প্রকাশ: ৬ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বাংলাদেশে সরকার বদলেছে, রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলেছে, শাসনব্যবস্থায় এসেছে নানা পরিবর্তন; কিন্তু সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তার প্রশ্নটি এখনো পুরোপুরি সমাধান হয়নি—এমন উদ্বেগ জানিয়েছেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান। তাঁর প্রশ্ন, কথা বলার অধিকার ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার যে দাবি ছয় দশকেরও বেশি আগে উঠেছিল, সেই দাবির জন্য আর কতকাল অপেক্ষা করতে হবে?
গত ৪ অক্টোবর ঢাকার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে অনুষ্ঠিত বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনের দ্বিতীয় দিনে ‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতা’ বিষয়ে নির্ধারিত বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন। তাঁর ইংরেজিতে দেওয়া বক্তব্যের বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করেছে প্রথম আলো; বক্তব্যটি পরদিন সিলেটটুডে২৪সহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
মতিউর রহমান তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই ফিরে যান ১৯৬২ সালের ১ ফেব্রুয়ারির একটি ঘটনায়। সে সময় পাকিস্তানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম ছাত্র ধর্মঘট ও বিক্ষোভ হয়েছিল। সেই আন্দোলনের দাবিগুলোর মধ্যে কথা বলার অধিকার এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার দাবিও ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ওই আন্দোলনে তিনি নিজেও অংশ নিয়েছিলেন।
এরপর বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন এবং স্বাধীনতার পরবর্তী কয়েক দশকের রাজনৈতিক পরিবর্তনের কথা তুলে ধরে মতিউর রহমান বলেন, বহু সরকার এসেছে ও চলে গেছে, রাজনৈতিক পটভূমিতেও পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নটি এখনো পুরোপুরি নিষ্পত্তি হয়নি বলে তাঁর বক্তব্য।
তিনি ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলন, তৎকালীন সরকারের পতন এবং পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা অনেক থাকলেও রাষ্ট্র পরিচালনা ও সংস্কারের ক্ষেত্রে সেই প্রত্যাশার পুরোটা পূরণ হয়নি। রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংস্কারের বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলোর অনেকগুলো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
গণমাধ্যমের পরিস্থিতি নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে মতিউর রহমান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে নানা ধরনের চাপ ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। তাঁর দাবি, ওই সময়ে কিছু সংবাদমাধ্যমের ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এসেছে, কোথাও সম্পাদক বদলেছেন এবং অনেক সাংবাদিককে পেশা ছাড়তে হয়েছে। এর ফলে সংবাদমাধ্যমে অস্থিরতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রবণতা তৈরি হয়েছিল বলে তিনি মনে করেন।
প্রথম আলোর অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, ওই সময়ে তাঁর প্রতিষ্ঠানকে উগ্রবাদী গোষ্ঠীর চাপ ও হুমকির মধ্য দিয়ে কাজ করতে হয়েছে। তাঁর বক্তব্যে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রথম আলো কার্যালয়ে আগুন, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনাও উঠে আসে। একই প্রসঙ্গে ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলা ও কর্মীদের নিরাপদে বের করে আনার ঘটনাও উল্লেখ করেন তিনি। এসব ঘটনার সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন প্রথম আলো সম্পাদক।
তবে তাঁর বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন নিয়ে। মতিউর রহমান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার একটি গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল এবং কমিশনটি স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছিল। সাংবাদিক, সম্পাদক ও গণমাধ্যম পরিচালকদের মধ্যে এসব প্রস্তাব নিয়ে ইতিবাচক ঐকমত্যও তৈরি হয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। কিন্তু তাঁর অভিযোগ, সেসব সুপারিশ বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকার উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ নেয়নি।
এরপর তিনি বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রসঙ্গ তোলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করেছে। এই পরিবর্তনের পর সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং স্বাধীন ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের জন্য কী ধরনের পরিবেশ তৈরি হবে—এটিকেই তিনি সামনে থাকা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরেন।
বিএনপির আগের দুই মেয়াদের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন মতিউর রহমান। তিনি বলেন, ১৯৯১-৯৬ ও ২০০১-০৬ সময়ে যথাক্রমে ভোরের কাগজ ও প্রথম আলোর সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিশেষ করে ২০০১-০৬ মেয়াদে সরকারের বিভিন্ন নীতি ও কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করলেও সাংবাদিক হিসেবে বড় ধরনের হয়রানি বা আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হয়নি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ ও তর্কের কথাও তিনি স্মরণ করেন এবং বলেন, মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও তা ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক শাস্তির পর্যায়ে যায়নি।
