প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে পর্যটন খাতের জনপ্রিয় হয়ে ওঠা হাউসবোট নির্মাণকাজে নেমে প্রাণ হারিয়েছেন এক তরুণ কাঠমিস্ত্রি। নদীর বুকে দাঁড়িয়ে চলছিল কাঠের কাজ, আর সেই কাজের মাঝেই ঘটে যায় মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। সহকর্মীদের চোখের সামনেই নদীতে পড়ে নিখোঁজ হন রাকিব হোসেন নামের ওই যুবক। দীর্ঘ সময় খোঁজাখুঁজির পর ডুবুরিদল তার নিথর দেহ উদ্ধার করলে পুরো এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার বালিজুরী ইউনিয়নের আনোয়ারপুর বাজারসংলগ্ন রক্তি নদীতে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত রাকিব হোসেনের বয়স ছিল ২৬ বছর। তিনি ঢাকার মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং থানার বাসিন্দা বলে জানা গেছে। জীবিকার তাগিদে তিনি দীর্ঘদিন ধরে কাঠমিস্ত্রির কাজ করতেন এবং সম্প্রতি তাহিরপুরে একটি পর্যটকবাহী হাউসবোট নির্মাণ প্রকল্পে যুক্ত ছিলেন।
স্থানীয় সূত্র, সহকর্মী এবং প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আনোয়ারপুর বাজারসংলগ্ন রক্তি নদীতে “বনেদী” নামের একটি হাউসবোট নির্মাণের কাজ চলছিল। প্রতিদিনের মতো বুধবার বিকেলেও রাকিব কাঠের বিভিন্ন অংশ জোড়া লাগানো ও নকশা অনুযায়ী কাঠামো তৈরির কাজে ব্যস্ত ছিলেন। নদীর পানির ওপর ভাসমান অবস্থায় থাকা ওই নির্মাণাধীন বোটের চারপাশে তখন আরও কয়েকটি বোট নোঙর করা ছিল। কাজের একপর্যায়ে পাশের আরেকটি হাউসবোটে যাওয়ার চেষ্টা করেন রাকিব। ধারণা করা হচ্ছে, পা পিছলে অথবা ভারসাম্য হারিয়ে তিনি হঠাৎ নদীতে পড়ে যান।
ঘটনার আকস্মিকতায় প্রথমে কেউ ঠিক বুঝে উঠতে পারেননি কী ঘটেছে। পরে সহকর্মীরা রাকিবকে দেখতে না পেয়ে চিৎকার শুরু করেন। আশপাশের শ্রমিক ও স্থানীয়রা দ্রুত নদীতে নেমে তাকে খুঁজতে থাকেন। কেউ কেউ নৌকা নিয়ে নদীর বিভিন্ন অংশে অনুসন্ধান চালান। কিন্তু নদীর পানির গভীরতা ও স্রোতের কারণে তাকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়নি।
খবর পেয়ে তাহিরপুর ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান। পরে ডুবুরিদল উদ্ধার অভিযান শুরু করে। প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী টানা অনুসন্ধানের পর নদীর নিচ থেকে রাকিবের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত মরদেহ তীরে নিয়ে আসা হলে উপস্থিত সহকর্মী ও স্থানীয়দের মধ্যে শোকের আবহ তৈরি হয়। অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। যারা কিছুক্ষণ আগেও তার সঙ্গে কাজ করছিলেন, তারা কেউ বিশ্বাস করতে পারছিলেন না যে এত দ্রুত একটি প্রাণ এভাবে ঝরে যেতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাহিরপুর ও টাঙ্গুয়ার হাওরকেন্দ্রিক পর্যটন ব্যবসা দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে। পর্যটকদের আকর্ষণ করতে একের পর এক হাউসবোট নির্মাণ করা হচ্ছে। এসব বোটে কাঠ, লোহা ও বৈদ্যুতিক বিভিন্ন কাজ করতে দেশের নানা এলাকা থেকে শ্রমিকরা এসে কাজ করেন। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুবই দুর্বল থাকে। নদীর পানির ওপর ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করলেও অনেক শ্রমিকের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা হয় না। ফলে ছোট একটি অসাবধানতাও বড় দুর্ঘটনায় রূপ নেয়।
রাকিবের সহকর্মীরা জানিয়েছেন, তিনি ছিলেন অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের এবং দক্ষ একজন কাঠমিস্ত্রি। পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরাতে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে কাজ করতেন। কয়েক মাস আগে তাহিরপুরে এসে হাউসবোট নির্মাণকাজে যুক্ত হন। তার মৃত্যুর খবরে মুন্সীগঞ্জে থাকা পরিবারে নেমে এসেছে শোকের মাতম। পরিবারের সদস্যরা শেষবারের মতো তার মুখ দেখতে সুনামগঞ্জের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন বলে জানা গেছে।
তাহিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, নদীতে পড়ে নিখোঁজ হওয়ার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায় এবং ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে সমন্বয় করে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। পরে ডুবুরিদল মরদেহ উদ্ধার করে। আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। নিহতের স্বজনদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মরদেহ তাদের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, পর্যটন শিল্পের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতিও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে নদী বা হাওর এলাকায় চলমান নির্মাণকাজে শ্রমিকদের জন্য লাইফ জ্যাকেট, নিরাপত্তা দড়ি ও জরুরি উদ্ধার সরঞ্জাম বাধ্যতামূলক করা উচিত। তারা মনে করেন, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে এমন দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকাংশে কমে আসবে।
তাহিরপুরের পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কয়েকজন উদ্যোক্তা জানান, হাউসবোট এখন এই অঞ্চলের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন আকর্ষণ। প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার পর্যটক টাঙ্গুয়ার হাওর ও আশপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে এখানে আসেন। পর্যটকের সংখ্যা বাড়ায় নতুন নতুন হাউসবোট নির্মাণের চাহিদাও বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে দ্রুত ব্যবসা সম্প্রসারণের প্রতিযোগিতায় অনেক সময় শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি অবহেলিত থেকে যায়।
রক্তি নদীর তীরে বুধবার সন্ধ্যায় যখন রাকিবের মরদেহ উদ্ধার করা হয়, তখন সেখানে জড়ো হন বহু মানুষ। অনেকে মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করছিলেন, আবার কেউ কেউ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে ছিলেন। স্থানীয় কয়েকজন বৃদ্ধ জানান, নদী এ অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকার অংশ হলেও নদী প্রায়ই কেড়ে নেয় মূল্যবান প্রাণ। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুম ও গভীর পানির এলাকায় কাজ করার সময় সামান্য অসতর্কতাও ভয়াবহ বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
একজন তরুণ শ্রমিকের এভাবে প্রাণ হারানোর ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শোক প্রকাশ করেছেন অনেকে। অনেকেই শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে নিহত রাকিবের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও সহকর্মীরা।
জীবিকার সন্ধানে বাড়ি থেকে বহু দূরে এসে কাজ করতে গিয়ে রক্তি নদীর পানিতে হারিয়ে গেল রাকিবের জীবন। পরিবারের স্বপ্ন, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা আর প্রিয়জনদের প্রত্যাশা—সবকিছু যেন থেমে গেল এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায়। তাহিরপুরের নদীর পাড়ে এখনো ভাসছে সেই শোকের আবহ, আর সহকর্মীদের কণ্ঠে বারবার ফিরে আসছে একই প্রশ্ন—আরও একটু সতর্কতা কি একটি প্রাণ বাঁচাতে পারত না?


