প্রকাশ: ০২ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মে দিবস উপলক্ষে রাজধানীর মিরপুর এলাকায় আয়োজিত এক শ্রমিক সমাবেশে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করে সেই অর্থ দেশের শিল্প ও কৃষি খাতে ভর্তুকি দেওয়ার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)। সমাবেশে বক্তারা বলেন, শ্রমজীবী মানুষের রক্ত ও শ্রম শোষণ করে কোনো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক চুক্তি কিংবা উচ্চমূল্যের সামরিক ও বাণিজ্যিক ক্রয় গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
শুক্রবার (১ মে) মিরপুরের সেনপাড়া এলাকায় ভিশন মোড়ে আয়োজিত এই সমাবেশে শ্রমিক, কৃষক ও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নেতারা অংশ নেন। মে দিবসের ঐতিহাসিক গুরুত্ব স্মরণ করে তারা শ্রমিক শ্রেণির অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন আরও জোরদার করার আহ্বান জানান।
সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে সিপিবি ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি হাসান হাফিজুর রহমান সোহেল বলেন, মহান মে দিবস শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের প্রতীক। তিনি বলেন, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং শ্রমিকবান্ধব রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি। তার বক্তব্যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিদ্যমান বাণিজ্য চুক্তি বাতিলের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন এবং সেই অর্থ দেশের শিল্প ও কৃষি খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানান।
তিনি আরও বলেন, শ্রমিকের কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে বিদেশি সামরিক বা বাণিজ্যিক স্বার্থে ব্যয় করা ন্যায়সঙ্গত নয়। দেশের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করতে হলে দেশীয় উৎপাদন ও কৃষি খাতকে শক্তিশালী করতে হবে।
সমাবেশে সিপিবি ঢাকা মহানগর উত্তরের সাধারণ সম্পাদক লূনা নূর বলেন, কোনো হকারকে পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ করা যাবে না। তিনি বলেন, নগর অর্থনীতিতে হকারদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে এবং তাদের জীবিকা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। পরিকল্পিত পুনর্বাসনের মাধ্যমে তাদের মানবিক অধিকার রক্ষা করতে হবে।
অন্যদিকে সিপিবি নেতা লাকী আক্তার শ্রমজীবী মানুষের বিভিন্ন খাতের সমস্যা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, চা শ্রমিক, হোটেল শ্রমিক, পরিবহন শ্রমিকসহ সব প্রান্তিক শ্রমিকের জন্য ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সাপ্তাহিক ছুটি, চিকিৎসা সুবিধা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। তার মতে, শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত না হলে দেশের সার্বিক উন্নয়ন টেকসই হবে না।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতের শ্রমিকদের প্রসঙ্গ তুলে ধরে সিপিবি নেতা ফেরদৌস আহমেদ উজ্জ্বল বলেন, আইটি ও আউটসোর্সিং খাতের শ্রমিকদেরও আনুষ্ঠানিকভাবে শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। তিনি চাকরির নিরাপত্তা, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা নিশ্চিতকরণ এবং চুক্তিভিত্তিক শোষণ বন্ধ করার পাশাপাশি ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানান।
সমাবেশে জামাল হায়দার মুকুল মে দিবসের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, ১৮৮৬ সালের শিকাগো শহরের শ্রমিকদের আট ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে যে রক্তঝরা আন্দোলন হয়েছিল, তা আজও বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করছে।
সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে বলেন, বাংলাদেশের শ্রমিকরা আজও ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং চাকরির নিরাপত্তার জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা ছাড়া প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়।
এছাড়া হকার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সেকেন্দার হায়াত বলেন, পুনর্বাসন ছাড়া হকার উচ্ছেদ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি শ্রমজীবী সব শ্রেণিকে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের আহ্বান জানান।
সমাবেশে বক্তারা আট ঘণ্টা কর্মদিবস নিশ্চিত করা, ন্যায্য মজুরি প্রদান, সমকাজে সমমজুরি নীতি বাস্তবায়ন, নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা, চাকরির নিরাপত্তা প্রদান, অবসরকালীন সুবিধা চালু এবং অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। পাশাপাশি তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি বাতিলের দাবিও পুনর্ব্যক্ত করেন।
সমাবেশ শেষে সাংস্কৃতিক পর্বে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী গণসংগীত পরিবেশন করে। শ্রমিক আন্দোলনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে কেন্দ্র করে পরিবেশিত গানগুলো উপস্থিত জনতার মধ্যে আবেগ ও উদ্দীপনা সৃষ্টি করে।
বিশ্লেষকদের মতে, মে দিবসকে কেন্দ্র করে শ্রমিক সংগঠনগুলোর এই ধরনের কর্মসূচি শ্রমিক অধিকার নিয়ে চলমান সামাজিক ও রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও জোরালো করেছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি ও দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক নীতির মধ্যে ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সব মিলিয়ে সিপিবির এই সমাবেশে শ্রমিক অধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা, নগর ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন দাবি ও বক্তব্য উঠে এসেছে, যা দেশের শ্রমনীতি ও উন্নয়ন ভাবনায় নতুন আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করেছে।


