প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার সুরমা চা বাগানে সংঘটিত বহুল আলোচিত এক নারী পর্যটক ধর্ষণ মামলার পলাতক আসামি মো. নাসির (২৫) কে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেফতার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। র্যাব-৯ ও র্যাব-৭ এর যৌথ অভিযানে তাকে গ্রেফতার করা হয় বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর অবশেষে তার অবস্থান শনাক্ত করে অভিযান চালিয়ে তাকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে।
রবিবার (১৯ এপ্রিল) সন্ধ্যায় র্যাব-৯ সিলেটের মিডিয়া অফিসার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কে. এম. শহিদুল ইসলাম সোহাগ এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, গোয়েন্দা নজরদারি ও ধারাবাহিক অনুসন্ধানের ভিত্তিতে পলাতক আসামিকে শনাক্ত করা হয় এবং পরে যৌথ অভিযান পরিচালনা করে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
র্যাব সূত্রে জানা যায়, ২৩ মার্চ ২০২৬ বিকেলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিজয়নগর উপজেলার বারগড়িয়া এলাকার এক নারী তার স্বামীর অনুপস্থিতিতে ঘুরতে বের হন। তার সঙ্গে ছিলেন তার এক বন্ধু হোসেন মিয়া। তারা সিএনজি অটোরিকশাযোগে হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার শাহজাহানপুর ইউনিয়নের সুরমা চা বাগান এলাকায় ভ্রমণে যান। প্রকৃতির শান্ত পরিবেশে কিছু সময় কাটানোর উদ্দেশ্যেই তাদের এই যাত্রা ছিল বলে জানা গেছে।
তবে সন্ধ্যার দিকে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়। চা বাগানের নির্জন এলাকায় অবস্থানকালে হঠাৎ দুই ব্যক্তি লাঠিসোটা নিয়ে তাদের ধাওয়া করে। এ সময় হোসেন মিয়া কোনোমতে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও নারী পর্যটককে একা পেয়ে দুর্বৃত্তরা তাকে জোরপূর্বক নির্জন স্থানে নিয়ে যায় এবং সেখানে তার ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হয় বলে অভিযোগ উঠে।
ঘটনার পরপরই স্থানীয় লোকজন ভিকটিমকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যান। পরে তাকে প্রাথমিক সহায়তা প্রদান করা হয় এবং আইনগত প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভ ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়, যা দেশব্যাপী নিন্দার ঝড় তোলে।
ভুক্তভোগী নিজেই বাদী হয়ে মাধবপুর থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলার পরপরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তদন্তে নামে এবং র্যাব-৯ বিষয়টি ‘ছায়া তদন্ত’ হিসেবে গ্রহণ করে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেফতারের জন্য গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়।
র্যাবের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার পর থেকেই আসামিরা আত্মগোপনে চলে যায়। বিশেষ করে মো. নাসির দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান পরিবর্তন করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছিল। তবে প্রযুক্তি নির্ভর গোয়েন্দা নজরদারি এবং স্থানীয় তথ্যের ভিত্তিতে শেষ পর্যন্ত তার অবস্থান চিহ্নিত করা সম্ভব হয়।
গত ১৮ এপ্রিল রাত ১১টা ৫ মিনিটে চট্টগ্রামের মীরসরাই থানার মিঠাছড়া বাজার এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। র্যাব-৯ ও র্যাব-৭ এর যৌথ দল অভিযান চালিয়ে নাসিরকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের সময় সে পালানোর চেষ্টা করলেও র্যাব সদস্যরা তাকে আটক করতে সক্ষম হয়।
গ্রেফতারকৃত মো. নাসির হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার তেলিয়াপাড়া গ্রামের নুর উদ্দিনের ছেলে বলে জানা গেছে। তাকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
র্যাব জানায়, এই মামলায় এর আগে ২৮ মার্চ আরও একজন আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। ফলে এ পর্যন্ত দুইজন আসামিকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। তবে মামলার তদন্ত এখনো চলমান রয়েছে এবং ঘটনায় জড়িত অন্যান্য ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত আছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, এ ধরনের অপরাধ শুধু একটি ব্যক্তিগত অপরাধ নয়, বরং এটি সামাজিক নিরাপত্তার জন্যও গুরুতর হুমকি। বিশেষ করে পর্যটন এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা না গেলে এমন ঘটনা পুনরায় ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
ঘটনার পর স্থানীয় এলাকাবাসীর মধ্যেও ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই বলছেন, সুরমা চা বাগানসহ আশপাশের পর্যটন এলাকাগুলোতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় অপরাধীরা সহজে সুযোগ নেয়। তারা প্রশাসনের কাছে নিয়মিত টহল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে র্যাবের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অপরাধীদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। নারী নিরাপত্তা এবং পর্যটন এলাকার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নিয়মিত অভিযান ও গোয়েন্দা কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে। একই সঙ্গে পলাতক অন্যান্য আসামিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।
এই ঘটনার মাধ্যমে আবারও প্রশ্ন উঠেছে দেশের পর্যটন এলাকার নিরাপত্তা ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র নিয়ে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু আইন প্রয়োগ নয়, বরং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। না হলে এ ধরনের ভয়াবহ ঘটনা সমাজে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে, সুরমা চা বাগান ধর্ষণ মামলার পলাতক আসামির গ্রেফতার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে পুরো মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া এবং অন্যান্য জড়িতদের গ্রেফতার না হওয়া পর্যন্ত তদন্তের গুরুত্ব আরও বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।


