প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
যুক্তরাজ্যের এসেক্সের কলচেস্টার উপকূলের ওয়েস্ট মার্সি সমুদ্রসৈকতে ঘটে গেছে এক হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনা। গ্রীষ্মকালীন ছুটির আনন্দ মুহূর্ত নিমিষেই পরিণত হয়েছে শোকের মাতমে। পরিবারের এক শিশুকে উত্তাল জোয়ারের স্রোত থেকে উদ্ধারের মরিয়া চেষ্টায় পানিতে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি এক মা ও তাঁর ১৫ বছর বয়সী কন্যা। মানবিক সাহসিকতার এই ঘটনা শুধু যুক্তরাজ্যের বাংলাদেশি কমিউনিটিতেই নয়, বাংলাদেশেও গভীর শোকের সৃষ্টি করেছে।
নিহত দুইজনের একজন যুক্তরাজ্য যুবদলের নেতা ডা. মনসুর রহমানের স্ত্রী এবং অপরজন তাঁদের কিশোরী কন্যা। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, নিহত নারী যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি ও সিলেটের ছাতক উপজেলার বাসিন্দা মুজিবুর রহমানের কন্যা। অন্যদিকে ডা. মনসুর রহমান সিলেটের বিশিষ্ট বিএনপি নেতা শেখ মখন মিয়ার সন্তান। তাঁদের আকস্মিক মৃত্যুতে যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং প্রবাসী মহলে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
যুক্তরাজ্য বিএনপির আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ এবং সদস্যসচিব খসরুজ্জামান খসরু বৃহস্পতিবার ভোরে এক শোকবার্তায় দুর্ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন। তাঁরা নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে বলেন, এটি শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো প্রবাসী বাংলাদেশি সমাজের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্বজনদের বর্ণনা অনুযায়ী, গ্রীষ্মকালীন ছুটিকে ঘিরে পরিবারের সদস্যরা ওয়েস্ট মার্সি সমুদ্রসৈকতে বেড়াতে গিয়েছিলেন। সমুদ্রপাড়ে সবাই আনন্দঘন পরিবেশে সময় কাটাচ্ছিলেন। ঠিক সেই সময় হঠাৎ প্রবল জোয়ারের স্রোত পরিবারের এক ছোট শিশুকে গভীর পানির দিকে টেনে নিয়ে যায়। মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেয়।
শিশুটিকে বিপদে পড়তে দেখে কোনো কিছু চিন্তা না করেই পানিতে ঝাঁপ দেন তাঁর মা এবং ১৫ বছর বয়সী বড় বোন। তাঁদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল শিশুটিকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনা। প্রবল স্রোতের সঙ্গে লড়াই করে তাঁরা শিশুটিকে উদ্ধার করতে সক্ষম হন। কিন্তু সেই সাহসিকতার মূল্য দিতে হয় নিজের জীবন দিয়ে। উত্তাল জোয়ারের টানে মা ও মেয়ে দুজনই গভীর পানিতে তলিয়ে যান। উদ্ধারকারীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও শেষ পর্যন্ত তাঁদের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।
এই হৃদয়বিদারক ঘটনার সময় সৈকতে উপস্থিত ছিলেন নিহত নারীর বাবা মুজিবুর রহমান। শোকাহত অবস্থায় তিনি গণমাধ্যমকে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করলেও মানসিকভাবে ভেঙে পড়ায় বিস্তারিত কিছু বলতে পারেননি। পরিবারের অন্য সদস্যরাও চরম মানসিক আঘাতের মধ্যে রয়েছেন।
স্বজনদের দাবি, দুর্ঘটনায় পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্য আহত হন। তাঁদের মধ্যে গুরুতর আহতদের দ্রুত হেলিকপ্টারে করে লন্ডনের একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকরা তাঁদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছেন বলে জানা গেছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত তাঁদের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি।
ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাজ্যের জরুরি সেবা সংস্থাগুলো দ্রুত উদ্ধার অভিযান শুরু করে। এসেক্স পুলিশ, এইচএম কোস্টগার্ড, অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস এবং রয়্যাল ন্যাশনাল লাইফবোট ইনস্টিটিউট (আরএনএলআই) সমন্বিতভাবে উদ্ধার তৎপরতা চালায়। দুর্ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় ঘটনাস্থলে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
এসেক্স পুলিশের এক মুখপাত্র জানান, কলচেস্টারের ওয়েস্ট মার্সি এলাকায় একটি গুরুতর জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশ সদস্যরা কাজ করছেন। উদ্ধার কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে সাধারণ মানুষকে সাময়িকভাবে সিভিউ অ্যাভিনিউ এবং সংলগ্ন সৈকত এলাকা এড়িয়ে চলার অনুরোধ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনাটির কারণ ও সার্বিক পরিস্থিতি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া এইচএম কোস্টগার্ডের হেলিকপ্টার দীর্ঘ সময় আকাশ থেকে তল্লাশি চালায়। পাশাপাশি রয়্যাল ন্যাশনাল লাইফবোট ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় ওয়েস্ট মার্সির ইনশোর লাইফবোটের পাশাপাশি ক্লাক্টন-অন-সি স্টেশন থেকে দুটি বিশেষ উদ্ধার নৌযান ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়। প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মীরা সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ ও তীব্র স্রোতের মধ্যেও নিরলসভাবে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেন।
যুক্তরাজ্যের উপকূলীয় এলাকাগুলোতে বিশেষ করে জোয়ারের সময় পানির স্রোত অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। অনেক ক্ষেত্রেই স্রোতের গতি বাইরে থেকে বোঝা যায় না। ফলে পর্যটকদের জন্য সতর্কবার্তা থাকলেও অনেক সময় অল্প কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। উদ্ধার সংস্থাগুলো বারবার সতর্ক করে বলছে, বিপদে পড়া কাউকে উদ্ধারে নামার আগে প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মীদের খবর দেওয়া এবং নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর যুক্তরাজ্যের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে শোকের ছায়া নেমে আসে। বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও কমিউনিটি সংগঠন নিহত মা ও মেয়ের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে শোকবার্তা প্রকাশ করেছে। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের সাহসিকতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে লিখেছেন, নিজের জীবন উৎসর্গ করে একটি শিশুকে বাঁচানোর এই আত্মত্যাগ চিরদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
সিলেট অঞ্চলেও ঘটনাটি গভীর শোকের সৃষ্টি করেছে। নিহতদের স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষী এবং রাজনৈতিক সহকর্মীরা তাঁদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিভিন্ন সংগঠনও পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে। তাঁদের মরদেহ দেশে আনা হবে নাকি যুক্তরাজ্যেই দাফন করা হবে, সে বিষয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আবারও স্মরণ করিয়ে দিল, প্রকৃতির শক্তির কাছে মানুষ কতটা অসহায়। কয়েক মুহূর্ত আগেও যে পরিবারটি আনন্দে ছুটি কাটাচ্ছিল, মুহূর্তের ব্যবধানে সেই পরিবার হারিয়েছে দুই প্রিয় সদস্যকে। তবে মৃত্যুর আগমুহূর্তেও এক শিশুর জীবন রক্ষায় মা ও মেয়ের অসীম সাহসিকতা মানবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। যুক্তরাজ্যের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে এবং তদন্ত শেষ হলে এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছে।


