প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতা ও সংঘাতের ঘটনায় আহতদের গল্পগুলো অনেক সময়ই আড়ালে থেকে যায়। কিন্তু প্রতিটি আহত মানুষের পেছনে থাকে একটি দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস, যন্ত্রণা, আশা এবং পুনরুদ্ধারের গল্প। তেমনই এক গল্পের নাম জাহিদুল হোসেন—সিলেট মহানগর ছাত্রদলের একজন নেতা, যিনি প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে চোখের জটিলতায় ভোগার পর অবশেষে সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে নতুন করে আশার আলো দেখছেন।
২০২২ সালের ৭ ডিসেম্বর রাজধানীর নয়াপল্টনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়কে ঘিরে সংঘটিত সহিংস ঘটনার সময় টিয়ারগ্যাসের আঘাতে গুরুতরভাবে আহত হন জাহিদুল হোসেন। সে দিনটি শুধু রাজনৈতিক অঙ্গনেই নয়, বরং অনেক ব্যক্তিগত জীবনের জন্যও একটি বেদনাদায়ক অধ্যায় হয়ে আছে। টিয়ারগ্যাসের শেলের আঘাতে জাহিদুলের চোখে গুরুতর ক্ষতি হয়, যা পরবর্তীতে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন সৃষ্টি করে।
ঘটনার পরপরই তাঁকে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। তবে চোখের জটিলতা পুরোপুরি নিরাময় হয়নি। ধীরে ধীরে তাঁর দৃষ্টিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে, যা তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, শিক্ষাজীবন এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড—সবকিছুর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তবুও তিনি চিকিৎসা চালিয়ে যান এবং সুস্থ হয়ে ওঠার আশা ছাড়েননি।
অবশেষে দীর্ঘ চিকিৎসা প্রক্রিয়া ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের ভিত্তিতে রাজধানীর গ্রিন রোডে অবস্থিত ভিশন আই হসপিটালে তাঁর চোখের অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। চিকিৎসকদের মতে, অপারেশনটি সফল হয়েছে এবং বর্তমানে তাঁর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল। অস্ত্রোপচারের পর তিনি নিজ বাড়িতে অবস্থান করছেন এবং ধীরে ধীরে সুস্থতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।
জাহিদুল হোসেনের এই অস্ত্রোপচার শুধু একটি চিকিৎসা প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। প্রায় তিন বছরের বেশি সময় ধরে তিনি যে শারীরিক ও মানসিক কষ্টের মধ্য দিয়ে গেছেন, তা তাঁর কাছের মানুষ এবং সহকর্মীদের কাছে সুপরিচিত। চিকিৎসার ব্যয়, সময় এবং অনিশ্চয়তা—সবকিছু মিলিয়ে এই পথচলা সহজ ছিল না।
অস্ত্রোপচারের পর তাঁর খোঁজখবর নিতে রোববার তাঁর বাসায় যান ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল। তিনি জাহিদুলের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেন এবং তাঁর দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন। এ সময় স্থানীয় ছাত্রদলের আরও কয়েকজন নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের উপস্থিতি জাহিদুলের জন্য ছিল মানসিকভাবে সাহস জোগানোর একটি বড় উৎস।
এই ঘটনায় রাজনৈতিক মহলেও প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই মনে করছেন, রাজনৈতিক সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের পুনর্বাসন এবং চিকিৎসা নিশ্চিত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। জাহিদুলের মতো অনেকেই আছেন, যারা বিভিন্ন সময়ে সংঘর্ষ বা সহিংসতার শিকার হয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যায় ভুগছেন। তাঁদের জন্য প্রয়োজন যথাযথ চিকিৎসা সহায়তা এবং মানসিক সমর্থন।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, টিয়ারগ্যাসের শেল সরাসরি চোখে আঘাত করলে তা অত্যন্ত মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এটি দৃষ্টিশক্তি স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই এ ধরনের ঘটনায় দ্রুত ও সঠিক চিকিৎসা অত্যন্ত জরুরি। জাহিদুলের ক্ষেত্রে দেরিতে হলেও সঠিক চিকিৎসা পাওয়ায় তাঁর সুস্থতার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়েছে।
এদিকে, জাহিদুল হোসেন নিজেও তাঁর সুস্থতার জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন বলে জানা গেছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, খুব শিগগিরই তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারবেন এবং আবারও তাঁর সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হতে পারবেন।
এই ঘটনাটি শুধু একটি ব্যক্তিগত চিকিৎসার খবর নয়, বরং এটি আমাদের সমাজের একটি বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতিফলন। রাজনৈতিক সহিংসতার ফলে সাধারণ মানুষ ও কর্মীরা কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন, এবং সেই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কতটা সময় ও সংগ্রামের প্রয়োজন হয়—তার একটি বাস্তব উদাহরণ জাহিদুল হোসেনের জীবন।
বর্তমানে তাঁর চিকিৎসা-পরবর্তী সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসকদের নির্দেশনা মেনে চলা, নিয়মিত ফলোআপ এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম—এসবই তাঁর সম্পূর্ণ সুস্থতার জন্য অপরিহার্য। পরিবার, সহকর্মী এবং শুভানুধ্যায়ীদের সমর্থনও তাঁর এই পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
জাহিদুলের চোখের সফল অস্ত্রোপচার তাঁর জীবনে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। দীর্ঘ অন্ধকারের পর আলো দেখার এই অভিজ্ঞতা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত নয়, বরং এটি অনেকের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারে। কঠিন পরিস্থিতিতেও আশা না হারিয়ে এগিয়ে যাওয়ার যে উদাহরণ তিনি স্থাপন করেছেন, তা সমাজের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর শারীরিক অবস্থার আরও উন্নতি হবে—এমনটাই আশা করছেন সংশ্লিষ্ট সবাই। এখন সবার প্রার্থনা, তিনি দ্রুত সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসুন এবং নতুন উদ্যমে তাঁর পথচলা শুরু করুন।


