প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার একটি গ্রামে জমি সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের বিরোধ শেষ পর্যন্ত রূপ নেয় ভয়াবহ সংঘর্ষে। স্থানীয়ভাবে বিরোধ মেটাতে বসা সালিশ বৈঠক মুহূর্তেই পরিণত হয় সহিংসতায়, যার পরিণতিতে প্রাণ হারিয়েছেন মোহাম্মদ আলী (৬৫) নামে এক বৃদ্ধ। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ২০ জন, যাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানা গেছে। এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং পুরো এলাকায় শোক ও আতঙ্কের ছায়া ফেলেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মাধবপুর উপজেলার বুল্লা গ্রামের বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী ও একই গ্রামের কামাল মিয়ার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে জমি নিয়ে বিরোধ চলছিল। গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে এমন বিরোধ নতুন কিছু নয়; তবে এ ধরনের সমস্যা সমাধানে অনেক সময় স্থানীয় সালিশ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় সোমবার বিকেলে বিরোধ মেটাতে একটি সালিশ বৈঠকের আয়োজন করা হয়। গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন, এবং প্রথমদিকে আলোচনা শান্তিপূর্ণভাবেই চলছিল।
কিন্তু বৈঠকের একপর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক তীব্র আকার ধারণ করে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, জমির মালিকানা ও সীমানা নিয়ে কথা কাটাকাটির সময় উত্তেজনা দ্রুত বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং দুই পক্ষ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। লাঠিসোঁটা, ধারালো অস্ত্র ও ইট-পাটকেল নিক্ষেপে মুহূর্তেই পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হন। গুরুতর আহতদের মধ্যে ছিলেন মোহাম্মদ আলী। তাকে দ্রুত স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেওয়া হয়, পরে অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়। সেখানে একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার সকালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
মোহাম্মদ আলীর মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পরিবারের সদস্যরা জানান, তিনি একজন শান্ত স্বভাবের মানুষ ছিলেন এবং দীর্ঘদিন ধরে জমির বিষয়টি নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভুগছিলেন। তার মৃত্যুতে শুধু পরিবার নয়, প্রতিবেশীরাও গভীরভাবে মর্মাহত। স্থানীয়দের অনেকেই মনে করছেন, সময়মতো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হলে এই প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব ছিল।
মাধবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সোহেল রানা জানিয়েছেন, ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। তিনি বলেন, জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে সংঘর্ষে একজনের মৃত্যু হয়েছে এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে যাতে আর কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে বলেও তিনি জানান।
এই ঘটনার পর এলাকায় এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে। গ্রামবাসীদের অনেকেই মনে করছেন, ছোটখাটো বিরোধ সময়মতো সমাধান না হওয়ায় তা বড় আকার ধারণ করছে। বিশেষ করে সালিশ বৈঠকের মতো একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের জায়গা যদি সহিংসতায় রূপ নেয়, তাহলে তা গ্রামীণ সমাজ ব্যবস্থার জন্য উদ্বেগজনক। অনেকেই বলছেন, স্থানীয় নেতৃত্বের আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন ছিল।
বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে সালিশ ব্যবস্থার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। এটি সাধারণত দ্রুত ও কম খরচে বিরোধ নিষ্পত্তির একটি কার্যকর উপায় হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে কখনো কখনো এই ব্যবস্থার অপব্যবহার বা সঠিক নিয়ন্ত্রণের অভাবে পরিস্থিতি উল্টো বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সালিশ বৈঠকে নিরপেক্ষতা, আইনগত সচেতনতা এবং শান্তিপূর্ণ আলোচনার পরিবেশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
এদিকে আহতদের মধ্যে কয়েকজন এখনও চিকিৎসাধীন রয়েছেন। স্থানীয় হাসপাতাল ও ক্লিনিকে তাদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। গুরুতর আহতদের মধ্যে কিছুজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
ঘটনার পরপরই প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত শুরু হয়েছে। পুলিশ বলছে, ঘটনার পেছনে কারা উসকানি দিয়েছে এবং কারা সরাসরি সংঘর্ষে অংশ নিয়েছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতিও চলছে।
এই ধরনের ঘটনা সমাজে একটি বড় বার্তা দেয়—যে কোনো বিরোধ, তা যতই ছোট হোক না কেন, সঠিকভাবে এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধান করা না হলে তা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। বিশেষ করে জমি সংক্রান্ত বিরোধ, যা বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে একটি সাধারণ সমস্যা, তা সমাধানে আরও কার্যকর ও আইনি কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা বারবার সামনে আসছে।
মোহাম্মদ আলীর মৃত্যু যেন আরেকটি পরিসংখ্যান হয়ে না দাঁড়ায়—এটাই এখন স্থানীয়দের প্রত্যাশা। তারা চান, এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার হোক এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা যাতে আর না ঘটে সে জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হোক।


