প্রকাশ: ৬ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট নগরের ব্যস্ত বন্দরবাজার এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে দাঁড়িয়ে থাকা ‘টাইম টাওয়ার’টি হঠাৎ ভেঙে ফেলেছে সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক)। সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্দেশ্যে নির্মিত এই স্থাপনাটি বুলডোজার দিয়ে অপসারণের পর নগরবাসীর মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে—কেন ভাঙা হলো প্রায় এক যুগের পুরোনো এই স্থাপনাটি? তবে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পুরোনো টাওয়ারটির জায়গায় নতুন একটি টাওয়ার নির্মাণ করা হবে। অর্থাৎ বন্দরবাজারের ওই স্থানে সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্যোগ বন্ধ হচ্ছে না; বরং পুরোনো স্থাপনার পরিবর্তে নতুন স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
গত বুধবার রাতে বন্দরবাজারের করিমউল্লাহ মার্কেটের সামনে হকার পয়েন্ট এলাকায় বুলডোজার দিয়ে টাওয়ারটি ভেঙে ফেলা হয়। রাতের বেলায় আকস্মিকভাবে স্থাপনাটি অপসারণের ঘটনা স্থানীয়দের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। একসময় যে জায়গাটিকে নগরের সৌন্দর্যবর্ধনের অংশ হিসেবে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেখানে হঠাৎ করে পুরোনো কাঠামো না থাকায় বিষয়টি নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
সিলেট সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে তৎকালীন মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর উদ্যোগে বন্দরবাজারের হকার পয়েন্টে ‘টাইম টাওয়ার’ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সিলেটের ঐতিহ্যবাহী আলী আমজদের ঘড়ির আদলে এর নকশা করা হয়েছিল। নগরের ব্যস্ত একটি অংশে সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি সিলেটের প্রবাসী অধ্যুষিত সমাজের বাস্তবতাকেও নকশায় গুরুত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, টাওয়ারটির মাটির ওপরে উচ্চতা ছিল ২১ ফুট এবং মাটির নিচে ছিল আরও ৮ ফুট অংশ। প্রায় ৪৪ ফুট জায়গাজুড়ে ত্রিভুজাকৃতির কাঠামোটি নির্মাণ করা হয়েছিল। এর সামনের, ডান ও বাঁ দিকে মোট তিনটি ঘড়ি থাকার পরিকল্পনা ছিল। এসব ঘড়িতে বাংলাদেশ, যুক্তরাজ্য ও সৌদি আরবের সময় দেখানোর ব্যবস্থা রাখার কথা ছিল। টাওয়ারটির নকশা করেছিলেন স্থপতি মো. এহতেশাম আলী। যুক্তরাজ্য ও সৌদি আরবে সিলেট অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাসের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তিন দেশের সময় প্রদর্শনের ধারণা যুক্ত করা হয়েছিল।
টাওয়ারটি নির্মাণে সিলেটের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা ছিল বলে সিটি করপোরেশনের সূত্রের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে। নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় আট লাখ টাকা। সে সময় বন্দরবাজারের ওই স্থানে পত্রিকার হকাররা বসতেন। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যানার ও ফেস্টুনে জায়গাটি অনেকটা অপরিকল্পিতভাবে ব্যবহৃত হতো। সেই পরিবেশ বদলে একটি দৃশ্যমান স্থাপনা তৈরির উদ্যোগ হিসেবেই টাইম টাওয়ার নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল।
তবে এই স্থাপনার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। ২০১৫ সালে প্রকাশিত প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, তৎকালীন সময়ে টাইম টাওয়ারের নির্মাণকাজ অসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৪ সালের জুলাইয়ে কাজ শুরু হওয়ার পর তৎকালীন মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী কারাগারে যাওয়ার পর নির্মাণকাজ আর এগোয়নি। তখন স্থাপনাটি ঘড়িবিহীন কাঠামো হিসেবে পড়ে ছিল এবং সেখানে পোস্টার-ব্যানার লাগানোর অভিযোগও ছিল। সিটি করপোরেশনের এক প্রকৌশলী তখন জানিয়েছিলেন, নকশায় কিছু ত্রুটি ছিল এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছিল।
