প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষায় ক্যাডার পদে সুপারিশপ্রাপ্তদের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান আবারও স্পষ্ট করে দিল আঞ্চলিক বৈষম্যের চিত্র। দেশের অন্যান্য বিভাগের তুলনায় ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে রয়েছে ঢাকা বিভাগ, আর বিপরীতে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা বিভাগ হিসেবে উঠে এসেছে সিলেট। সর্বশেষ চারটি বিসিএস পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণে এই বৈষম্য আরও প্রকটভাবে ধরা পড়েছে, যা নিয়ে শিক্ষা বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ৪৪তম, ৪৫তম, ৪৮তম এবং ৪৯তম বিসিএস পরীক্ষায় মোট ৭ হাজার ৬৫১ জন প্রার্থীকে ক্যাডার পদে সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে এককভাবে সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ৫৬৫ জন সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন ঢাকা বিভাগ থেকে। অন্যদিকে সিলেট বিভাগ থেকে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন মাত্র ২২৯ জন, যা দেশের আটটি বিভাগের মধ্যে সর্বনিম্ন।
প্রতিবেদনটি সম্প্রতি জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হলে বিষয়টি আরও গুরুত্ব পায়। বিশ্লেষণে দেখা যায়, শুধু একটি বিসিএস নয়, বরং ধারাবাহিকভাবে প্রতিটি বিসিএস পরীক্ষাতেই ঢাকা বিভাগ শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। বিপরীতে সিলেট বিভাগ প্রতিবারই তালিকার সর্বনিম্ন স্থানে অবস্থান করেছে। এই প্রবণতা দীর্ঘদিনের এবং তা এখন উদ্বেগজনক মাত্রা পেয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগের পর দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ, যেখান থেকে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন ১ হাজার ৪৭১ জন। তৃতীয় স্থানে রয়েছে রাজশাহী বিভাগ, যার সংখ্যা ১ হাজার ২০০। এরপর রয়েছে খুলনা বিভাগ ৯৮৬ জন, রংপুর বিভাগ ৯২৯ জন, ময়মনসিংহ বিভাগ ৮০৯ জন এবং বরিশাল বিভাগ ৪৬২ জন। সবশেষে রয়েছে সিলেট বিভাগ, যেখানে মাত্র ২২৯ জন প্রার্থী ক্যাডার পদে সুপারিশ পেয়েছেন।
বিসিএসভিত্তিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ৪৪তম বিসিএসে ঢাকা বিভাগ থেকে ৩১৯ জন সুপারিশপ্রাপ্ত হলেও সিলেট থেকে ছিলেন মাত্র ৩৮ জন। একইভাবে ৪৫তম বিসিএসে ঢাকার সংখ্যা ৩৭৯ জন, যেখানে সিলেটের ছিল ৫৭ জন। ৪৮তম বিশেষ স্বাস্থ্য বিসিএসে সিলেটের অংশগ্রহণ কিছুটা বাড়লেও সংখ্যাটি ছিল ১১১ জন, যা অন্যান্য বিভাগের তুলনায় এখনও অনেক কম। ৪৯তম বিশেষ শিক্ষা বিসিএসে এই সংখ্যা আরও কমে দাঁড়ায় মাত্র ২৩ জনে।
শিক্ষা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই বৈষম্যের পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে শিক্ষার মান, কোচিং সুবিধা, প্রস্তুতির পরিবেশ, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং তথ্যপ্রযুক্তির সহজলভ্যতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ঢাকা বিভাগে এসব সুবিধা তুলনামূলক বেশি হওয়ায় সেখানকার শিক্ষার্থীরা প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকছেন। অন্যদিকে সিলেট বিভাগে এসব সুযোগ সীমিত হওয়ায় শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ছেন।
এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক পরিসংখ্যানও এই বৈষম্যের একটি বড় চিত্র তুলে ধরে। পিএসসির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ৪৯তম বিশেষ শিক্ষা বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্তদের মধ্যে ৬৭ শতাংশই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। অন্যদিকে রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগর ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সম্মিলিতভাবে পেয়েছেন ১৮ শতাংশ। এতে বোঝা যায়, দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকেও বিসিএসে সাফল্যের একটি বড় অংশ আসছে, যা আঞ্চলিক বৈষম্যকে আরও গভীর করছে।
সিলেট বিভাগের শিক্ষার্থীদের অনেকেই এই পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, প্রয়োজনীয় গাইডলাইন, মানসম্মত প্রস্তুতি এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশের অভাব তাদের পিছিয়ে দিচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকা বা অন্যান্য বড় শহরে যেতে বাধ্য হন, যা সবার পক্ষে সম্ভব হয় না।
অভিভাবকরাও এই বৈষম্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। তারা মনে করেন, দেশের সব অঞ্চলে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা না গেলে মেধার সঠিক বিকাশ সম্ভব নয়। বিশেষ করে সরকারি চাকরির মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে এই বৈষম্য দীর্ঘমেয়াদে প্রশাসনিক কাঠামোর ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বৈষম্য কমাতে হলে আঞ্চলিক পর্যায়ে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধির প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার প্রসার ঘটানো জরুরি। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বিসিএস প্রস্তুতির জন্য মানসম্মত সহায়তা প্রদান করলে সিলেটসহ পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলো থেকে আরও বেশি প্রার্থী সফল হতে পারেন।
এদিকে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শুধু পরিসংখ্যান প্রকাশ নয়, বরং এর পেছনের কারণগুলো বিশ্লেষণ করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই এখন সময়ের দাবি। সিলেট বিভাগের মতো অঞ্চলগুলোতে যদি শিক্ষার মানোন্নয়ন ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো যায়, তাহলে আগামী দিনে এই বৈষম্য কমে আসতে পারে।
সব মিলিয়ে, বিসিএসে সিলেট বিভাগের পিছিয়ে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যু হিসেবে সামনে এসেছে। এটি শুধু একটি অঞ্চলের নয়, বরং দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের সঙ্গেও জড়িত। তাই এই বৈষম্য দূর করতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


