ষতবিক্ষত নদীপথ দেখা যাচ্ছে। শাহ আরেফিন টিলার মতো ঐতিহাসিক প্রাকৃতিক গঠনও অব্যাহত খনন ও লুটপাটে প্রায় বিলীন হয়ে গেছে বলে দাবি তাদের।
সরকারি উদ্যোগ অনুযায়ী, ইসিএ ঘোষণা করা হলে এসব এলাকায় বালু-পাথর উত্তোলন, যান্ত্রিক খনন, পরিবেশ ধ্বংসকারী শিল্প স্থাপন এবং ভূমির প্রাকৃতিক গঠন পরিবর্তনকারী কার্যক্রম কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ বা নিষিদ্ধ থাকবে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ অনুযায়ী পরিবেশ অধিদপ্তর এই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে এবং বর্তমানে দেশে মোট ১৩টি এলাকা ইসিএ হিসেবে ঘোষিত রয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেট বিভাগীয় পরিচালক আবুল কালাম আজাদ জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত এলাকাগুলোর প্রাকৃতিক সম্পদ ও পরিবেশগত গুরুত্ব মূল্যায়নের জন্য একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে কারিগরি প্রতিবেদন তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর ইসিএ ঘোষণার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। তিনি জানান, এই উদ্যোগের লক্ষ্য শুধু সৌন্দর্য রক্ষা নয়, বরং পরিবেশগত টেকসইতা নিশ্চিত করা।
তবে পরিবেশ আন্দোলনকারীরা বলছেন, কেবল ইসিএ ঘোষণা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, ঘোষণা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর বাস্তবায়ন ও নজরদারির অভাবে অবৈধ কার্যক্রম অব্যাহত থেকেছে। তারা মনে করেন, প্রশাসনিক নজরদারি, আইন প্রয়োগ এবং স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া এসব এলাকা রক্ষা করা কঠিন হবে।
এর আগে ২০১৫ সালে সিলেটের আরেক গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র জাফলংকে ইসিএ ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতায় সেখানে এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। অবৈধভাবে বালু-পাথর উত্তোলনের অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে, যা পরিবেশ রক্ষার প্রচেষ্টাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে সরকার সিলেটের বিভিন্ন কোয়ারি থেকে পাথর ও বালু উত্তোলন বন্ধের নির্দেশ দিলেও বাস্তবে তা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। বৈধ উত্তোলন বন্ধ থাকলেও অবৈধভাবে লুটপাট অব্যাহত ছিল বিভিন্ন সময়ে। বিশেষ করে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে এসেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সাদাপাথর এলাকায় ব্যাপক পাথর লুটপাটের ঘটনা দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়। একসময় পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু এই এলাকা ধীরে ধীরে প্রায় পাথরশূন্য হয়ে পড়ে। ধলাই নদীর উৎসমুখ হিসেবে পরিচিত এই স্থানটি এখন ক্ষতবিক্ষত ভূ-প্রকৃতির এক নিঃশব্দ সাক্ষী।
পরিবেশ ও ভূ-প্রাকৃতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের অনিয়ন্ত্রিত উত্তোলন শুধু সৌন্দর্যই ধ্বংস করছে না, বরং নদীর গতিপথ পরিবর্তন, ভূমিধস এবং জীববৈচিত্র্যের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে। তারা সতর্ক করে বলছেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে সিলেটের হাওর ও পাহাড়ি অঞ্চলের পরিবেশ ভয়াবহ সংকটে পড়তে পারে।
আইনি দিক থেকেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। হাইকোর্ট ২০১৪ সালে এক রিট আবেদনের পর সিলেটের পাথর কোয়ারি থেকে যান্ত্রিক উপায়ে পাথর উত্তোলন নিষিদ্ধ করে। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের আগস্টে আবারও হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চায় কেন এসব এলাকায় ধ্বংসাত্মক পাথর উত্তোলন বন্ধে ব্যর্থতাকে অবৈধ ঘোষণা করা হবে না এবং কেন এসব এলাকা ইসিএ হিসেবে ঘোষণা করা হবে না।
শাহ আরেফিন টিলার বর্তমান পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। স্থানীয় সূত্র বলছে, এক সময় যেখানে দুটি বড় টিলা ছিল, সেখানে দীর্ঘদিনের অবৈধ উত্তোলনের কারণে এখন আর সেই উচ্চভূমির অস্তিত্ব নেই। বরং সেখানে গভীর গর্ত ও অনিয়ন্ত্রিত খননচিহ্ন ছড়িয়ে রয়েছে। একই ধরনের পরিস্থিতি লোভাছড়া, উত্তমছড়া ও অন্যান্য এলাকাতেও দেখা যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সিলেটের এই প্রাকৃতিক সম্পদগুলো শুধু স্থানীয় নয়, জাতীয় পর্যটন ও পরিবেশের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এগুলো রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি ও কঠোর পরিকল্পনা প্রয়োজন। ইসিএ ঘোষণা সেই পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও এর সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর।
এদিকে সরকার বলছে, জাতীয় উন্নয়ন ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন মূল লক্ষ্য। পাথর উত্তোলন নিয়ে একদিকে রয়েছে অর্থনৈতিক ও শ্রমিক নির্ভরতার বিষয়, অন্যদিকে রয়েছে পরিবেশগত সংকট। এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় করেই ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে সিলেটের ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ইসিএ ঘোষণার উদ্যোগকে পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এই উদ্যোগ কতটা বাস্তবায়িত হবে এবং কতটা কার্যকরভাবে এসব প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব হবে, তা সময়ই বলে দেবে।


