প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর পর এবার বাসভাড়াও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দূরপাল্লার বাস এবং ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরের বাসে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ১৭ পয়সা করে বাড়ানো হয়েছে। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে পরিবহন মালিকপক্ষ ও সংশ্লিষ্টদের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে নতুন ভাড়ার হার কীভাবে কার্যকর হবে, তা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে স্পষ্ট করার কথা রয়েছে।
নতুন সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে দূরপাল্লার বাসে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৪০ পয়সা হবে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরের বাস ও মিনিবাসে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বেড়ে দাঁড়াবে ২ টাকা ৭০ পয়সায়। অর্থাৎ জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর পরিবহন খাতে যে বাড়তি ব্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তার একটি অংশ এখন সরাসরি যাত্রীদের ওপরও পড়তে যাচ্ছে।
বাসভাড়া বাড়ানোর এই সিদ্ধান্ত এসেছে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পরপরই। সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ২১ সেপ্টেম্বর থেকে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা হয়েছে। একইভাবে কেরোসিনের দাম ১৩৫ টাকা থেকে ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা থেকে ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ টাকা থেকে ১৬৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ চার ধরনের জ্বালানি তেলের দামই লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে।
বাস পরিবহনে ডিজেলের ব্যবহার বেশি হওয়ায় জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পরিচালন ব্যয়ে পড়ার কথা জানিয়ে আসছিল পরিবহন মালিকপক্ষ। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বা বিআরটিএ বাসভাড়া পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নেয়। সোমবার বিআরটিএর ভাড়া সমন্বয়সংক্রান্ত বৈঠকে দূরপাল্লার বাসে কিলোমিটারপ্রতি ২০ পয়সা এবং নগর পরিবহনে ১৮ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছিল। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উভয় ক্ষেত্রেই ১৭ পয়সা করে বাড়ানো হয়েছে।
অর্থাৎ বিআরটিএর প্রাথমিক সুপারিশের তুলনায় চূড়ান্তভাবে ভাড়া বৃদ্ধির হার কিছুটা কম রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, যাত্রীদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সুপারিশ করা হারের চেয়ে কম ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ সিদ্ধান্তের ফলে পরিবহন মালিকদের পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির দাবি এবং যাত্রীদের বাড়তি ভাড়া বহনের সক্ষমতার মধ্যে একটি সমন্বয় করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
এর আগে সোমবারের বৈঠকের বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, পরিবহন মালিকপক্ষ জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি বাস পরিচালনার অন্যান্য ব্যয় বৃদ্ধির কথাও তুলে ধরেছিল। তবে বিআরটিএর প্রস্তাবিত ভাড়া চূড়ান্তভাবে কার্যকর হওয়ার আগে সরকারি অনুমোদন ও প্রজ্ঞাপনের প্রয়োজন ছিল। মঙ্গলবার মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে নতুন হার নির্ধারণের মধ্য দিয়ে সেই প্রক্রিয়ায় আরও অগ্রগতি হলো।
ভাড়া বৃদ্ধির প্রভাব সবচেয়ে সরাসরি অনুভব করবেন নিয়মিত বাসযাত্রীরা। প্রতিদিন কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, চিকিৎসা, ব্যবসা কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজে যারা বাসের ওপর নির্ভর করেন, তাদের জন্য কিলোমিটারপ্রতি কয়েক পয়সার পরিবর্তনও মাসিক যাতায়াত ব্যয়ে যোগ হতে পারে। বিশেষ করে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের পরিবারের সদস্যদের ক্ষেত্রে প্রতিদিনের যাতায়াত খরচ বাড়ার প্রভাব পারিবারিক বাজেটেও পড়তে পারে। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ের পরিবর্তনের সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যয়ের সম্পর্ক থাকায় বিষয়টি শুধু বাসযাত্রার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে কি না, সেটিও নজরে রাখার বিষয়।
ইতোমধ্যে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর দেশের পরিবহন ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় বাড়তি ব্যয়ের চাপের খবর এসেছে। বেনাপোল স্থলবন্দরে বিভিন্ন গন্তব্যে পণ্য পরিবহনের ট্রাকভাড়া ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতিতে নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
তবে জ্বালানির দাম বাড়ানোর পেছনে সরকারের ব্যাখ্যাও রয়েছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও ফ্রেইট চার্জ বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। সরকারি হিসাবে, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির লোকসান প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা হয়েছে। নতুন মূল্য নির্ধারণের মাধ্যমে এই আর্থিক চাপ কমানোর পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহ ও বাজার ব্যবস্থাপনা ধরে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে, জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবহনভাড়া সমন্বয়ের বিষয়টি সামনে আসায় সাধারণ মানুষের ব্যয়ের চাপ নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। মাত্র পাঁচ মাসের ব্যবধানে আবার বাসভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত সেই উদ্বেগকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে। চলতি বছরের এপ্রিলেও ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়ানোর পর দূরপাল্লার বাসের ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ১১ পয়সা বাড়ানো হয়েছিল। তখন দূরপাল্লার বাসে ভাড়া ২ টাকা ১২ পয়সা থেকে ২ টাকা ২৩ পয়সা এবং ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরের বাসে ২ টাকা ৪২ পয়সা থেকে ২ টাকা ৫৩ পয়সা করা হয়েছিল।
সেই সমন্বয়ের কয়েক মাস পরই আবার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ল এবং তার সঙ্গে নতুন করে বাসভাড়া নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু হলো। ফলে একদিকে পরিবহন খাতের পরিচালন ব্যয় সামাল দেওয়ার প্রশ্ন, অন্যদিকে সাধারণ যাত্রীর ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের চাপ—দুই দিকই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নতুন ভাড়া বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যাত্রীদের কাছ থেকে নির্ধারিত হারের বেশি ভাড়া আদায় ঠেকানোও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ ভাড়া বাড়ানোর সরকারি সিদ্ধান্তের পর বাস্তবে অনেক সময় নির্ধারিত হারের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ কারণে নতুন ভাড়ার হার প্রজ্ঞাপনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা এবং তা পরিবহন মালিক, চালক, শ্রমিক ও যাত্রীদের কাছে কার্যকরভাবে জানানো প্রয়োজন হবে।
একই সঙ্গে নতুন ভাড়ার বাস্তব প্রভাব কতটা পড়ছে, তা পর্যবেক্ষণ করাও জরুরি। জ্বালানি ব্যয়, বাস পরিচালনার অন্যান্য খরচ, যাত্রীসংখ্যা, রুটভেদে দূরত্ব এবং গণপরিবহনের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ভবিষ্যতে ভাড়া পুনর্নির্ধারণের প্রয়োজন হলে তার ভিত্তি যেন স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য হয়—এমন প্রত্যাশা যাত্রী ও পরিবহন খাতের উভয় পক্ষেরই থাকতে পারে।
সব মিলিয়ে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর বাসভাড়া বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত দেশের দৈনন্দিন যাতায়াত ব্যবস্থায় নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। পাঁচ মাসের ব্যবধানে দ্বিতীয় দফায় ভাড়া বাড়ায় নিয়মিত যাত্রীদের মাসিক পরিবহন ব্যয় আরও বাড়বে। এখন দেখার বিষয়, নতুন ভাড়া বাস্তবায়নের পর গণপরিবহন ব্যবস্থায় এর প্রভাব কতটা পড়ে এবং যাত্রীসেবার মান, ভাড়ার শৃঙ্খলা ও পরিবহন খাতের পরিচালন ব্যয়ের মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য রাখা হয়।


