প্রকাশ: ৬ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
একটি শিশুর জন্মের পর রাষ্ট্রের কাছে তার অস্তিত্বের প্রথম আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি হলো জন্মনিবন্ধন। স্কুলে ভর্তি থেকে শুরু করে পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র, উত্তরাধিকার, সরকারি সহায়তা কিংবা বিভিন্ন নাগরিক সেবা—জীবনের নানা পর্যায়ে এই সনদের প্রয়োজন হয়। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এই নাগরিক সেবাটি নিতে গিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সাধারণ মানুষকে এখনো দীর্ঘ অপেক্ষা, বারবার অফিসে যাতায়াত এবং নানা ধরনের প্রশাসনিক জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
নাগরিকদের অভিযোগ, কোথাও অনলাইন সার্ভার কাজ করছে না, কোথাও আবেদন করার পর মোবাইলে আসছে না ওটিপি। আবার তথ্য সংশোধনের আবেদন করেও দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের জন্মনিবন্ধন না থাকা, পুরোনো তথ্যের সঙ্গে নতুন তথ্যের অমিল কিংবা মৃত বাবা-মায়ের নিবন্ধন-সংক্রান্ত জটিলতায় একটি শিশুর জন্মসনদ পাওয়ার প্রক্রিয়া আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
সেবাপ্রত্যাশীদের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা কিংবা সিটি করপোরেশনের কার্যালয়ে গিয়ে অনেকেই ‘সার্ভার ডাউন’ কথাটি শুনছেন। অনলাইনে আবেদন করার ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রযুক্তিগত সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে যে সেবা ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে সহজ ও দ্রুত হওয়ার কথা, সেটিই অনেকের জন্য পরিণত হচ্ছে একাধিকবার অফিসে যাওয়ার কারণ হিসেবে।
জন্মনিবন্ধনের ক্ষেত্রে সমস্যাটি কেবল একটি সনদ পেতে দেরি হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি শিশুর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি, বিভিন্ন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ, পাসপোর্ট তৈরি কিংবা অন্যান্য সরকারি নথি তৈরিতে জন্মনিবন্ধনের তথ্য প্রয়োজন হয়। শুরুতেই নিবন্ধন না হলে পরবর্তী সময়ে সেই তথ্য তৈরি বা সংশোধনের চাপও বাড়ে। তখন একাধিক নথির তথ্য মিলিয়ে দেখার প্রয়োজন পড়ে এবং ছোট একটি ভুলও দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, শিশুর জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে জন্মনিবন্ধন করার কথা। কিন্তু সচেতনতার ঘাটতি, স্থানীয় পর্যায়ে সেবার জটিলতা এবং প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে অনেক পরিবার নির্ধারিত সময়ে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারছে না। পরে বয়স বা তথ্য সংশোধনের প্রয়োজন হলে জটিলতা আরও বাড়ছে। বিশেষ করে বাবা-মায়ের নিজের জন্মনিবন্ধন না থাকলে কিংবা তাঁদের কেউ মারা গেলে সন্তানের নিবন্ধন করতে গিয়ে পরিবারগুলোকে অতিরিক্ত কাগজপত্র ও যাচাইয়ের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
এর পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির অনুপস্থিতিকেও নাগরিক সেবা দুর্বল হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনে প্রশাসকনির্ভর ব্যবস্থার বিস্তার ঘটে। অনেক জায়গায় নির্বাচিত চেয়ারম্যান, মেয়র ও কাউন্সিলরদের পরিবর্তে প্রশাসনিক কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করছেন।
স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা সাধারণত এলাকার পরিবার, বাসিন্দা ও স্থানীয় সামাজিক সম্পর্ক সম্পর্কে ধারণা রাখেন। ফলে কোনো ব্যক্তির পরিচয় বা পারিবারিক তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ের যোগাযোগ অনেক সময় সহায়ক হয়। প্রশাসকনির্ভর ব্যবস্থায় সেই ব্যক্তিগত ও স্থানীয় যোগাযোগের জায়গাটি দুর্বল হয়ে পড়ায় কিছু সেবায় অতিরিক্ত যাচাই ও প্রশাসনিক ধাপ তৈরি হচ্ছে বলে নাগরিকদের অভিযোগ। একই ধরনের সমস্যার কথা উঠে এসেছে সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে।
এই পরিস্থিতির আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালনির্ভরতা বাড়ার অভিযোগ। সরকারি কার্যালয়ে প্রযুক্তিগত সমস্যা বা দীর্ঘসূত্রতার কারণে কেউ কেউ বাধ্য হয়ে বাইরের কম্পিউটার দোকান কিংবা অন্য ব্যক্তির সহায়তা নিচ্ছেন। এতে সরকারি নির্ধারিত খরচের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নাগরিকদের একাংশের প্রশ্ন, যে সেবা সহজে ও স্বচ্ছভাবে পাওয়ার কথা, সেটি পেতে কেন তাদের বাড়তি অর্থ বা ব্যক্তিগত যোগাযোগের ওপর নির্ভর করতে হবে?
সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে নাটোরের এক কৃষকের অভিজ্ঞতাও এমন ভোগান্তির চিত্র তুলে ধরেছে। সরকারি কার্যালয়ে সার্ভার সমস্যার কথা বলা হলেও বাইরে কম্পিউটারের দোকানে অর্থের বিনিময়ে দ্রুত কাজ হয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেছেন তিনি।
তবে শুধু সার্ভার বা জনপ্রতিনিধির অনুপস্থিতিই জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের হার কমে যাওয়ার একমাত্র কারণ—এমন সিদ্ধান্তে যেতে সতর্ক থাকার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে জন্মের এক বছরের মধ্যে জন্মনিবন্ধনের হার ছিল ৪৯ শতাংশ এবং মৃত্যু নিবন্ধনের হার ৪৭ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা বেড়ে যথাক্রমে ৬৩ ও ৫৯ শতাংশে পৌঁছেছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত জন্মনিবন্ধনের হার কমে ৪৩ শতাংশ এবং মৃত্যু নিবন্ধনের হার ৫৬ শতাংশ হয়েছে।
অর্থাৎ, এক বছরের মধ্যে জন্মনিবন্ধনের হার এক বছরের ব্যবধানে ২০ শতাংশীয় পয়েন্ট কমেছে। একই সময়ে মৃত্যু নিবন্ধনের হারও তিন শতাংশীয় পয়েন্ট কমেছে। এই পতন এমন সময়ে ঘটেছে, যখন ২০৩০ সালের মধ্যে এক বছরের মধ্যে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন শতভাগে উন্নীত করার আন্তর্জাতিক লক্ষ্যের দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশ। এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সিভিল রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস বা সিআরভিএস কর্মপরিকল্পনার সঙ্গেও এ লক্ষ্য যুক্ত।
তবে নিবন্ধনের হার কমে যাওয়ার পেছনে ভুয়া নিবন্ধন বন্ধে নেওয়া পদক্ষেপেরও প্রভাব রয়েছে বলে জানিয়েছেন জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের কর্মকর্তারা। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য অতীতে কিছু জায়গায় ভুয়া বা অনিয়মিত নিবন্ধনের ঘটনা ঘটেছে। এখন প্রকৃত তথ্যের ভিত্তিতে নিবন্ধন নিশ্চিত করতে কঠোরতা বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে পরিসংখ্যানগতভাবে নিবন্ধনের হার কিছুটা কম দেখা যেতে পারে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কর্মকর্তারাও মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তা পরিবর্তন এবং প্রশাসনিক ব্যস্ততার প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছেন। চলতি বছরের বিভিন্ন সময়ে নির্বাচনসহ নানা প্রশাসনিক কাজে মাঠ কর্মকর্তাদের ব্যস্ততা ছিল। পাশাপাশি নতুন কর্মকর্তারা দায়িত্ব নেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম বুঝে নিতে কিছুটা সময় লাগতে পারে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ কারণে নিবন্ধন কার্যক্রমের গতি কমে যাওয়ার সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে।
