প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
ইতালির ভেনিসে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিতে গিয়ে বাংলাদেশি অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন একদল প্রবাসী বাংলাদেশির হেনস্তার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন। তার দাবি, পার্কে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানোর সময় কয়েকজন বাংলাদেশি তার দিকে পানি, কোমল পানীয় ও ডিম ছুড়ে মারেন। এ সময় তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার পাশাপাশি তার মুঠোফোন ফেলে দেওয়া হয় এবং কানের পাশেও আঘাত করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
ঘটনার পর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লাইভে এসে বাঁধন এ বিষয়ে বিস্তারিত জানান। পরে ঘটনার কয়েকটি ভিডিওও প্রকাশ করেন তিনি। ভিডিওগুলোতে কয়েকজন ব্যক্তিকে তার দিকে এগিয়ে যেতে, উত্তেজিত অবস্থায় কথা বলতে এবং ধস্তাধস্তিতে জড়াতে দেখা যায় বলে জানিয়েছেন অভিনেত্রী। তবে প্রকাশিত ভিডিওর সব ঘটনার পূর্ণ প্রেক্ষাপট স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বাঁধনের অভিযোগ, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশে হওয়া ছাত্র-জনতার আন্দোলনে তার সক্রিয় অবস্থানের কারণে তাকে লক্ষ্য করে এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীদের কয়েকজন নিজেদের নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কর্মী এবং ‘বঙ্গবন্ধুর সৈনিক’ হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন।
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বাঁধন জানান, তিনি তার ভাইয়ের পরিবারের সঙ্গে একটি পার্কে গিয়েছিলেন। সেখানে একদল বাংলাদেশি তাকে ঘিরে ধরে উত্তেজিত আচরণ করেন। তার শরীরে পানি ও কোমল পানীয় ছুড়ে মারা হয়। এতে তার পোশাক ভিজে যায়। একপর্যায়ে তার ওপর হাত তোলা হয় এবং কানের পাশেও আঘাত করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
বাঁধনের ভাষ্য অনুযায়ী, তার মুঠোফোনও ফেলে দেওয়া হয়। তার ভাইয়ের স্ত্রীকেও ধাক্কা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে তার ভাই তাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন।
ঘটনার পর প্রকাশিত একটি ভিডিওতে কয়েকজন ব্যক্তিকে বাঁধনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক স্লোগান ও মন্তব্য করতে দেখা যায়। ভিডিওতে তাদের একজন বাঁধনকে ‘জুলাই জঙ্গি’ বলে আখ্যা দেন এবং নিজেদের ‘ভেনিস ছাত্রলীগ’ হিসেবে পরিচয় দেওয়ার কথা শোনা যায়। একই ভিডিওতে তাকে ‘দেশদ্রোহী’ বলেও আখ্যা দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
বাঁধন তার ফেসবুক লাইভে বলেন, তিনি ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন এবং এ নিয়ে তার কোনো দ্বিধা নেই। তার অভিযোগ, হামলাকারীরা তাকে ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে উল্লেখ করে আক্রমণাত্মক আচরণ করেন। একই সঙ্গে তাকে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ বলতে বাধ্য করার চেষ্টা এবং সেই দৃশ্য ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের অভিযোগও করেন তিনি।
অভিনেত্রী বলেন, তার রাজনৈতিক অবস্থান বা কোনো আন্দোলনে অংশগ্রহণের কারণে বিদেশের মাটিতে তাকে শারীরিকভাবে হেনস্তা করার অধিকার কারও নেই। তার ভাষ্য, একজন বাংলাদেশি শিল্পী হিসেবে তিনি ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিতে গিয়েছেন এবং সেখানে দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। এ ধরনের ঘটনা বাংলাদেশের ভাবমূর্তির জন্যও নেতিবাচক বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে বাঁধন বলেন, একজন আজমেরী হক বাঁধনকে দমানো সহজ হবে না। তার বক্তব্যে ক্ষোভ ও হতাশার পাশাপাশি নিজের অবস্থান নিয়ে দৃঢ়তার কথাও উঠে আসে। তিনি অভিযোগ করেন, হামলাকারীরা নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় সামনে এনে তাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করেছেন।
বাঁধন আরও দাবি করেন, তার সঙ্গে থাকা পরিবারের সদস্যরাও এই ঘটনার মধ্যে পড়ে যান। বিশেষ করে তার ভাইয়ের স্ত্রীকে ধাক্কা দেওয়ার অভিযোগ করেছেন তিনি। ফলে ঘটনাটি শুধু তাকে ঘিরে ছিল না, সঙ্গে থাকা পরিবারের সদস্যদেরও পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়েছিল বলে তার বক্তব্যে উঠে এসেছে।
ভেনিসে তিনি যে সিনেমা নিয়ে চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিয়েছেন, সেটির পরিচালক রুবাইয়াত হোসেন—এ কথাও ফেসবুক লাইভে উল্লেখ করেন বাঁধন। পরিচালক রুবাইয়াত হোসেনের বাবা প্রয়াত সৈয়দ আবুল হোসেন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন—এমন প্রসঙ্গ তুলে বাঁধন বলেন, তিনি রুবাইয়াত হোসেনের সঙ্গে কাজ করেছেন এবং জুলাইয়ের আন্দোলনের পরও তার সঙ্গে কাজ করেছেন।
