প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসক ও কর্মচারীর সংকট, রোগনির্ণয়ের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি অচল থাকা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ ও পরীক্ষার উপকরণের ঘাটতিতে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। জেলার সাতটি উপজেলার প্রায় ২২ লাখ মানুষের চিকিৎসার অন্যতম প্রধান ভরসা এই সরকারি হাসপাতালে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী চিকিৎসা নিতে এলেও তাঁদের প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। বহির্বিভাগে দীর্ঘ লাইন, ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি রোগীর ভর্তি, সীমিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ এবং গুরুতর রোগীদের অন্যত্র পাঠানোর কারণে বাড়ছে রোগী ও স্বজনদের দুর্ভোগ। সরকারি হাসপাতালে কম খরচে চিকিৎসা পাওয়ার আশায় আসা অনেক মানুষকে শেষ পর্যন্ত বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে।
হাসপাতালটিতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় দেড় হাজার রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসেন। অন্যদিকে, ২৫০ শয্যার বিপরীতে প্রতিদিন প্রায় ৩৫০ থেকে ৪৫০ জন রোগী ভর্তি থাকেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। কখনো কখনো ভর্তি রোগীর সংখ্যা আরও বেড়ে যায়। ফলে অতিরিক্ত রোগীদের জন্য ওয়ার্ডের মেঝেতে বিছানা পেতে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। সীমিত শয্যা, চিকিৎসক ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর ওপর বাড়তি চাপ এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব মিলিয়ে হাসপাতালটির স্বাভাবিক সেবা কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে উঠেছে।
চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা সময়মতো করাতে না পারা। হাসপাতালের কিছু যন্ত্র দীর্ঘদিন ধরে অচল, আবার কিছু যন্ত্র দিয়ে সপ্তাহের নির্দিষ্ট কয়েক দিন পরীক্ষা করা যায়। এমআরআই সেবা পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। সিটি স্ক্যান, এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাফির মতো গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও সীমিত সময়ের জন্য চালু থাকায় রোগীদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার প্রয়োজনে তাঁদের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যেতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসার খরচ বাড়ছে, পাশাপাশি অসুস্থ রোগী ও তাঁদের স্বজনদের বাড়তি সময় ও শ্রম ব্যয় করতে হচ্ছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটিতে মোট অনুমোদিত ৪১২টি পদের বিপরীতে শূন্য রয়েছে ১০৯টি পদ। সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি চিকিৎসক পদে। চিকিৎসকের ৮৪টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৩৯ জন। অর্থাৎ চিকিৎসকের ৪৫টি পদ শূন্য রয়েছে। এর বাইরে একজন চিকিৎসক অননুমোদিতভাবে কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন এবং দুজন স্বেচ্ছায় অবসরের আবেদন করেছেন বলে জানানো হয়েছে। কয়েকজন চিকিৎসক প্রশিক্ষণেও রয়েছেন। ফলে কর্মরত চিকিৎসকদের সীমিত সামর্থ্য দিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হচ্ছে।
হাসপাতালের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে চিকিৎসকসংকট আরও প্রকট বলে জানা গেছে। অর্থোপেডিক, সার্জারি ও মেডিসিন বিভাগে রোগীর চাপ সামলাতে চিকিৎসকদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। নাক-কান-গলা ও চর্মরোগসহ কয়েকটি ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় রোগীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে কিছু রোগীকে অন্য হাসপাতাল বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যেতে হতে পারে। এতে সময়ক্ষেপণের পাশাপাশি আর্থিক চাপও বাড়ে।
শুধু চিকিৎসক নয়, নার্স, টেকনোলজিস্ট ও অন্যান্য কর্মচারীর পদেও ঘাটতি রয়েছে। হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, নার্স ও দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের মোট ১৯০টি পদের বিপরীতে শূন্য রয়েছে ২১টি। তৃতীয় শ্রেণির ৫৫টি পদের মধ্যে ১৬টি এবং চতুর্থ শ্রেণির ২২টি পদের মধ্যে ১৩টি শূন্য। এ ছাড়া চতুর্থ শ্রেণির আউটসোর্সিংয়ের ৬১টি পদের বিপরীতে ১৪টি পদে জনবল নেই। বিভিন্ন শ্রেণির কর্মচারীর এই ঘাটতি হাসপাতালের দৈনন্দিন কার্যক্রমে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্রেও জনবলসংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাসপাতালে ১৪ জন টেকনোলজিস্ট প্রয়োজন হলেও কর্মরত আছেন মাত্র নয়জন। এর সঙ্গে রিএজেন্ট বা পরীক্ষার রাসায়নিক উপকরণের ঘাটতি যুক্ত হওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পরীক্ষা নিয়মিত করা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, সপ্তাহে মাত্র তিন দিন এক্স-রে, দুই দিন সিটি স্ক্যান এবং চার দিন আলট্রাসনোগ্রাফি সেবা চালু থাকে। এসব পরীক্ষার সময়সূচি ও প্রাপ্যতার সীমাবদ্ধতার কারণে রোগীদের চিকিৎসা পরিকল্পনা করতেও সমস্যা হতে পারে।
হাসপাতালের এমআরআই মেশিনটি দীর্ঘদিন ধরে অচল রয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে রক্ত পরীক্ষার জাপানি মেশিন, এমআরআই মেশিনসহ বিভিন্ন ধরনের মোট ২৭টি যন্ত্রপাতি নানা কারণে সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এমআরআই মেশিনটির প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ফিলিপস এটিকে সম্পূর্ণ অকেজো ঘোষণা করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজনীয় এই পরীক্ষা হাসপাতালটিতে করানো সম্ভব হচ্ছে না। রোগীদের বাইরে পরীক্ষা করাতে হলে তাঁদের অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে।
