প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
খুলনা মহানগরীর লবণচরা এলাকায় মায়ের সঙ্গে বাজার করে বাড়ি ফেরার পথে দুর্বৃত্তদের হামলায় নিহত হয়েছেন খুশি বেগম (২৫) নামে এক গৃহবধূ। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সন্ধ্যায় জিন্নাহপাড়ার বউবাজার এলাকার ৭ নম্বর গলির মুখে রিকশা থেকে নামার পর তাঁকে গুলি করা হয়। হামলার সময় তাঁর মা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় তাঁকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত খুশি বেগম দুই সন্তানের জননী। আকস্মিক এ ঘটনায় তাঁর পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। মায়ের চোখের সামনে মেয়েকে হারানোর ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করেছে। কী কারণে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে এবং কারা এতে জড়িত, তা নিশ্চিত করতে তদন্ত করছে পুলিশ।
পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য অনুযায়ী, খুশির স্বামীর সঙ্গে মাদক ব্যবসা নিয়ে বিরোধের জেরে এ ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। তবে হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট কারণ এবং হামলাকারীদের পরিচয় তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা সম্পর্কে অভিযোগ থাকলেও তদন্ত শেষ হওয়ার আগে তা চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত বলে বিবেচনা করা যায় না।
রিকশা থেকে নামতেই হামলা
খুশি বেগমের মায়ের বর্ণনা অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তাঁরা বাজার করা শেষে রিকশায় করে বাড়ির কাছে পৌঁছান। জিন্নাহপাড়ার ৭ নম্বর গলির মুখে রিকশা থামলে খুশি আগে নামেন। ঠিক সেই সময় মোটরসাইকেলে আসা দুই ব্যক্তি তাঁর কাছে এসে স্বামী কোথায়, তা জানতে চান।
খুশি তাঁদের জানান, তাঁর স্বামী কোথায় গেছেন, তা তিনি জানেন না। এরপরই পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। খুশির মায়ের অভিযোগ, ওই দুই ব্যক্তির একজন অস্ত্র বের করে তাঁর মেয়েকে গুলি করেন। অন্যজন ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা চালান। ঘটনাটি এত দ্রুত ঘটে যে, তাঁর সামনে মেয়ের ওপর হামলা হলেও তাঁকে রক্ষা করার সুযোগ তৈরি হয়নি।
খুশির মা বলেন, তিনি বুঝে ওঠার আগেই হামলাকারীরা মেয়ের ওপর আক্রমণ চালিয়ে মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যায়। পরে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে স্থানীয়দের সহযোগিতায় খুশিকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। মেয়েকে হারিয়ে তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
পরিবারের জন্য ঘটনাটি ছিল আকস্মিক ও মর্মান্তিক। বাজার শেষে বাড়ি ফেরার মতো স্বাভাবিক একটি মুহূর্ত যে এমন পরিণতি ডেকে আনবে, তা তাঁদের ধারণার বাইরে ছিল। বিশেষ করে দুই সন্তানের মা খুশির মৃত্যুতে তাঁর সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ঘটনাস্থলে হামলার পর হাসপাতালে নেওয়া হয়
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে জানা যায়, সন্ধ্যা ৭টার দিকে বউবাজার এলাকার ৭ নম্বর গলির মুখে মোটরসাইকেল নিয়ে দুই যুবক অবস্থান করছিলেন। কিছুক্ষণ পর খুশি ও তাঁর মাকে বহনকারী রিকশা সেখানে এসে থামে। খুশি রিকশা থেকে নামার পর ওই দুই ব্যক্তি তাঁর কাছে এগিয়ে যান এবং স্বামীর বিষয়ে জানতে চান।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, এরপর খুশির ওপর গুলি চালানো হয়। তিনি মাটিতে পড়ে গেলে হামলাকারীদের একজন তাঁর ওপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আশপাশের লোকজন এগিয়ে আসতে শুরু করলে হামলাকারীরা মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যায়।
পরে স্থানীয়দের সহযোগিতায় খুশিকে দ্রুত খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। তাঁর মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ঘটনার পরপরই এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। জনবসতিপূর্ণ এলাকায় এ ধরনের হামলার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তবে হামলাকারীদের শনাক্ত, তাঁদের অবস্থান এবং ঘটনার পেছনের কারণ সম্পর্কে তদন্তের ফল না আসা পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।
স্বামীর সঙ্গে বিরোধের বিষয়টি খতিয়ে দেখছে পুলিশ
লবণচরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সৈয়দ মোশারেফ হোসেন জানান, নিহত খুশি বেগম ও তাঁর স্বামী সুমন হাওলাদার ওরফে ব্লেড বাবুর বিরুদ্ধে মাদকসংক্রান্ত মামলা রয়েছে বলে পুলিশের কাছে তথ্য আছে। স্বামীর সঙ্গে মাদক ব্যবসা নিয়ে বিরোধের কারণে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে হত্যার পেছনে প্রকৃত কারণ কী, কারা সরাসরি হামলায় অংশ নিয়েছে এবং অন্য কেউ এতে জড়িত কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি। হামলাকারীদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। মরদেহের ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়াও অনুসরণ করা হচ্ছে।
পুলিশের এই বক্তব্য অনুযায়ী, মাদকসংক্রান্ত বিরোধের বিষয়টি তদন্তের একটি সম্ভাব্য দিক। কিন্তু শুধু প্রাথমিক ধারণার ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য বা জড়িত ব্যক্তিদের দায় নির্ধারণ করা যায় না। ঘটনার আগে-পরে কী ঘটেছিল, খুশির স্বামীর সঙ্গে কারও বিরোধ ছিল কি না এবং হামলার সময় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল ও হামলাকারীদের পরিচয় সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ
খুশি বেগমের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের সদস্য হারানোর ঘটনা নয়; এর প্রভাব পড়েছে তাঁর দুই সন্তানের জীবনেও। মাকে হারানোর এই শোক তাঁদের পরিবারকে দীর্ঘদিন বহন করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের জন্য শোক সামলানোর পাশাপাশি পরবর্তী জীবনের নানা দায়িত্বও সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
এ ধরনের হত্যাকাণ্ডে নিহত ব্যক্তির স্বজনেরা সাধারণত দ্রুত তদন্ত ও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা করেন। খুশির মাও প্রকাশ্যে হত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচার দাবি করেছেন। তাঁর বক্তব্যে মেয়েকে হারানোর বেদনার পাশাপাশি অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট।
এ ঘটনায় তদন্তের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখা জরুরি। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ঘটনাস্থলের আলামত, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য বিশ্লেষণ করে ঘটনার প্রকৃত চিত্র নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে কোনো অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত না করে আইনানুগ তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে দায় নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
খুলনার লবণচরা এলাকায় গৃহবধূ খুশি বেগম হত্যাকাণ্ডের পর এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হামলাকারীদের শনাক্ত করা এবং ঘটনার পেছনের কারণ উদ্ঘাটন করা। পুলিশ জানিয়েছে, তদন্ত চলছে। নিহতের পরিবার ও স্থানীয়দের প্রত্যাশা, তদন্ত দ্রুত এগিয়ে যাবে, প্রকৃত অপরাধীরা আইনের আওতায় আসবে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে।


