প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
হবিগঞ্জে দাখিল পরীক্ষার প্রথম দিনেই বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে। কুরআন মজিদ বিষয়ের পরীক্ষায় সারা দেশে নির্ধারিত প্রশ্নপত্রের পরিবর্তে একটি কেন্দ্রে ভিন্ন সেটের প্রশ্ন বিতরণের ঘটনায় পরীক্ষার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে কেন্দ্র সচিবসহ তিনজনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ওই কক্ষে পরীক্ষা দেওয়া শতাধিক শিক্ষার্থীর খাতা আলাদাভাবে মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে তাদের কোনো ধরনের ক্ষতি না হয়।
ঘটনাটি ঘটে হবিগঞ্জ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় দাখিল পরীক্ষা কেন্দ্রে। জানা গেছে, মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত দাখিল পরীক্ষার প্রথম দিনের কুরআন মজিদ বিষয়ের প্রশ্নপত্র সারা দেশে ‘যমুনা-১’ সেটে নেওয়া হলেও ওই কেন্দ্রের একটি কক্ষে ভুলবশত ‘মেঘনা-১’ সেট বিতরণ করা হয়। এতে প্রায় ১০০ জন পরীক্ষার্থী ভিন্ন সেটের প্রশ্নে পরীক্ষা দেয়। পরীক্ষা শেষে শিক্ষার্থীরা কেন্দ্র ত্যাগ করার পর বিষয়টি ধরা পড়ে, যা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি করে।
এ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) পাপিয়া আক্তার জানান, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে এবং দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “পরীক্ষার্থীদের স্বার্থ যাতে কোনোভাবে ক্ষুণ্ন না হয়, সেজন্য তাদের খাতা আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা হবে। ইতোমধ্যে খাতাগুলো সংগ্রহ করে হাতে হাতে পাঠানো হয়েছে।” তিনি আরও জানান, দায়িত্বে অবহেলার বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ায় কেন্দ্র সচিব মো. ফারুক মিয়া, হল সুপার মো. খাইরুদ্দীন এবং চেক অফিসার মিজানুর রহমানকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী পরীক্ষাগুলোতে তারা আর দায়িত্ব পালন করবেন না।
প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত মঙ্গলবার বিকেলে নেওয়া হলেও আনুষ্ঠানিক চিঠি সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছায় বুধবার। এদিকে ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর স্থানীয় শিক্ষা মহলে সমালোচনার ঝড় ওঠে। অনেকেই এটিকে চরম অবহেলা ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক জানান, দাখিল পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষায় এমন ভুল কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, “পরীক্ষার আগে সাধারণত তিনটি সেটে প্রশ্ন প্রস্তুত করা হয়। একটি সেটে পরীক্ষা নেওয়া হয় এবং অন্যগুলো বিকল্প হিসেবে রাখা হয়। কিন্তু এক সেটের সঙ্গে অন্য সেটের প্রশ্নের ২০ শতাংশের বেশি মিল থাকে না। ফলে ভুল সেটে পরীক্ষা হলে শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক চাপ পড়ে এবং তাদের পারফরম্যান্স ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।”
এদিকে জানা গেছে, হবিগঞ্জ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় দাখিল পরীক্ষা কেন্দ্রে নিবন্ধিত পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৬২৪ জন। এর মধ্যে প্রথম দিনের পরীক্ষায় অংশ নেয় ৬০৮ জন। ওই কেন্দ্রের একটি কক্ষে ১০০ জন পরীক্ষার্থী ভুল প্রশ্নে পরীক্ষা দেয়, যা মোট পরীক্ষার্থীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। ফলে বিষয়টি দ্রুত সমাধানের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে প্রশাসন।
ঘটনার পরপরই অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পাপিয়া আক্তার কেন্দ্র পরিদর্শন করেন এবং সংশ্লিষ্ট খাতাগুলো সংগ্রহ করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নিয়ে যান। সেখানে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। প্রাথমিক তদন্তে দায়িত্বে অবহেলার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের মধ্যেও এ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এমন ঘটনায় তাদের সন্তানের ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, আলাদাভাবে মূল্যায়নের মাধ্যমে কোনো শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। প্রয়োজনে বিশেষ বিবেচনায় ফলাফল নির্ধারণ করা হবে।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র বিতরণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। এ ধরনের ভুল শুধু পরীক্ষার্থীদের ক্ষতিই করে না, বরং পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর আস্থাকেও নড়বড়ে করে দেয়। তাই ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।
এদিকে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, প্রযুক্তির আরও কার্যকর ব্যবহার এবং পরীক্ষার আগে দায়িত্বপ্রাপ্তদের প্রশিক্ষণ জোরদার করা হলে এ ধরনের ভুল অনেকাংশে কমানো সম্ভব। পাশাপাশি প্রতিটি পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রশ্নপত্র গ্রহণ ও বিতরণের ক্ষেত্রে একাধিক স্তরের যাচাই-বাছাই চালু করার সুপারিশও করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে হবিগঞ্জের এই ঘটনা আবারও প্রশ্ন তুলেছে পরীক্ষাকেন্দ্রগুলোর ব্যবস্থাপনা ও দায়িত্বশীলদের ভূমিকা নিয়ে। যদিও প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে, তবুও এ ধরনের ভুল যেন ভবিষ্যতে আর না ঘটে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবার আরও সতর্ক হওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


