প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মৌলভীবাজারের রাজনগরে ২০২৫ সালের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ ও জিপিএ-৪ প্রাপ্ত কৃতি শিক্ষার্থীদের সম্মাননা ও বৃত্তি প্রদান অনুষ্ঠানে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। শিক্ষার্থীদের অর্জনকে স্বীকৃতি দিতে এবং ভবিষ্যতে আরও ভালো ফলাফলের অনুপ্রেরণা জোগাতে আয়োজিত এ অনুষ্ঠান এক মিলনমেলায় পরিণত হয় শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে। বুধবার (২৯ এপ্রিল) উপজেলা মাল্টিপারপাস হল রুমে হীড বাংলাদেশ, রাজনগর ও সিলেট আঞ্চলিক শাখার উদ্যোগে এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে মোট ১১৫ জন কৃতি শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। এর মধ্যে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ ও জিপিএ-৪ প্রাপ্ত ৭৩ জন এবং এইচএসসি পরীক্ষায় ৩৯ জন শিক্ষার্থীকে নগদ অর্থ, সম্মাননা ক্রেস্ট ও শুভেচ্ছা স্মারক প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের মুখে ছিল আনন্দের হাসি, আর অভিভাবকদের চোখেমুখে ছিল সন্তানের সাফল্যের গর্ব।
রাজনগর উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে আগত শিক্ষার্থীরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন। কেউ প্রথমবারের মতো বড় কোনো মঞ্চে সম্মাননা পেলেন, কেউবা নিজের দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের স্বীকৃতি হাতে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। আয়োজকরা জানান, শিক্ষার্থীদের শুধু ফলাফলের জন্য নয়, তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানো এবং উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করাই এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য।
হীড বাংলাদেশ উপ-আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক (সিলেট অঞ্চল) মো. আল আমিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিপুল সিকদার। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, “আজকের মেধাবীরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়বে। তাদের সঠিক দিকনির্দেশনা, নৈতিক শিক্ষা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে তারা দেশকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।”
তিনি আরও বলেন, বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে শুধু ভালো ফলাফল করলেই হবে না, শিক্ষার্থীদের মানবিক গুণাবলি, সামাজিক মূল্যবোধ ও নৈতিক চেতনায়ও সমৃদ্ধ হতে হবে। একজন প্রকৃত শিক্ষিত মানুষ কেবল নিজের উন্নতি নয়, সমাজ ও দেশের কল্যাণেও কাজ করেন। তাই শিক্ষার্থীদের জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি সৎ, দায়িত্বশীল ও মানবিক নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার আহ্বান জানান তিনি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অভিভাবক ও শিক্ষকদের ভূমিকাকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, একজন শিক্ষার্থীর সাফল্যের পেছনে পরিবারের উৎসাহ, শিক্ষকদের আন্তরিকতা এবং সামাজিক পরিবেশের বড় ভূমিকা থাকে। সন্তানদের শুধু পরীক্ষায় ভালো ফলের জন্য চাপ না দিয়ে তাদের মানসিক বিকাশ ও সৃজনশীলতার দিকেও নজর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি নুরুল ইসলাম সেলুন, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা জুলফিকার আলী, সমাজসেবা কর্মকর্তা আজাদুর রহমান, যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. হোসেন শাহ, সদর আহমদের চেয়ারম্যান জুবায়ের আহমেদ চৌধুরী, রাজনগর সরকারি কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মো. আলী বেগ এবং প্রেসক্লাব সভাপতি আউয়াল কালাম বেগসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ব্যক্তিরা।
বিশেষ অতিথিরা তাদের বক্তব্যে বলেন, গ্রামীণ পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করতে এ ধরনের উদ্যোগ অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। মেধাবীদের সম্মাননা দিলে অন্য শিক্ষার্থীরাও অনুপ্রাণিত হয় এবং শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। তারা শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখার আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করেন উপজেলা কর্মসূচি সমন্বয়কারী মার্গারেট জুঁহি দাস। পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে ছিল প্রাণবন্ত পরিবেশ। শিক্ষার্থীদের সম্মাননা প্রদান ছাড়াও বিভিন্ন অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
সংবর্ধিত শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন সৌরভ প্রসাদ, রূপা দেব, নাবিলা খানম ও নাবিয়া। তারা নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, এই সম্মাননা তাদের জন্য বড় প্রেরণা হিসেবে কাজ করবে। তারা ভবিষ্যতে আরও ভালো ফলাফল অর্জনের পাশাপাশি সমাজ ও দেশের জন্য কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। শিক্ষার্থীরা আয়োজকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, এমন আয়োজন তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয় এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জোগায়।
অনুষ্ঠানে অভিভাবকদের পক্ষ থেকেও বক্তব্য দেওয়া হয়। হীরালাল পাল, ব্লুচিচাপ পাল ও আজমল খান শিক্ষার্থীদের সাফল্যে আনন্দ প্রকাশ করে বলেন, সন্তানের ভালো ফলাফল একজন অভিভাবকের জীবনের অন্যতম বড় অর্জন। তারা মনে করেন, সন্তানদের পড়াশোনার জন্য পরিবার ও সমাজের সমন্বিত সহযোগিতা অত্যন্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে তারা শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ বাড়ানোর আহ্বান জানান।
রাজনগর উপজেলার শিক্ষাবিদ ও সচেতন মহল মনে করছেন, বর্তমান সময়ে শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে মূল্যায়ন না করে তাদের নেতৃত্বগুণ, সৃজনশীলতা এবং সামাজিক সচেতনতার দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে। তবে মেধাবীদের সম্মাননা প্রদান নিঃসন্দেহে শিক্ষাক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব তৈরি করে।
স্থানীয়দের মতে, হীড বাংলাদেশের এ ধরনের উদ্যোগ রাজনগরের শিক্ষাঙ্গনে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষার্থীরা এমন স্বীকৃতি পেলে নিজেদের স্বপ্ন পূরণে আরও উৎসাহী হয়ে ওঠে। অনেক অভিভাবকও মনে করেন, আর্থিক সহায়তা ও সামাজিক স্বীকৃতি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
বর্তমান সময়ে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার যুগে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধে গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন বক্তারা। তারা বলেন, ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়তে প্রয়োজন মেধাবী, সৎ ও দায়িত্বশীল তরুণ প্রজন্ম।
দিনব্যাপী এই আয়োজন শেষে সংবর্ধিত শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক ও অতিথিদের মধ্যে এক ধরনের আনন্দঘন অনুভূতি বিরাজ করে। সম্মাননা হাতে নিয়ে অনেক শিক্ষার্থী ভবিষ্যতে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক কিংবা প্রশাসক হওয়ার স্বপ্নের কথা জানান। তাদের সেই স্বপ্নপূরণের পথে এ আয়োজন একটি অনুপ্রেরণার মাইলফলক হয়ে থাকবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