এর বিপরীতে আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ের শাসনামলে প্রথম আলো ও নিজে বিভিন্ন চাপের মুখে পড়েছিলেন বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে মামলা, সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ, সংবাদমাধ্যমের ওপর চাপ এবং সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থার প্রসঙ্গ আসে। ২০২৩ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে তাঁর বিরুদ্ধে করা মামলাসহ একসময় তাঁর বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা আশির কাছাকাছি হয়েছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রথম আলোর মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা নিয়েও অতীতে চাপ ছিল বলে অভিযোগ করেন মতিউর রহমান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শুরুর দিকে প্রতিষ্ঠানের মালিকানা পরিবর্তন এবং তাঁকে সম্পাদক পদ থেকে সরানোর উদ্দেশ্যে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্যকে তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও দাবি হিসেবেই দেখা প্রয়োজন; এগুলোর প্রতিটি অভিযোগের স্বাধীন যাচাই এ প্রতিবেদনের আওতায় করা হয়নি।
বর্তমান বিএনপি সরকারের বিষয়ে তাঁর বক্তব্যে সমালোচনার পাশাপাশি প্রত্যাশার কথাও ছিল। মতিউর রহমান বলেন, আগের বিএনপি সরকারগুলোর অভিজ্ঞতার কারণে তিনি এবং সংবাদমাধ্যমের অনেকে বর্তমান সরকার নিয়েও আশাবাদী। বিএনপির ৩১ দফা রাজনৈতিক কর্মসূচি ও নির্বাচনী ইশতেহারে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সংস্কার নিয়ে যেসব প্রতিশ্রুতি রয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নের আহ্বান জানান তিনি।
বিএনপির ৩১ দফার ১১ নম্বর দফায় গণমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত ও সার্বিক সংস্কারের লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির নেতৃত্বে একটি মিডিয়া কমিশন গঠনের কথা রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। পাশাপাশি নির্ভীক ও পক্ষপাতহীন সাংবাদিকতার সুরক্ষা, বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনাকে স্বাগত জানানো এবং সাংবাদিকদের পেশাগত স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতির কথাও তুলে ধরেন।
তবে মতিউর রহমানের অভিযোগ, এসব প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত সংবাদমাধ্যম সংস্কারে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ দেখা যায়নি। গণমাধ্যম সংস্কার নিয়ে মতবিনিময় বা উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও তা কার্যকর সংস্কারের পর্যায়ে পৌঁছায়নি বলে তিনি মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু সংবাদমাধ্যমের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ, সাংবাদিকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা এবং সংবাদ প্রকাশে অতিরিক্ত সতর্কতার পরিবেশ তৈরি হওয়ার কথাও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে।
সাইবার নিরাপত্তা-সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর মতে, আইনটির কাঠামো ও প্রয়োগের ধরন সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য কিছু ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে একই অনুষ্ঠানে বা অন্য কোনো সরকারি বক্তব্যে এ বিষয়ে সরকারের বিস্তারিত অবস্থান এই প্রতিবেদনের পরিসরে পাওয়া যায়নি।
মতিউর রহমানের বক্তব্য এমন সময়ে এসেছে, যখন চলতি বছরের বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনেও গণতন্ত্র, মানবাধিকার, জবাবদিহি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক নীতি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার গুরুত্বের কথা বলেছেন।
বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬ অনুষ্ঠিত হয়েছে ৩ থেকে ৫ অক্টোবর ঢাকার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে। আয়োজক সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের তথ্য অনুযায়ী, এবারের আয়োজনের মূল আলোচনার মধ্যে ছিল ক্ষমতা, প্রযুক্তি ও আস্থার পরিবর্তিত বাস্তবতা।
সবশেষে মতিউর রহমান আবারও ফিরে যান সেই ১৯৬২ সালের দাবিতে—কথা বলার অধিকার এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা। তাঁর বক্তব্যের শেষাংশে উঠে আসে দীর্ঘ সাংবাদিকজীবনের অভিজ্ঞতা ও হতাশার একটি প্রশ্ন: এত সরকার, এত রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং এত আন্দোলনের পরও যদি স্বাধীন সাংবাদিকতার মৌলিক দাবি বারবার তুলতে হয়, তাহলে আর কতকাল অপেক্ষা করতে হবে?
এই প্রশ্নটি শুধু একজন সম্পাদকের ব্যক্তিগত আক্ষেপ নয়; বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ভবিষ্যৎ নিয়ে চলমান বিতর্কেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা যেমন রাষ্ট্রের জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি দায়িত্বশীল ও তথ্যনির্ভর সাংবাদিকতা নিশ্চিত করাও গণমাধ্যমের নিজস্ব দায়িত্ব। ফলে স্বাধীনতা, নিরাপত্তা, পেশাগত নৈতিকতা এবং জবাবদিহির মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করাই আগামী দিনের বড় চ্যালেঞ্জ।


