প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
দীর্ঘদিনের অপেক্ষা ও প্রত্যাশার পর আবারও সিলেটের আকাশে আন্তর্জাতিক বেসরকারি এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজ দেখা যেতে পারে— এমন সম্ভাবনার খবর নতুন আশার সঞ্চার করেছে প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেট অঞ্চলে। সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক স্বল্পমূল্যের জনপ্রিয় এয়ারলাইন্স ফ্লাই দুবাই পুনরায় সিলেট থেকে ফ্লাইট পরিচালনার পরিকল্পনা করছে বলে জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম। সংসদে দেওয়া এই তথ্য প্রকাশের পর সিলেটের ব্যবসায়ী, প্রবাসী পরিবার, পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
বুধবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে সিলেট-৬ আসনের সংসদ সদস্য এমরান আহমদ চৌধুরীর এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, বর্তমানে সিলেট এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স নিয়মিতভাবে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা করছে। তবে অতীতে ফ্লাই দুবাই সিলেট-দুবাই রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করলেও পরবর্তীতে তাদের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এখন প্রতিষ্ঠানটি আবারও সিলেট থেকে ফ্লাইট চালুর বিষয়ে পরিকল্পনা করছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ফ্লাই দুবাইয়ের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন শুধু একটি এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট চালু হওয়ার খবর নয়, বরং এটি সিলেট অঞ্চলের অর্থনীতি, প্রবাসী যোগাযোগ, পর্যটন ও আন্তর্জাতিক সংযোগ ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের ইতিবাচক বার্তা। কারণ, দেশের অন্যতম বৃহৎ প্রবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে পরিচিত সিলেটে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে বসবাসরত বিপুলসংখ্যক মানুষের পরিবারের বসবাস। তাদের যাতায়াতের প্রধান ভরসা আকাশপথ।
বর্তমানে সিলেট এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স লন্ডন, দুবাই, আবুধাবি, মাসকট, জেদ্দা, শারজাহ ও দোহা রুটে সপ্তাহে মোট ২৩টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা করছে। তবে স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে ঘোষিত হলেও এখানে বিদেশি এয়ারলাইন্সের উপস্থিতি অত্যন্ত সীমিত। ফলে যাত্রীদের অনেক সময় ঢাকা হয়ে যাতায়াত করতে হয়, যা সময় ও অর্থ— দুই দিক থেকেই বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যগামী শ্রমজীবী প্রবাসী এবং ইউরোপপ্রবাসী সিলেটিদের জন্য সরাসরি ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ানো দীর্ঘদিনের দাবি। অনেক যাত্রীকে ঢাকায় এসে রাত কাটাতে হয়, আবার অনেকে সংযোগ ফ্লাইটের জটিলতায় পড়েন। এতে ভোগান্তির পাশাপাশি অতিরিক্ত খরচও গুনতে হয়। এ বাস্তবতায় ফ্লাই দুবাইয়ের মতো আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্স পুনরায় চালু হলে তা সাধারণ যাত্রীদের জন্য বড় স্বস্তি হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ফ্লাই দুবাই প্রথমবার সিলেট-দুবাই রুটে ফ্লাইট চালু করেছিল ২০১৭ সালের মার্চ মাসে। সে সময় প্রবাসীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া পড়ে। কারণ, তুলনামূলক কম খরচে সরাসরি মধ্যপ্রাচ্যে যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। যদিও সেই সিদ্ধান্তের পেছনে বাণিজ্যিক ও পরিচালনাগত নানা কারণ ছিল বলে ধারণা করা হয়।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম সংসদে বলেন, এয়ারলাইন্সগুলো সাধারণত তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থ বিবেচনায় কোনো রুট চালু বা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। সরকার বা বেবিচক নীতিগত সহায়তা দিলেও শেষ পর্যন্ত যাত্রী চাহিদা, পরিচালন ব্যয়, রুট লাভজনকতা এবং আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে এ সিদ্ধান্ত।
তবে তিনি এটাও স্পষ্ট করেন যে, সিলেট এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সুবিধার ঘাটতি নেই। যাত্রী পরিবহন ও কার্গো সেবার ক্ষেত্রে রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রায় সব ধরনের সুবিধাই এখানে বিদ্যমান রয়েছে। ফলে বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর জন্য সিলেটে ফ্লাইট পরিচালনায় প্রযুক্তিগত বা প্রশাসনিক কোনো বড় বাধা নেই।
সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সিলেট অঞ্চলে আন্তর্জাতিক যাত্রীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত শ্রমিক, যুক্তরাজ্যপ্রবাসী বাংলাদেশি পরিবার, ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের কারণে এই অঞ্চলের বিমানযাত্রা বাজার ক্রমেই বড় হচ্ছে। বিশেষ করে রেমিট্যান্স প্রবাহের দিক থেকেও সিলেট দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। ফলে আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সগুলোর জন্য এটি একটি সম্ভাবনাময় বাজার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সিলেটের পর্যটন খাত সংশ্লিষ্টরাও বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তাদের মতে, বিদেশি এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট বাড়লে শুধু প্রবাসী যাত্রী নয়, বিদেশি পর্যটকদের সংখ্যাও বাড়তে পারে। সিলেটের চা-বাগান, জাফলং, রাতারগুল, বিছানাকান্দি ও হাওরাঞ্চল ইতোমধ্যে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠেছে। সহজ আন্তর্জাতিক যোগাযোগ তৈরি হলে এই খাত আরও সম্প্রসারিত হতে পারে।
এদিকে প্রবাসীদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্স বাড়লে টিকিটের মূল্যেও প্রতিযোগিতা তৈরি হবে। বর্তমানে অনেক সময় যাত্রীদের অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হয়। বিশেষ করে ঈদ বা ছুটির মৌসুমে টিকিট সংকট ও বাড়তি ভাড়া সাধারণ মানুষের জন্য বড় ভোগান্তি তৈরি করে। নতুন এয়ারলাইন্স যুক্ত হলে সেই চাপ কিছুটা কমতে পারে।
বিমানবন্দর সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যতে আরও আন্তর্জাতিক রুট চালুর সম্ভাবনা রয়েছে। কার্গো পরিবহন ব্যবস্থাও উন্নত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কারণ, সিলেট অঞ্চল থেকে কৃষিপণ্য, মাছ, শুঁটকি ও অন্যান্য পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার রয়েছে। নিয়মিত কার্গো ফ্লাইট চালু হলে রপ্তানি খাতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে ফ্লাই দুবাইয়ের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের খবর সিলেট অঞ্চলের মানুষের কাছে নতুন আশার বার্তা হয়ে এসেছে। যদিও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্লাইট চালুর তারিখ ঘোষণা হয়নি, তবুও সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ায় প্রত্যাশা অনেক বেড়েছে। প্রবাসী অধ্যুষিত এই অঞ্চলের মানুষ এখন অপেক্ষা করছেন— কবে আবার ওসমানীর রানওয়েতে নামবে আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সের সেই পরিচিত উড়োজাহাজ।


