প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে জ্বালানি তেলের মূল্য সামান্য বৃদ্ধি পেলেও দেশের ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দামে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে না বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, খাদ্যদ্রব্য সরাসরি জ্বালানী তেলের উপর নির্ভরশীল নয়, বরং এর উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় জ্বালানীর ভূমিকা সীমিত হওয়ায় মূল্যবৃদ্ধির চাপ খুব বেশি হবে না।
সোমবার (২০ এপ্রিল) সকালে সিলেটের সরকারি অগ্রগামী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে হাম ও রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের ফল। তবে এই বৃদ্ধি অস্বাভাবিক নয় এবং এর প্রভাব দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে সীমিত থাকবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, খাদ্যপণ্যের উৎপাদন সরাসরি জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং পরিবহন ব্যবস্থায় কিছুটা জ্বালানি ব্যবহৃত হলেও মোট উৎপাদন খরচের একটি ছোট অংশই এর সঙ্গে যুক্ত থাকে। তিনি জানান, ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পেও জ্বালানী খরচ সাধারণত মোট উৎপাদন ব্যয়ের ৭ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। ফলে জ্বালানী তেলের মূল্য কিছুটা বাড়লেও পণ্যমূল্যে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা কম।
তিনি আরও বলেন, বৈশ্বিক বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে সরকার জ্বালানির মূল্য নির্ধারণ করেছে, যাতে আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। তিনি বলেন, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পেলে তার প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই ভোক্তা পর্যায়ে পড়তে পারে, তবে সরকার সেই চাপ কমাতে কাজ করছে। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, উন্নত দেশসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশেই জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জেরই অংশ।
মন্ত্রী বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। কৃষি খাতে বিশেষ করে ডিজেল ব্যবহারের ক্ষেত্রে সরকার ইতোমধ্যে ভর্তুকি প্রদান করছে, যাতে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে থাকে। একই সঙ্গে অন্যান্য খাতেও প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা অব্যাহত থাকবে বলে তিনি জানান।
স্বাস্থ্যখাত প্রসঙ্গে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, গত দুই বছরে স্বাস্থ্যখাতে কিছু অনিয়ম ও দুর্বলতার কারণে বর্তমান পরিস্থিতিতে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। তবে সরকার এই সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। তিনি বলেন, জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছে এবং টিকাদান কার্যক্রম এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
হাম ও রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে অচিরেই দেশে এই রোগের প্রকোপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। সরকারের লক্ষ্য হলো শিশুদের সম্পূর্ণভাবে টিকার আওতায় আনা এবং সংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমিয়ে আনা।
তিনি আরও জানান, সিলেটে একটি ২৫০ শয্যার আধুনিক হাসপাতাল চালুর পরিকল্পনা রয়েছে, যা স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সিলেট অঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে যে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ রয়েছে, তা দূর করতে সরকার কাজ করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
মন্ত্রী বলেন, সিলেট সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূচকে কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এই বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে সরকার উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদার করবে। তিনি বলেন, অবকাঠামো উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে সিলেটকে এগিয়ে নেওয়া হবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন সফল করতে সিটি কর্পোরেশন নিরলসভাবে কাজ করছে। তিনি জানান, সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রচার কার্যক্রম এবং স্থানীয় পর্যায়ে মতবিনিময়ের মাধ্যমে অভিভাবকদের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া সৃষ্টি হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই ক্যাম্পেইন শতভাগ সফল হবে।
তিনি অভিভাবকদের উদ্দেশে বলেন, শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কোনো ধরনের গুজবে কান না দিয়ে টিকা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। শিশুদের সম্পূর্ণ সুরক্ষা নিশ্চিত করাই এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য।
অনুষ্ঠানে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. জাহিদুল ইসলাম স্বাগত বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন স্বাস্থ্য বিভাগের সহকারী পরিচালক ডা. নূরে আলম শামীম। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. জিয়াউর রহমান চৌধুরী, জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি, ইউনিসেফের কর্মকর্তারা এবং স্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিবর্গ।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সিলেট বিভাগে এবার মোট ১৩ লাখ ৫১ হাজার ৯৬৯ শিশুকে হাম-রুবেলা টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে সিলেট জেলায় ৪ লাখ ৬৫ হাজার ৩৫৪ শিশু, মৌলভীবাজারে ২ লাখ ১০ হাজার ১৮৬, হবিগঞ্জে ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৯৪১ এবং সুনামগঞ্জে ৩ লাখ ৪৪ হাজার ৫৮৮ শিশু রয়েছে। সিলেট সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ৬৮ হাজার ৫৮০ শিশুকে টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মাসব্যাপী কর্মসূচিতে মোট ৮৪টি কেন্দ্রে টিকাদান কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানান, সিলেট বিভাগে ইতোমধ্যে হাম ও রুবেলা উপসর্গে ছয়জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
অনুষ্ঠান শেষে মন্ত্রী সিলেট জেলা হাসপাতাল এবং শহীদ শামসুদ্দিন আহমেদ হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। প্রায় শতকোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ২৫০ শয্যার হাসপাতালগুলো ঘুরে দেখেন এবং সেবার মান উন্নয়নে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা প্রদান করেন।
সব মিলিয়ে, সিলেটে টিকাদান কর্মসূচি উদ্বোধন এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রীর বক্তব্য জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিককে একসঙ্গে সামনে এনেছে। সরকার একদিকে যেমন স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় কাজ করছে, অন্যদিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ সামলাতেও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।


