প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
একসময় যে জমিতে কৃষকের ঘাম আর পরিশ্রমে সোনালি ধান ফলত, সেই জমিই এখন কুশিয়ারা নদীর বুকে হারিয়ে যাচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা বসতভিটা, ফসলি জমি ও পারিবারিক সম্পদ চোখের সামনে নদীগর্ভে বিলীন হতে দেখে অসহায় হয়ে পড়েছেন হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার নদীতীরবর্তী এলাকার মানুষ। প্রতিদিন নদীর স্রোত যেন তাদের জীবনের নিরাপত্তা, ভবিষ্যৎ ও শেষ আশ্রয়ের ওপর নতুন করে আঘাত হানছে।
নবীগঞ্জ উপজেলার দীঘলবাক ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় কুশিয়ারা নদীর ভাঙন সাম্প্রতিক সময়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। নদীর তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় কোথাও ফসলি জমি, কোথাও বসতবাড়ি, আবার কোথাও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। শুধু নবীগঞ্জ নয়, কুশিয়ারার অপর পাড়ে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের বাসিন্দারাও দীর্ঘদিন ধরে এই ভাঙনের প্রভাব মোকাবিলা করে আসছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীভাঙন রোধে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ে ডাইক নির্মাণ ও মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যথাসময়ে কার্যকর হচ্ছে না। ফলে একদিকে প্রকল্পের কাজ চলমান থাকলেও অন্যদিকে নদী তার স্বাভাবিক গতিতে তীর ভেঙে নিয়ে যাচ্ছে। এতে সরকারি অর্থ ব্যয়ের সুফল নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ।
স্থানীয় কৃষক আব্দুল কদ্দুছের জীবনে নদীভাঙনের ক্ষত কতটা গভীর, তার কথাতেই তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি জানান, একসময় তার প্রায় তিন একর ফসলি জমি ছিল। সেই জমিই ছিল পরিবারের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। কিন্তু কুশিয়ারার ভাঙনে পুরো জমি নদীগর্ভে চলে গেছে। এখন অবশিষ্ট জায়গাটুকু এবং বসতভিটা রক্ষা করাই তার কাছে সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয়।
আব্দুল কদ্দুছের অভিযোগ, প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার পর ভাঙনকবলিত মূল জায়গায় জিও ব্যাগ ও বস্তা ফেলার অনুরোধ জানানো হলেও তা যথাযথভাবে করা হয়নি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, যেখানে নদীর স্রোতে তীর দ্রুত ভেঙে যাচ্ছে, সেখানে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত শুকনো জায়গায় বস্তা ফেলার উদ্যোগ দেখা গেছে। এতে প্রকৃত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা সুরক্ষিত না হলে অবশিষ্ট জমি ও বাড়িঘরও রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
আরেক কৃষক আ. হাদী বলেন, ক্ষতির পরিমাণ শুধু জমির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। নদীভাঙনে একের পর এক পরিবার তাদের বসতভিটা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। তার দাবি, এ এলাকায় ইতোমধ্যে অন্তত ৫০০ পরিবারের বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের কারণে যারা একসময় নিজেদের জমি ও বাড়িঘর নিয়ে নিশ্চিন্তে বসবাস করতেন, তাদের অনেকেই এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ইউপি সদস্য আকুল মিয়া বলেন, কুশিয়ারা নদীর ভাঙন দীর্ঘদিনের সমস্যা হলেও স্থায়ীভাবে এর সমাধান হয়নি। ডাইক নির্মাণ ও মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ এবং কাজের ধীরগতির কারণে প্রত্যাশিত সুফল পাচ্ছেন না এলাকাবাসী। ভাঙন ঠেকাতে দ্রুত কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি চলমান প্রকল্পের কাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য ফখরু মিয়া ও মহসীন মিয়াও একই ধরনের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। তাদের মতে, দীঘলবাকসহ কুশিয়ারা নদীর তীরবর্তী এলাকায় বছরের পর বছর ধরে ভাঙন চলছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে নানা প্রকল্প হাতে নেওয়া হলেও নদীর গতিপথ ও ভাঙনের প্রকৃতি বিবেচনায় দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই ব্যবস্থা না থাকায় প্রতি বর্ষা ও নদীর পানি বৃদ্ধির সময় নতুন করে ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়।
