প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলায় সাবেক সংসদ সদস্য ও বর্তমানে কারাবন্দি ব্যারিস্টার সাইদুল হক সুমনের নামে বরাদ্দকৃত প্রায় ৫০ লাখ টাকার উন্নয়ন প্রকল্প ঘিরে নতুন করে আলোচনার ঝড় উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে চাপা থাকা অভিযোগগুলো আবার সামনে আসায় স্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন ও কৌতূহল। সরকারি অর্থের স্বচ্ছ ব্যবহার এবং জবাবদিহিতার বিষয়টি এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আবারও সামনে চলে এসেছে।
সূত্র বলছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এমপি কোটায় বরাদ্দ হওয়া এই অর্থের হিসাব সম্প্রতি কারাগার থেকেই জানতে চেয়েছেন ব্যারিস্টার সুমন। তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের মাধ্যমে তিনি প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ও অর্থ ব্যয়ের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে উচ্চ আদালতে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতিও চলছে বলে জানা গেছে। এ জন্য তিনি বাংলাদেশ হাইকোর্টে রিট দায়েরের উদ্যোগ নিতে তার পরিচিতদের অনুরোধ জানিয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে প্রকাশ পেয়েছে।
এই ঘটনায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, বর্তমান সংসদ সদস্যের কাছেও তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখার অনুরোধ জানিয়েছেন। এতে বোঝা যাচ্ছে, বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং বৃহত্তর জনস্বার্থের প্রশ্ন হিসেবেই তিনি সামনে আনতে চাইছেন। কারণ অভিযোগ রয়েছে, তার অনুপস্থিতির সুযোগে এই অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ব্যারিস্টার সুমন এলাকা ছাড়ার পর তার নামে বরাদ্দকৃত এই অর্থ তৎকালীন প্রশাসনের কিছু অসাধু ব্যক্তির মাধ্যমে উত্তোলন করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং কয়েকজন ঠিকাদার মিলে ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে এই অর্থ তুলে নেন। প্রকল্পের আওতায় চা শ্রমিকদের জন্য বিভিন্ন উপকরণ সরবরাহ, সড়ক উন্নয়ন এবং কালভার্ট নির্মাণের কথা বলা হলেও বাস্তবে এসব কাজের কোনো দৃশ্যমান প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগকারীরা দাবি করছেন।
২০২৪ সালে এই অনিয়মের বিষয়টি প্রথম আলোচনায় আসে, যখন স্থানীয় একটি পত্রিকার সম্পাদক আনিসুর রহমান রতন জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। তার অভিযোগে বলা হয়, প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পিআইসি কমিটি বা টেন্ডার প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। বরং নিয়মবহির্ভূতভাবে অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে, যা সরাসরি আর্থিক অনিয়মের ইঙ্গিত দেয়।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র গায়েব করা হয়েছে, যা তদন্ত কার্যক্রমকে জটিল করে তুলতে পারে। পাশাপাশি বরাদ্দকৃত অর্থ নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী মন্ত্রণালয়ে ফেরত না দিয়ে তা উত্তোলন করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনা শুরু হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।
এই প্রসঙ্গে স্থানীয় স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার এস.এ সাজন বলেন, একজন জনপ্রতিনিধি এলাকা ছেড়ে যাওয়ার পরও তার বরাদ্দকৃত সরকারি অর্থ যদি অন্য কেউ উত্তোলন করে থাকে, তাহলে সেটি অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। তিনি বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দাবি করেন এবং দোষীদের আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানান।
অন্যদিকে, হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক জি.এম. সরফরাজ এই অভিযোগের বিষয়ে বলেন, এখানে কোনো ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে নয়, বরং সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাই মূল বিষয়। তিনি জানান, অভিযোগটি যেহেতু পূর্বের ঘটনা, তবুও তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে এবং প্রয়োজনীয় তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা হবে। যদি কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হয়, তাহলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।
এদিকে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিষয়টি সম্পর্কে অবগত রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির হবিগঞ্জ কার্যালয়ের উপ-পরিচালক এরশাদ আলী। তিনি বলেন, এটি একটি গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ এবং কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে নির্দেশনা পেলে তারা তদন্ত শুরু করবেন। এতে বোঝা যাচ্ছে, বিষয়টি এখন শুধু স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই, বরং জাতীয় পর্যায়ের নজরেও এসেছে।
এই পুরো ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় জনগণের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ মনে করছেন, এটি একটি বড় ধরনের দুর্নীতির উদাহরণ, যা দ্রুত তদন্ত করে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনা উচিত। আবার কেউ কেউ বিষয়টিকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখছেন, যেখানে বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে এই ইস্যুকে ব্যবহার করতে পারে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—সরকারি অর্থের ব্যবহারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে এ ধরনের অভিযোগ বারবার সামনে আসতেই থাকবে। তাই সংশ্লিষ্টদের মতে, এই ঘটনার নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত অত্যন্ত জরুরি। এতে শুধু সত্য উদঘাটনই নয়, ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম প্রতিরোধেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সব মিলিয়ে, কারাগার থেকে ব্যারিস্টার সুমনের ৫০ লাখ টাকার হিসাব চাওয়ার ঘটনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। এখন সবার দৃষ্টি তদন্তের দিকে—সত্য কী, তা উদঘাটনেই নির্ভর করছে এই ঘটনার পরবর্তী পরিণতি।


