প্রকাশ: ৬ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
দেশের তৃণমূলের সবচেয়ে বড় স্থানীয় সরকার কাঠামো ইউনিয়ন পরিষদ। গ্রামের রাস্তা, জন্মনিবন্ধন, সামাজিক নিরাপত্তা, নাগরিক সনদ থেকে শুরু করে নানা জনসেবার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত এই প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অনিশ্চয়তা চলছে। এবার সেই অনিশ্চয়তার অবসানে আগামী বছরের শুরুতে ধাপে ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
ইসির সাম্প্রতিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের পবিত্র রমজান শুরুর আগেই তিন ধাপে প্রায় দুই হাজার ইউনিয়ন পরিষদে ভোট নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী জানুয়ারির দ্বিতীয় ও চতুর্থ সপ্তাহে দুটি এবং ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে আরেকটি ধাপে ভোট হতে পারে। একই সময়ে জানুয়ারিতে এক ধাপে কিছু পৌরসভা নির্বাচন আয়োজনের কথাও বিবেচনা করছে কমিশন। তবে এখনো এসব তারিখ চূড়ান্ত নয় এবং আনুষ্ঠানিক তফসিলও ঘোষণা করা হয়নি।
ইসির একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথম ধাপের জন্য আগে ২০২৭ সালের ৩ জানুয়ারি একটি সম্ভাব্য তারিখ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল। পরে সেই পরিকল্পনায় কিছুটা পরিবর্তন এনে জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহের বৃহস্পতিবার ভোট করার কথা ভাবা হচ্ছে। এরপর চতুর্থ সপ্তাহে দ্বিতীয় ধাপ এবং ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে তৃতীয় ধাপের ভোট আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি ধাপে আনুমানিক ৭০০ থেকে ৮০০টি ইউনিয়ন পরিষদকে ভোটের আওতায় আনার চিন্তা করছে কমিশন।
ইসি কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানিয়েছেন, রমজানের আগে তিন ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন করার পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই তিন ধাপে আনুমানিক দুই হাজার ইউনিয়নে ভোট হতে পারে। সংখ্যা কিছুটা কমবেশি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। প্রথম ধাপের ভোটের তারিখ কয়েক দিন পেছানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হলেও তিন ধাপে নির্বাচন করার মূল পরিকল্পনায় পরিবর্তন হয়নি।
দেশে মোট ইউনিয়ন পরিষদের সংখ্যা ৪ হাজার ৫৮০টি। এর মধ্যে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে ৩ হাজার ৬৩টি ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির মধ্যে মেয়াদ শেষ হবে আরও ১ হাজার ৪৮টি ইউপির। ফলে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার একটি বড় অংশের নির্বাচনী সময়সীমা একই সময়ের কাছাকাছি এসে পড়ায় কমিশনের সামনে দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের চাপও তৈরি হয়েছে।
ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন নিয়ে ইসির পরিকল্পনা অবশ্য কয়েক দফায় পরিবর্তিত হয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে প্রাক্-প্রস্তুতিমূলক সভা শেষে কমিশনের পক্ষ থেকে সাত ধাপে ইউপি নির্বাচন আয়োজনের কথা জানানো হয়েছিল। তখন প্রথম ধাপের সম্ভাব্য ভোটের তারিখ হিসেবে ১২ নভেম্বরের কথাও বলা হয়। কিন্তু পরে সরকারের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে যথাযথ যোগাযোগ ছাড়াই সম্ভাব্য সময়সূচি জানানোর বিষয়ে আপত্তি তোলা হয়। এরপর নির্বাচন আয়োজনের সময় নিয়ে সরকার ও কমিশনের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়।
১৭ সেপ্টেম্বর আন্তমন্ত্রণালয় সভার পর কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়, ইউপি নির্বাচনের জন্য উপযুক্ত সময় নির্ধারণ করা প্রয়োজন। নভেম্বর ও ডিসেম্বরে বিভিন্ন পরীক্ষা থাকায় ওই সময় নির্বাচন আয়োজনের সুযোগ সীমিত। জানুয়ারিতে তুলনামূলকভাবে সময় পাওয়া গেলেও ফেব্রুয়ারির শুরুতে রমজান শুরু হওয়ার সম্ভাবনা এবং এরপর এসএসসি পরীক্ষা থাকায় সময় আরও সংকুচিত হয়ে আসে। এসএসসি পরীক্ষার পর আবার এইচএসসি পরীক্ষার সময় শুরু হওয়ার আগে কিছুটা সময় পাওয়া যাবে। এই সময়ের মধ্যেই পর্যায়ক্রমে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
এদিকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যে নির্বাচনের আরও বিস্তৃত সময়সীমার কথা উঠে এসেছে। ১ অক্টোবর গাইবান্ধায় সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো সম্পন্ন করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে। তিনি নির্বাচন কমিশনকে সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা এবং প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দের কথাও জানান।
অর্থাৎ ইসি যে তিন ধাপে রমজানের আগে প্রায় দুই হাজার ইউপিতে ভোট আয়োজনের পরিকল্পনা করছে, সেটি পুরো স্থানীয় সরকার নির্বাচন শেষ করার সামগ্রিক সময়সীমার একটি অংশ। পরবর্তী ধাপের ইউপি নির্বাচন এবং অন্যান্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন জুনের মধ্যে আয়োজনের বিষয়টি সরকারের বক্তব্যে এসেছে। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটি একাধিক ধাপে এগোনোর সম্ভাবনাই এখন বেশি স্পষ্ট হচ্ছে।