পরবর্তী সময়ে টাওয়ারটি নিয়ে আবারও আলোচনা দেখা যায়। ২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, বন্দরবাজারের হকার পয়েন্টের টাইম টাওয়ারে নতুন ঘড়ি বসানো হলেও সেটি সঠিক সময় দেখাচ্ছিল না। কখনো ১০ মিনিট, কখনো ১৫ মিনিট আবার কখনো ৪৫ মিনিট পর্যন্ত সময়ের পার্থক্য দেখানোর অভিযোগ ওঠে। অর্থাৎ দীর্ঘ সময় ধরে স্থাপনাটি নগরবাসীর প্রত্যাশিত ব্যবহারিক ও নান্দনিক ভূমিকা পুরোপুরি পালন করতে পারেনি—এমন বিষয়ও বিভিন্ন সময়ে সংবাদে উঠে এসেছে।
এরই মধ্যে সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে পুরোনো টাওয়ারটি ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়। স্থাপনাটি ভেঙে ফেলার কারণ জানতে সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সিসিকের জনসংযোগ কর্মকর্তা নেহাররঞ্জন পুরকায়স্থ জানিয়েছেন, পুরোনো টাওয়ারের জায়গায় নতুন আরেকটি টাওয়ার নির্মাণ করা হবে। নতুন স্থাপনা নির্মাণের জন্যই পুরোনোটি ভেঙে ফেলা হয়েছে বলে তাঁর বক্তব্য।
এই বক্তব্যের ফলে অন্তত একটি বিষয় পরিষ্কার—বন্দরবাজারের ওই জায়গা থেকে সৌন্দর্যবর্ধনের ধারণাটি বাদ দেওয়া হচ্ছে না। বরং পুরোনো কাঠামো সরিয়ে নতুন একটি স্থাপনা তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে নতুন টাওয়ারটির নকশা কেমন হবে, কত ব্যয়ে নির্মাণ করা হবে, সেখানে ঘড়ি থাকবে কি না, থাকলে কী ধরনের ব্যবস্থা থাকবে এবং নির্মাণকাজ কবে শুরু ও শেষ হবে—এসব বিষয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।
নগর পরিকল্পনার দিক থেকেও বন্দরবাজারের মতো ব্যস্ত এলাকায় এ ধরনের স্থাপনার গুরুত্ব রয়েছে। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ এই এলাকার সড়ক ও ফুটপাত ব্যবহার করেন। বাণিজ্যিক কার্যক্রমের পাশাপাশি এটি সিলেট নগরের অন্যতম পরিচিত কেন্দ্র। ফলে সেখানে নির্মিত কোনো স্থাপনা শুধু সৌন্দর্যবর্ধনের অংশ নয়, নগরের দৃশ্যমান পরিচয়েরও অংশ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে আলী আমজদের ঘড়ির আদলে নির্মাণের পরিকল্পনার কারণে টাইম টাওয়ারটির সঙ্গে সিলেটের ঐতিহ্যের একটি প্রতীকী সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল।
অন্যদিকে একটি সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্প নির্মাণের পর সেটির রক্ষণাবেক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ। স্থাপনা নির্মাণের পাশাপাশি নিয়মিত পরিচর্যা, আলোকসজ্জা, ঘড়ির কার্যকারিতা, পরিচ্ছন্নতা এবং আশপাশের জায়গার সুশৃঙ্খল ব্যবহার নিশ্চিত না হলে কাঙ্ক্ষিত সৌন্দর্য ধরে রাখা কঠিন। অতীতে টাইম টাওয়ার নিয়ে অসমাপ্ত নির্মাণ, ঘড়ির কার্যকারিতা এবং পোস্টার-ব্যানার ব্যবহারের মতো বিষয় সংবাদে উঠে আসায় নতুন স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে এসব অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সিলেটের নাগরিকদের কাছেও নতুন টাওয়ার ঘিরে তাই প্রত্যাশা তৈরি হতে পারে। দীর্ঘদিনের একটি স্থাপনা সরিয়ে যদি নতুন কিছু নির্মাণ করা হয়, সেটি যেন কেবল আরেকটি কাঠামো হয়ে না থাকে—বরং নগরের চরিত্র, ইতিহাস ও বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি স্থাপনা হয়, এমন প্রত্যাশা স্বাভাবিক। একই সঙ্গে সরকারি অর্থ বা পৃষ্ঠপোষকতার অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে প্রকল্পের পরিকল্পনা, ব্যয় ও বাস্তবায়ন সম্পর্কে নাগরিকদের কাছে স্বচ্ছ তথ্য থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
টাইম টাওয়ারের পুরোনো কাঠামো এখন আর নেই। তার জায়গায় নতুন স্থাপনা তৈরির কথা জানিয়েছে সিটি করপোরেশন। ফলে বন্দরবাজারের এই জায়গাটি আবারও পরিবর্তনের অপেক্ষায়। একসময় যেখানে সিলেটের সময়, লন্ডনের সময় ও সৌদি আরবের সময় দেখানোর স্বপ্ন ছিল, সেখানে এবার কী ধরনের নতুন প্রতীক দাঁড়ায়—সেটিই দেখার বিষয়।
পুরোনো স্থাপনা ভেঙে নতুন কিছু নির্মাণ নগর উন্নয়নের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারে। কিন্তু সেই পরিবর্তন তখনই অর্থবহ হয়, যখন নতুন স্থাপনাটি আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আরও টেকসই, কার্যকর ও নান্দনিকভাবে পরিকল্পিত হয়। বন্দরবাজারের নতুন টাওয়ার সিলেট নগরের সৌন্দর্য ও পরিচয়ের অংশ হিসেবে কতটা জায়গা করে নিতে পারে, এখন সেটিই সময়ের অপেক্ষা।