এদিকে এক দিনে বিপুলসংখ্যক আবেদন জমা পড়ার চিত্রও দেখাচ্ছে যে চাহিদা কম নয়। ১৪ জুনের তথ্য অনুযায়ী, ওই দিনে দেশে জন্মনিবন্ধনের জন্য ৩৩ হাজার ৭৬৪টি আবেদন জমা পড়ে এবং ২৯ হাজার ৩০২টি আবেদন নিষ্পত্তি হয়। একই দিনে মৃত্যু নিবন্ধনের আবেদন ছিল ৩ হাজার ৬৩৯টি, যার মধ্যে ৩ হাজার ৩৯৪টি নিষ্পত্তি করা হয়। জন্মনিবন্ধন সংশোধনের আবেদন পড়ে ২৫ হাজার ৯৯১টি এবং নিষ্পত্তি হয় ২৩ হাজার ৫৬৯টি। রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের ওয়েবসাইটেও ১৪ জুন ২০২৬-এর জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনসংক্রান্ত দৈনিক তথ্য প্রকাশের বিষয়টি রয়েছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান মনে করেন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় নাগরিক সেবায় ভোগান্তি বেড়েছে। তাঁর মতে, প্রশাসকনির্ভর ব্যবস্থায় জন্মনিবন্ধন, ওয়ারিশ সনদ ও ট্রেড লাইসেন্সের মতো সেবা পেতে নাগরিকদের দিনের পর দিন ঘুরতে হচ্ছে। এ সুযোগে কিছু অসাধু কর্মচারী ও দালালচক্র অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের চেষ্টা করছে বলেও তিনি অভিযোগ করেছেন। তাঁর পরামর্শ, স্থানীয় পর্যায়ে তদারকি ও জবাবদিহি বাড়ানোর পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ে সেবা দিতে ব্যর্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে এবং নাগরিকদের অভিযোগ জানানোর জন্য কার্যকর হটলাইন চালু করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের জন্য জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন শুধু প্রশাসনিক একটি প্রক্রিয়া নয়; এটি রাষ্ট্রের নাগরিকদের পরিচয় ও অধিকার নিশ্চিত করার অন্যতম ভিত্তি। একটি শিশুর জন্ম যথাসময়ে নিবন্ধিত না হলে তার জীবনের পরবর্তী অনেক ধাপে সেই ঘাটতির প্রভাব পড়তে পারে। একইভাবে মৃত্যুর সঠিক নিবন্ধন না হলে জনসংখ্যা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা ও সরকারি পরিকল্পনার তথ্যও অসম্পূর্ণ থেকে যেতে পারে।
২০২৬ সালের প্রথমার্ধে জন্মনিবন্ধনের হার কমে যাওয়ার পর এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নাগরিকের জন্য সেবাটি সহজ করা এবং একই সঙ্গে নিবন্ধনের তথ্যের নির্ভুলতা নিশ্চিত করা। প্রযুক্তিগত অবকাঠামো সচল রাখা, অনলাইন ব্যবস্থার ত্রুটি দ্রুত সমাধান, তথ্য সংশোধনের প্রক্রিয়া সহজ করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে শুধু আন্তর্জাতিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনই কঠিন হবে না, রাষ্ট্রীয় সেবার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
নাগরিকের কাছে জন্মনিবন্ধন কোনো অতিরিক্ত সুবিধা নয়, এটি তার পরিচয়ের মৌলিক দলিল। তাই একটি সনদ পেতে যেন কাউকে দিনের পর দিন অফিসের দরজায় ঘুরতে না হয়, ‘সার্ভার ডাউন’ যেন সেবাবঞ্চনার স্থায়ী অজুহাতে পরিণত না হয় এবং বৈধ সেবা পেতে যেন কাউকে দালালের দ্বারস্থ হতে না হয়—এটাই এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সামনে সবচেয়ে জরুরি প্রত্যাশা।


