প্রকাশ: ০২ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
দেশে জ্বালানি উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে গভীর শিলাস্তরে অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদারের অংশ হিসেবে তিনটি অনুসন্ধান কূপ খননের বৃহৎ প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে একটি কূপ সিলেটে খনন করা হবে, যেখানে শুধু এই একটির জন্যই ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২৩২ কোটি টাকা। পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব পেয়েছে চীনের দুটি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান।
সরকারি সূত্র ও সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, দেশের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের প্রস্তাবের ভিত্তিতে মোট তিনটি অনুসন্ধান কূপ খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গভীর ভূগর্ভস্থ গ্যাস ও জ্বালানি সম্ভাবনা যাচাই করা হবে। তিনটি কূপ খননে মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৯৪৫ কোটি ৭১ লাখ ৯৫ হাজার টাকা।
এই প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে সিলেট অঞ্চলে “সিলেট-১২ নম্বর কূপ” খননের কাজ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ কূপ খননের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২৩২ কোটি ৭ লাখ ২৫ হাজার টাকা। এই কাজটি টার্ন-কি ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা হবে, যার অর্থ হলো—ডিজাইন থেকে শুরু করে যন্ত্রপাতি সরবরাহ, নির্মাণ, খনন ও চূড়ান্ত পরীক্ষার পুরো দায়িত্ব থাকবে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের ওপর।
সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এই প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বৈঠকে জ্বালানি খাতের এই কৌশলগত প্রকল্পকে দেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় শুধু সিলেট নয়, আরও দুটি কূপ খনন করা হবে। এর মধ্যে শ্রীকাইল ডিপ-১ এবং মোবারকপুর ডিপ-১ কূপ খননের কাজও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই দুটি কূপসহ মোট প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়। তিনটি দরপত্র জমা পড়ার পর সব প্রক্রিয়া শেষে চীনের একটি প্রতিষ্ঠানকে মূল কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
বৃহৎ অংশের জন্য দায়িত্ব পেয়েছে CNPC Chuanqing Drilling Engineering Company। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তির আওতায় শ্রীকাইল ডিপ-১ ও মোবারকপুর ডিপ-১ কূপ খননের কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। টার্ন-কি ভিত্তিতে এই অংশের প্রকল্প ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৫ কোটি ৯৪ লাখ ৭০ হাজার ৫৭৯ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৭১৩ কোটি টাকার সমপরিমাণ।
অন্যদিকে সিলেট অঞ্চলের আলাদা কূপ খনন প্রকল্প “সিলেট-১২ নম্বর কূপ” বাস্তবায়নের দায়িত্ব পেয়েছে Sinopec International Petroleum Service Corporation। এই অংশে ব্যয় হবে প্রায় ১ কোটি ৬২ লাখ ২২ হাজার ৪৫০ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৩২ কোটি ৭ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, সিলেট অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই গ্যাস ও অন্যান্য খনিজ সম্পদের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা চলছে। দেশের পূর্বাঞ্চলের এই এলাকাটি ভূগর্ভস্থ জ্বালানির সম্ভাবনার দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত। নতুন এই কূপ খনন কার্যক্রম সফল হলে দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় তা ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো গভীর শিলাস্তরে থাকা গ্যাসের সম্ভাব্য মজুদ চিহ্নিত করা এবং ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য ভিত্তি তৈরি করা। বিশেষ করে শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা পূরণে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারকরা।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তি ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি খনন কার্যক্রমের সময় পরিবেশগত ঝুঁকি ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা বিষয়েও বিশেষ নজর রাখা হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে খনন কাজের নির্ভুলতা ও সফলতার হার বাড়ানো সম্ভব হবে।
সিলেট অঞ্চলে এই ধরনের বৃহৎ প্রকল্পকে ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ এটিকে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত হিসেবে দেখছেন, আবার অনেকে পরিবেশ ও ভূগর্ভস্থ স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। তবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর দাবি, সব ধরনের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে কাজ পরিচালনা করা হবে।
জ্বালানি খাত বিশ্লেষকদের মতে, দেশের গ্যাস সংকট দীর্ঘদিন ধরে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে। নতুন অনুসন্ধান কূপগুলো সফল হলে আমদানি নির্ভরতা কিছুটা হলেও কমতে পারে। বিশেষ করে শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং গৃহস্থালি জ্বালানি সরবরাহে এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যায়ে বিদেশি প্রযুক্তি ও দক্ষতার ব্যবহারকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক মানের কোম্পানি যুক্ত হওয়ায় খনন কার্যক্রমে প্রযুক্তিগত ঝুঁকি কমবে এবং সফলতার সম্ভাবনা বাড়বে।
সব মিলিয়ে, সিলেটসহ দেশের তিনটি স্থানে কূপ খননের এই বৃহৎ প্রকল্পকে জ্বালানি খাতের জন্য একটি কৌশলগত উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন কেবল সময়ই বলে দেবে, এই অনুসন্ধান কতটা সফলভাবে দেশের জ্বালানি ভবিষ্যৎকে নতুন দিশা দিতে পারে।
সময়ের সন্ধান অনলাইন সবসময় দেশের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পের বিষয়ে নিরপেক্ষ, যাচাইভিত্তিক এবং দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশনে অঙ্গীকারবদ্ধ।