এ প্রসঙ্গে বাঁধনের বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে শিল্পীদের কাজ ও মতপ্রকাশকে আক্রমণের লক্ষ্য বানানো উচিত নয়। তবে তিনি যে রাজনৈতিক পরিচয় ও বক্তব্যের কথা উল্লেখ করেছেন, সেগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আলাদা বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া গেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ভিডিও বার্তায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের প্রসঙ্গও তোলেন বাঁধন। তিনি জানতে পেরেছেন, জয়ও ভেনিসে অবস্থান করছেন—এমন তথ্য উল্লেখ করে তার কাছে ঘটনাটি পৌঁছে দেওয়ার কথা বলেন অভিনেত্রী। তবে এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ঘটনার পর ভেনিসের একটি থানায় অভিযোগ করেছেন বলে জানান বাঁধন। বিদেশের মাটিতে একজন বাংলাদেশি নাগরিকের সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটলে স্থানীয় আইন অনুযায়ী অভিযোগের তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকে। অভিযোগের পর ইতালির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঘটনাটি কীভাবে দেখছে এবং তদন্তের কোনো অগ্রগতি হয়েছে কি না, তা পরবর্তী সময়ে স্পষ্ট হতে পারে।
বাঁধনের অভিযোগ সামনে আসার পর প্রবাসী বাংলাদেশিদের আচরণ এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্যের প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিরা বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শে বিভক্ত হতে পারেন। দেশে রাজনৈতিক উত্তেজনা বা মতবিরোধের প্রভাব কখনো কখনো প্রবাসী সমাজেও দেখা যায়। কিন্তু মতের অমিল থেকে শারীরিক আক্রমণ বা হেনস্তার অভিযোগ তৈরি হলে তা ব্যক্তি নিরাপত্তার পাশাপাশি পুরো প্রবাসী সম্প্রদায়ের ভাবমূর্তিকেও প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
একজন শিল্পী যখন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মতো বৈশ্বিক আয়োজনে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন, তখন তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া যেকোনো ঘটনা আন্তর্জাতিক পরিসরেও আলোচনায় আসতে পারে। ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র আয়োজন। সেখানে বাংলাদেশের কোনো শিল্পী বা নির্মাতার অংশগ্রহণ দেশের চলচ্চিত্রাঙ্গনের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ। সেই প্রেক্ষাপটে উৎসবে অংশ নিতে যাওয়া একজন শিল্পীর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে হেনস্তার অভিযোগ স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও বা কোনো পক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে ঘটনার পুরো সত্যতা নির্ধারণ করা কঠিন। অভিযোগের প্রকৃতি, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ভিডিও ফুটেজ এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তদন্ত—সবকিছু বিবেচনায় নিলেই ঘটনার পূর্ণ চিত্র স্পষ্ট হতে পারে। তাই তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কাউকে চূড়ান্তভাবে দায়ী করা কিংবা অভিযোগকে বিচারিকভাবে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয়।
বাঁধনের অভিযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, রাজনৈতিক মত বা অবস্থানের কারণে একজন মানুষ বিদেশের মাটিতে নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়েছেন বলে তিনি দাবি করেছেন। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক মতপার্থক্য গণতান্ত্রিক সমাজের স্বাভাবিক অংশ হলেও শারীরিক আক্রমণ, ভয় দেখানো বা হেনস্তার অভিযোগ কোনোভাবেই হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
এখন ঘটনাটির পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে নজর থাকবে। বাঁধনের করা অভিযোগের ভিত্তিতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ কোনো তদন্ত শুরু করেছে কি না, অভিযুক্তদের শনাক্ত করা হয়েছে কি না এবং ঘটনার জন্য আইনগত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় কি না—এসব বিষয় সামনে আসতে পারে।
ভেনিসে একটি চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতার কথা বাঁধন জানিয়েছেন, সেটি শেষ পর্যন্ত একটি ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ঘটনা থেকে বৃহত্তর সামাজিক প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক মতভেদ, শিল্পীর স্বাধীনতা, প্রবাসীদের আচরণ এবং বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশিদের পারস্পরিক সম্পর্ক—সবকিছুকেই নতুন করে আলোচনায় এনেছে এই অভিযোগ।
শেষ পর্যন্ত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা স্পষ্ট হওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেমন প্রয়োজন, তেমনি অভিযোগের কোনো অংশ অসত্য বা অতিরঞ্জিত হলে সেটিও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া দরকার। কারণ বিদেশের মাটিতে একজন বাংলাদেশির নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা শুধু ব্যক্তির বিষয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দেশের সামগ্রিক ভাবমূর্তিও।