কুশিয়ারা নদীর ভাঙন শুধু জমি হারানোর ঘটনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গ্রামীণ মানুষের জীবিকা, খাদ্যনিরাপত্তা, পারিবারিক স্থিতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা। একজন কৃষকের কাছে কয়েক একর জমি কেবল সম্পত্তি নয়, বরং পরিবারের বহু বছরের শ্রম, আয় এবং স্বপ্নের ভিত্তি। সেই জমি নদীতে চলে গেলে তার সঙ্গে হারিয়ে যায় উৎপাদনের সুযোগ, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার অনেক সম্ভাবনাও।
একইভাবে বসতভিটা হারানোর ক্ষতও সহজে পূরণ হওয়ার নয়। একটি বাড়ি তৈরি করতে একটি পরিবারকে বহু বছর সঞ্চয় করতে হয়। সেই বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেলে পরিবারগুলোকে অন্যত্র আশ্রয় নিতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে জমি কেনা বা নতুন বাড়ি নির্মাণের সামর্থ্য না থাকায় তারা আত্মীয়ের বাড়ি, ভাড়া বাসা কিংবা অস্থায়ী আশ্রয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ফলে নদীভাঙন ধীরে ধীরে একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটেও পরিণত হয়।
নদীভাঙন ঠেকাতে সরকারের বড় প্রকল্প থাকলেও স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা, প্রকল্পের পরিকল্পনা যেন মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। কোথায় নদীর স্রোতের চাপ সবচেয়ে বেশি, কোন অংশ দ্রুত ভেঙে যাচ্ছে এবং কোন বসতিগুলো তাৎক্ষণিক ঝুঁকিতে রয়েছে—এসব বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া না হলে বড় প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন।
এ বিষয়ে হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ছায়েদুর রহমান জানিয়েছেন, শেরপুর ব্রিজ থেকে দীঘলবাক, পাহাড়পুর, মার্কুলী হয়ে আজমিরীগঞ্জ পর্যন্ত প্রায় ৫০০ কোটি টাকার প্রকল্পের আওতায় কাজ চলছে। দীঘলবাকের সবকটি পয়েন্টে একই সঙ্গে কাজ করা সম্ভব হয়নি বলে তিনি জানান। তবে যেসব স্থানে কাজ শেষ হয়েছে, সেখানে নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে। বাকি ভাঙনকবলিত এলাকাগুলোতেও পর্যায়ক্রমে কাজ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের এই বক্তব্যে প্রকল্প বাস্তবায়নের একটি ধারাবাহিক পরিকল্পনার কথা উঠে এলেও স্থানীয়দের উদ্বেগ মূলত সময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। যেসব জায়গায় এখনই নদীর তীব্র স্রোতে জমি ও বসতভিটা হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, সেখানে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিতে আরও দেরি হলে পরবর্তী সময়ে কাজের পরিধি ও ব্যয় উভয়ই বেড়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ভুক্তভোগীরা।
কুশিয়ারা নদীর তীরবর্তী মানুষের সবচেয়ে বড় দাবি এখন দ্রুত এবং কার্যকর ব্যবস্থা। তারা চান, অতি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে সেখানে জরুরি ভিত্তিতে প্রতিরক্ষা কাজ শুরু করা হোক। একই সঙ্গে চলমান ডাইক নির্মাণ ও মেরামতকাজের মান, অগ্রগতি এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
নদী তার স্বাভাবিক গতিপথে প্রবাহিত হবে—এটাই বাস্তবতা। কিন্তু মানুষের বসতি, কৃষিজমি ও জীবন-জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নদী ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর প্রকৌশল ব্যবস্থা প্রয়োজন। কুশিয়ারার তীরে এখন যে দৃশ্য দেখা যাচ্ছে, তা কেবল কয়েকটি পরিবারের জমি হারানোর গল্প নয়; এটি নদী ও মানুষের দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনের একটি নির্মম প্রতিচ্ছবি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে আগামী দিনগুলোতে ভাঙনের শিকার পরিবারের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। কৃষিজমি হারিয়ে খাদ্য ও আয়ের সংকটে পড়ার পাশাপাশি নতুন করে বসতভিটা হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে আরও বহু পরিবার। তাই ৫৭৩ কোটি টাকার ডাইক নির্মাণ ও মেরামতের উদ্যোগ বাস্তবে কতটা টেকসই সুরক্ষা দিতে পারছে, সেটিই এখন কুশিয়ারা পাড়ের মানুষের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তাদের প্রত্যাশা, প্রকল্পের সুফল যেন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে নদীতীরের মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় বাস্তব ফল বয়ে আনে।

