প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
পুলিশ জানিয়েছে, নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই বিশেষ অভিযানের প্রধান লক্ষ্য। বিশেষ করে রাতে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাই ও অপরাধের আশঙ্কা কমাতে পুলিশের উপস্থিতি ও তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। অভিযানের অংশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও পয়েন্টে পৃথক পুলিশ টিম দায়িত্ব পালন করবে।
রোববার রাত থেকেই নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের এই তৎপরতা দৃশ্যমান হয়েছে। রাত ১০টার দিকে চৌহাট্টা এলাকায় দায়িত্বে থাকা বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্যকে অভিযানের বিষয়ে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন সিলেট মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। এরপর সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যরা নগরীর বিভিন্ন এলাকায় দায়িত্ব পালন শুরু করেন।
এসএমপি সূত্রে জানা গেছে, বিশেষ অভিযানে নিয়মিত মামলার আসামি, বিভিন্ন মামলায় পরোয়ানাভুক্ত ব্যক্তি, মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজন, ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের মাধ্যমে সাজাপ্রাপ্ত এবং মেট্রোপলিটন অধ্যাদেশ অনুযায়ী গ্রেপ্তারযোগ্য ব্যক্তিদের বিষয়ে বিশেষ নজরদারি করা হবে। পাশাপাশি বখাটে ও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের বিরুদ্ধেও প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নগরীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে পুলিশের পৃথক টিম দায়িত্ব পালন করবে। প্রতিটি টিমে প্রায় ১০ জন করে সদস্য থাকার কথা রয়েছে। দায়িত্ব পালনকালে সন্দেহজনক ব্যক্তিদের থামিয়ে তল্লাশি এবং প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই করা হবে। কোনো ব্যক্তির চলাফেরা বা কর্মকাণ্ডে সন্দেহ তৈরি হলে পরিস্থিতি অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের এই বিশেষ অভিযানের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি সামনে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, নগরীতে সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় কিশোর ও তরুণদের একটি অংশের সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া যায়। ফলে অপরাধ সংঘটনের আগেই সন্দেহজনক গতিবিধি শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
রাতে নগরীর অলিগলি, বিভিন্ন মোড় কিংবা নির্জন এলাকায় অকারণে দলবদ্ধ হয়ে আড্ডা দেওয়ার বিষয়েও নজর রাখবে পুলিশ। তবে শুধু বয়স বা কোনো এলাকায় উপস্থিত থাকার কারণে কাউকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা না করে সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড, পরিস্থিতি এবং আইনগত ভিত্তির ওপর নির্ভর করেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে প্রত্যাশা করছেন নগরবাসী।
সিলেট মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, নগরীতে সংঘটিত ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধের ঘটনায় কিশোর এবং তাদের চেয়ে কিছুটা বেশি বয়সী তরুণদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। সাধারণ মানুষ ও পথচারীরা যাতে রাতে নির্বিঘ্নে বাড়ি ফিরতে পারেন এবং চুরি-ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা কমানো যায়, সে লক্ষ্যেই বিশেষ অভিযান শুরু করা হয়েছে।
তিনি জানান, এ অভিযান শুধু এক রাতের জন্য নয়; প্রতিদিনই তা চলবে। নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পুলিশের উপস্থিতি বাড়ানোর পাশাপাশি অপরাধপ্রবণ এলাকা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশের পক্ষ থেকে রাতের অপ্রয়োজনীয় আড্ডা নিয়েও সতর্ক করা হয়েছে। উপকমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, যাদের রাতে রাস্তাঘাটে কোনো প্রয়োজন নেই, তারা যেন অকারণে অলিগলি বা বিভিন্ন মোড়ে গিয়ে আড্ডা না দেন এবং অপরাধপ্রবণ তরুণদের সঙ্গে মেলামেশা এড়িয়ে চলেন। এমন কর্মকাণ্ড সন্দেহজনক মনে হলে পুলিশ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।
নগরবাসীর নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় পুলিশের এই উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। রাতের বেলায় কর্মস্থল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, পরিবহনকেন্দ্র কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজে বের হওয়া মানুষ অনেক সময় নির্জন সড়ক বা গলিপথ দিয়ে চলাচল করেন। এসব এলাকায় অপরাধের আশঙ্কা থাকলে মানুষের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয় এবং নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি হয়। পুলিশের নিয়মিত টহল ও নজরদারি বাড়লে সেই উদ্বেগ কিছুটা কমতে পারে।
বিশেষ করে ছিনতাইয়ের মতো অপরাধের ক্ষেত্রে অপরাধ সংঘটনের পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আগে থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করে নজরদারি বাড়ানো কার্যকর হতে পারে। নগরীর ব্যস্ত এলাকার পাশাপাশি তুলনামূলক নির্জন সড়ক, গলি ও মোড়গুলোতেও পুলিশি তৎপরতা বাড়ানো হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ তৈরি হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে কিশোর গ্যাং মোকাবিলায় শুধু অভিযান বা গ্রেপ্তারই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়—এমন মতও রয়েছে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলে। কিশোরদের একটি অংশ পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক পরিবেশের নানা সমস্যার কারণে অপরাধপ্রবণ গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে পারে। তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদেরও কিশোরদের বিষয়ে নজর রাখা প্রয়োজন।
অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আগেই কিশোরদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, শিক্ষা ও ইতিবাচক সামাজিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে সুফল পাওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে কোনো কিশোর অপরাধে জড়িত হলে তার বয়স, ভূমিকা ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে আইন অনুযায়ী যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
সিলেট নগরীতে পুলিশের বিশেষ অভিযান শুরু হওয়ার পর এখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, এর মাধ্যমে ছিনতাই, মাদক ও অন্যান্য অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বাস্তব অগ্রগতি দেখা যাবে। একই সঙ্গে অভিযান পরিচালনার সময় সাধারণ নাগরিক যেন অযথা হয়রানির শিকার না হন, সেদিকেও যথাযথ নজর থাকবে—এমন প্রত্যাশা রয়েছে নগরবাসীর।
পুলিশ জানিয়েছে, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অভিযান প্রতিদিন অব্যাহত থাকবে। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের টহল, তল্লাশি ও নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি অপরাধের সঙ্গে জড়িত বা আইন অনুযায়ী গ্রেপ্তারযোগ্য ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সিলেট নগরীর রাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই অভিযান কতটা কার্যকর হয়, তা আগামী দিনগুলোতে স্পষ্ট হবে। তবে পুলিশের দৃশ্যমান উপস্থিতি, নিয়মিত নজরদারি এবং অপরাধপ্রবণ এলাকায় দ্রুত তৎপরতা সাধারণ মানুষের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে নগরবাসীর সহযোগিতা ও সচেতনতা থাকলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের এই উদ্যোগ আরও কার্যকর হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।