হাসপাতালে আইসিইউ ও সিসিইউ ওয়ার্ড থাকলেও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও জনবলের অভাবে সেগুলো কার্যকরভাবে চালু নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গুরুতর অসুস্থ রোগীদের জন্য নিবিড় পরিচর্যা এবং হৃদ্রোগীদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের সেবা প্রয়োজন হলে রোগীদের সিলেটে পাঠানোর প্রয়োজন হচ্ছে। এতে একদিকে রোগীর পরিবারের ওপর আর্থিক ও মানসিক চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে জরুরি অবস্থায় স্থানান্তরের সময়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তবে এসব সেবা চালুর জন্য ঠিক কী পরিমাণ যন্ত্রপাতি ও জনবল প্রয়োজন, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
ডায়ালাইসিস সেবাতেও রয়েছে সংকট। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, সপ্তাহে দুইবার ডায়ালাইসিস করার কথা থাকলেও বর্তমানে একবার সেবা দেওয়া হচ্ছে। অর্থসংকটের পাশাপাশি রিএজেন্ট ও ফ্লুইডের ঘাটতিও রয়েছে। প্রয়োজনীয় উপকরণের সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে এই সেবাও বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। কিডনি রোগীদের জন্য নিয়মিত ডায়ালাইসিস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সেবার এমন সীমাবদ্ধতা তাঁদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করতে পারে।
প্যাথলজি বিভাগের বড় যন্ত্রপাতির কিছু অংশও প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপকরণ ও লোকবলের অভাবে বন্ধ রয়েছে বলে জানা গেছে। এতে রোগীদের বিভিন্ন পরীক্ষা করানোর সুযোগ সীমিত হচ্ছে। সরকারি হাসপাতালে তুলনামূলক কম খরচে পরীক্ষার সুযোগ না পেলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। দীর্ঘমেয়াদি রোগ, অস্ত্রোপচার কিংবা জটিল অসুস্থতার ক্ষেত্রে বারবার পরীক্ষা করানোর প্রয়োজন হলে এই ব্যয় পরিবারের ওপর আরও বড় চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
হাসপাতালের সেবাসংকটের পাশাপাশি দালালের দৌরাত্ম্য নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। চিকিৎসা নিতে এসে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা বা সেবা না পেয়ে বিপাকে পড়া রোগীরা অনেক সময় কোথায় গেলে দ্রুত পরীক্ষা করানো যাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভোগেন। এমন পরিস্থিতিতে দালালের খপ্পরে পড়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে দালালচক্রের কার্যক্রম, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় কিংবা এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। রোগীদের হয়রানি ঠেকাতে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে তথ্যসেবা, অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং রোগীদের সঠিক নির্দেশনা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
মৌলভীবাজারে একটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা এবং সরকারি হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানোর দাবি দীর্ঘদিনের। সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজনের মৌলভীবাজার জেলা সভাপতি ডা. সাদিক আহমেদ বলেন, জেলার মানুষের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে একটি মেডিকেল কলেজ স্থাপনের দাবি জানানো হচ্ছে এবং এ নিয়ে আন্দোলনও হয়েছে। তাঁর মতে, অবিলম্বে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দিয়ে ২৫০ শয্যার হাসপাতালটিকে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি জেলায় একটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়ারও দাবি জানান তিনি।
রোগী কল্যাণ সমিতির সহসভাপতি ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মুজিবুর রহমান মুজিব বলেন, সাধারণত দরিদ্র ও সীমিত আয়ের মানুষ সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন। তাঁদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। হাসপাতালটির বিদ্যমান সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধানের দাবি জানান তিনি। তাঁর বক্তব্যে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার ওপর নির্ভরশীল মানুষের চিকিৎসার অধিকার ও আর্থিক সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. প্রণয় কান্তি দাস স্বীকার করেছেন, প্রতিষ্ঠানটিতে নানা ধরনের সংকট রয়েছে। তিনি জানান, এসব সমস্যা সমাধানে কাজ চলছে এবং বিষয়গুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। জনবলসংকটের কারণে বিপুলসংখ্যক রোগীর চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এ ছাড়া ওষুধের কিছুটা ঘাটতি রয়েছে এবং তা সমাধানের জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান হাসপাতালটির তত্ত্বাবধায়ক।
মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের বর্তমান পরিস্থিতি জেলার সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে। শূন্য পদে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, অচল যন্ত্রপাতি মেরামত বা প্রতিস্থাপন, নিয়মিত পরীক্ষার উপকরণ সরবরাহ এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা কার্যকর করা গেলে রোগীদের দুর্ভোগ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে হাসপাতালের শয্যাসংকট ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতি বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করাও জরুরি। জেলার বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য মানসম্মত ও সাশ্রয়ী চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হলে শুধু অবকাঠামো নয়, জনবল, যন্ত্রপাতি, ওষুধ ও ব্যবস্থাপনার সমন্বিত উন্নয়ন প্রয়োজন।


