প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে এসে শয্যা পাচ্ছেন না অনেক রোগী। ৫০ শয্যার হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ভর্তি থাকছেন ১৬০ থেকে ১৭০ জন। ফলে নির্ধারিত শয্যার বাইরে মেঝে, বারান্দা এমনকি সিঁড়ির নিচেও বিছানা পেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে রোগীদের। অন্যদিকে, ৩২ জন চিকিৎসকের পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ১২ জন। তাঁদের মধ্যেও প্রশিক্ষণ ও ছুটিতে থাকায় কোনো কোনো দিন দায়িত্ব সামলাচ্ছেন মাত্র ৯ জন চিকিৎসক।
হাসপাতালের এই চিত্র শুধু শয্যাসংকটের নয়; বরং চিকিৎসক, নার্স, ফার্মাসিস্ট ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ বিভিন্ন পর্যায়ে জনবল ঘাটতিরও প্রতিফলন। রোগীর সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার সক্ষমতা বাড়েনি। ফলে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাঁদের স্বজনদের ভোগান্তি ক্রমেই বাড়ছে।
সম্প্রতি হাসপাতালটি সরেজমিনে পরিদর্শনের সময় দেখা যায়, ৫০টি শয্যার প্রতিটিতে একাধিক রোগীকে গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে। ওয়ার্ডে জায়গা না পেয়ে অনেকেই মেঝেতে বিছানা পেতেছেন। কেউ আশ্রয় নিয়েছেন বারান্দায়, আবার কাউকে সিঁড়ির নিচেও অবস্থান করতে দেখা গেছে। রোগীদের ব্যবহৃত স্যালাইন ঝুলছে জানালার গ্রিলে। প্রয়োজনের তুলনায় জায়গা কম থাকায় রোগী ও স্বজনদের চলাচলেও তৈরি হচ্ছে প্রতিবন্ধকতা।
উপজেলার গাজীপুর ইউনিয়ন থেকে অসুস্থ বাবাকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন ষাটোর্ধ্ব জমির আলী। তিন দিন ধরে হাসপাতালে অবস্থান করেও শয্যা না পাওয়ার অভিজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, “তিন দিন ধইরা বাবারে লইয়া আইছি। একটা সিট পাইছি না, নিচেই শুইয়া আছে।”
জমির আলীর মতো অনেক রোগীর স্বজনেরই অভিযোগ, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরও শয্যা পাওয়া অনিশ্চিত। অসুস্থ স্বজনকে নিয়ে দূরবর্তী এলাকা থেকে আসার পর মেঝেতে কিংবা বারান্দায় অবস্থান করতে হওয়ায় তাঁদের বাড়তি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বিশেষ করে বয়স্ক, গুরুতর অসুস্থ ও চলাফেরায় অক্ষম রোগীদের ক্ষেত্রে এ পরিস্থিতি আরও কষ্টকর।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন বহির্বিভাগে ৫০০ থেকে ৬০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। তাঁদের মধ্যে প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৪০ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। এর বাইরে জরুরি বিভাগে ২৪ ঘণ্টায় আরও শতাধিক রোগী চিকিৎসার জন্য আসেন। অর্থাৎ বহির্বিভাগ, জরুরি বিভাগ ও ভর্তি রোগীদের সেবা মিলিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষের চিকিৎসার দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে সীমিতসংখ্যক চিকিৎসককে।
হাসপাতালে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ রয়েছে ৩২টি। এর বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১২ জন। তাঁদের মধ্যে দুজন প্রশিক্ষণে এবং একজন ছুটিতে থাকায় সংশ্লিষ্ট সময়ের হিসাবে মাত্র নয়জন চিকিৎসক দিয়ে হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসকদের ওপর অতিরিক্ত দায়িত্বের চাপ তৈরি হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্তব্যরত চিকিৎসক বলেন, ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করেও রোগীর চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। একজন চিকিৎসককে একাধিক চিকিৎসকের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। ফলে রোগীর সংখ্যা বেশি থাকলে প্রত্যেককে প্রয়োজনীয় সময় দিয়ে সেবা দেওয়া চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
চিকিৎসকসংকটের পাশাপাশি হাসপাতালের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদেও রয়েছে জনবল ঘাটতি। হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ৩২টি নার্স পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ২২ জন। ফলে ভর্তি রোগীদের নিয়মিত পরিচর্যা, ওষুধ প্রয়োগ, পর্যবেক্ষণ ও অন্যান্য সেবা দিতে নার্সদেরও বাড়তি চাপ সামলাতে হচ্ছে।