তবে নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে সরকারের সঙ্গে কমিশনের সমন্বয় নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে। ইসির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা চলছে। আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠকের পরও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কমিশন আনুষ্ঠানিক কোনো লিখিত চিঠি বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পায়নি বলে ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন। দুই পক্ষ নিজেদের অবস্থান নিয়ে আলোচনা করছে।
ইউপি নির্বাচন পিছিয়ে যাওয়ার বিষয়টি শুধু প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রশ্ন নয়, এর সঙ্গে আইনি কাঠামোও জড়িত। স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯ অনুযায়ী, একটি ইউনিয়ন পরিষদের সাধারণ নির্বাচন আগের সাধারণ নির্বাচনের তারিখ থেকে পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন সম্ভব না হলে আইনে প্রশাসক নিয়োগের ব্যবস্থাও রয়েছে।
আইনে আরও বলা হয়েছে, ইউনিয়ন পরিষদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নির্বাচিত পরিষদ গঠিত না হওয়া পর্যন্ত সরকার প্রশাসক নিয়োগ করতে পারে। ২০২৪ সালের সংশোধনীতে প্রশাসকের দায়িত্ব পালনের মেয়াদ নিয়ে নির্দিষ্ট বিধানও যুক্ত করা হয়েছে, যদিও বিশেষ পরিস্থিতিতে সরকার যুক্তিসংগত সময়ের জন্য তা বাড়াতে পারে।
এই আইনি কাঠামোর কারণে যেসব ইউপির মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে, সেগুলোর নির্বাচন কখন হবে—তা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে আগ্রহ বাড়ছে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা দায়িত্বে থাকলে স্থানীয় উন্নয়ন ও নাগরিক সেবায় জনগণের সরাসরি প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়। অন্যদিকে দীর্ঘ সময় প্রশাসকনির্ভর ব্যবস্থায় থাকলে স্থানীয় সরকারের রাজনৈতিক জবাবদিহি ও প্রতিনিধিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
তবে নির্বাচন কমিশনের সামনে শুধু সময়সূচি ঠিক করাই চ্যালেঞ্জ নয়। বিশাল সংখ্যক ইউনিয়নে একসঙ্গে নির্বাচন আয়োজনের জন্য ভোটার তালিকা, প্রার্থী, ভোটকেন্দ্র, আইনশৃঙ্খলা, নির্বাচনী কর্মকর্তা এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতি সমন্বয় করতে হবে। এক ধাপে ৭০০ থেকে ৮০০ ইউপিতে ভোট আয়োজনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মাঠ প্রশাসনের ওপরও বড় ধরনের চাপ পড়তে পারে।
সাধারণত নির্বাচনের প্রায় দেড় মাস আগে তফসিল ঘোষণার প্রচলন থাকলেও এবার সময়ের সংকটের কারণে কমিশন তুলনামূলক কম সময় হাতে রেখে তফসিল দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভোটের প্রায় ৩৫ দিন আগে তফসিল ঘোষণা এবং প্রার্থীদের প্রচারের জন্য ১৫ দিনের মতো সময় দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এটিও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক দল, সম্ভাব্য প্রার্থী এবং ভোটারদের মধ্যেও প্রস্তুতি শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দীর্ঘ সময় পর ইউনিয়ন পর্যায়ে সরাসরি ভোটের আয়োজন হলে গ্রামাঞ্চলে এর প্রভাবও ব্যাপক হতে পারে। স্থানীয় নেতৃত্ব নির্বাচন, উন্নয়ন পরিকল্পনায় প্রতিনিধিত্ব এবং নাগরিক সেবার জবাবদিহির সঙ্গে এসব ভোট সরাসরি সম্পর্কিত।
এখন মূল নজর নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের দিকে। তিন ধাপে রমজানের আগে প্রায় দুই হাজার ইউপিতে ভোট আয়োজনের পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা এগোয়, প্রথম ধাপের সম্ভাব্য তারিখ শেষ পর্যন্ত কী হয় এবং সরকারের সঙ্গে কমিশনের সমন্বয় কোন পর্যায়ে পৌঁছায়—এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে কমিশনের পরবর্তী সভা ও তফসিল ঘোষণার মধ্য দিয়ে।
এ মুহূর্তে তাই নিশ্চিত করে বলা যায়, রমজানের আগে তিন ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন; কিন্তু ভোটের চূড়ান্ত তারিখ, ধাপভিত্তিক ইউপির সংখ্যা এবং তফসিল এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা হয়নি।
তৃণমূলের মানুষের কাছে নির্বাচন মানে শুধু ভোটের দিন নয়—নিজেদের এলাকার নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার সুযোগ। তাই দীর্ঘ অপেক্ষার পর যখন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের নতুন পরিকল্পনা সামনে এসেছে, তখন ভোটারদের প্রত্যাশা একটাই—সময়সূচি যেন স্পষ্ট হয়, নির্বাচন যেন সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হয় এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার আবারও জনগণের কাছে কার্যকরভাবে জবাবদিহি করতে পারে।