বহির্বিভাগে ওষুধ বিতরণের জন্য ফার্মাসিস্টের পদ শূন্য রয়েছে। এতে ওষুধ সরবরাহ ও বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। পরিচ্ছন্নতাকর্মীর সংকটও উদ্বেগজনক। ১৫টি পদের বিপরীতে কাজ করছেন মাত্র তিনজন। রোগীর চাপ বেশি থাকা একটি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় পরিচ্ছন্নতাকর্মী না থাকলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে।
এ ছাড়া টিকিট কাউন্টারে কোনো ক্লার্ক না থাকায় রোগীদের নিবন্ধন ও টিকিট সংগ্রহের ক্ষেত্রেও ভোগান্তি হচ্ছে। চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের শুরুতেই টিকিট সংগ্রহের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। এরপর চিকিৎসকের পরামর্শ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ওষুধ সংগ্রহের ধাপগুলো সম্পন্ন করতে গিয়ে তাঁদের দীর্ঘ সময় ব্যয় হচ্ছে।
চুনারুঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোজাম্মেল হোসেন জনবলসংকটের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, শূন্য পদ পূরণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হলেও এখনো কার্যকর সমাধান পাওয়া যায়নি। ৩২ জন চিকিৎসকের স্থলে ১২ জন দিয়ে তিন লক্ষাধিক মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা অত্যন্ত কঠিন।
তিনি বলেন, মানবিক কারণে হাসপাতালে আসা কোনো রোগীকে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে শয্যা না থাকলেও অনেক রোগীকে মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। তাঁর মতে, বর্তমান রোগীর চাপ বিবেচনায় হাসপাতালটিকে ৫০ শয্যা থেকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা এখন সময়ের দাবি।
হাসপাতালটির সক্ষমতা বাড়ানোর দাবি শুধু কর্তৃপক্ষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন মহলও বলছেন, চুনারুঘাটের মতো বড় উপজেলার মানুষের চিকিৎসার চাহিদা বিবেচনায় হাসপাতালের অবকাঠামো ও জনবল বাড়ানো জরুরি।
চুনারুঘাট প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, উপজেলায় চা-শ্রমিকসহ নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাস বেশি। তাঁদের অনেকের পক্ষেই বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব নয়। ফলে সরকারি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিই তাঁদের প্রধান ভরসা। কিন্তু সেখানে চিকিৎসক ও শয্যার অভাবে মানুষ কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না। তিনি দ্রুত পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের দাবি জানান।
জনবল ও শয্যাসংকটের পাশাপাশি হাসপাতালের পুরোনো ভবনের অবস্থা নিয়েও উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের দাবি, ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকলেও স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। তবে ভবনটির ঝুঁকির মাত্রা, কারিগরি মূল্যায়ন কিংবা সংস্কার ও পুনর্নির্মাণের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি।
একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স, শয্যা ও প্রয়োজনীয় সহায়ক কর্মী থাকা রোগীদের মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করার অন্যতম শর্ত। বিশেষ করে দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সরকারি হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এসব মানুষের অনেকেরই বিকল্প চিকিৎসাকেন্দ্রে যাওয়ার আর্থিক সামর্থ্য নেই।
চুনারুঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বর্তমান পরিস্থিতি তাই কেবল একটি হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়; এটি স্থানীয় জনগণের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। চিকিৎসক ও কর্মচারীর শূন্য পদ পূরণ, শয্যাসংখ্যা বাড়ানো এবং ভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে রোগীর চাপের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেবা দেওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য প্রশাসন ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ দ্রুত পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। যাতে অসুস্থ মানুষ চিকিৎসা নিতে এসে অন্তত একটি শয্যা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসক এবং নিরাপদ পরিবেশ পান।


