প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে দুই সাংবাদিকের ওপর হামলার প্রতিবাদে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছেন সিলেটের সাংবাদিকেরা। ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং কর্মক্ষেত্রে গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে শনিবার (৩১ অক্টোবর) প্রতিবাদ সমাবেশের ডাক দিয়েছেন বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের নেতারা।
সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে সকাল ১১টায় এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় সিলেটের ইলেকট্রনিক মিডিয়া জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের (ইমজা) কার্যালয়ে বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের নেতাদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত যৌথ সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সমাবেশ থেকে হামলার ঘটনায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বরাবর সিলেটের জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার সিদ্ধান্তও হয়েছে। পাশাপাশি সমাবেশে উপস্থিত সাংবাদিকদের মতামতের ভিত্তিতে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট নেতারা।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার (২৮ অক্টোবর) রাত সাড়ে ৯টার দিকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পঞ্চম তলায় ইন্টার্ন চিকিৎসক ও এক রোগীর স্বজনদের মধ্যে বিরোধের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনার তথ্য সংগ্রহ ও ভিডিও ধারণ করতে গেলে দুই সাংবাদিক হামলার শিকার হন।
আহত সাংবাদিকেরা হলেন শ্যামল সিলেট পত্রিকার ফটোসাংবাদিক রেজা রুবেল এবং সিলেটভিউ২৪ ডটকমের সাংবাদিক নিবেন্দু তালুকদার। সংবাদ সংগ্রহের সময় তাঁদের ওপর হামলা চালানো হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সিলেটভিত্তিক কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে হামলার সঙ্গে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ এসেছে। তবে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ, হামলায় প্রত্যেকের ভূমিকা এবং দায় নির্ধারণের বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে চূড়ান্তভাবে দায়ী করার আগে নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি।
ঘটনার পর আহত সাংবাদিকদের চিকিৎসা নিতে হয়। তাঁদের ওপর হামলার খবর ছড়িয়ে পড়লে সিলেটের সাংবাদিকদের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হয়। বুধবার রাতেই নগরের চৌহাট্টা এলাকায় সাংবাদিকেরা প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন এবং হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
বৃহস্পতিবার ইমজার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত যৌথ সভায় সিলেটের বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের নেতারা অংশ নেন। সেখানে হামলার ঘটনার প্রতিবাদে সম্মিলিত কর্মসূচি পালনের বিষয়ে আলোচনা হয়। আলোচনার পর শনিবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমাবেশ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সভায় আরও সিদ্ধান্ত হয়, সমাবেশ শেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বরাবর জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে স্মারকলিপি দেওয়া হবে। এতে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা এবং হাসপাতালে দায়িত্ব পালনকারী সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হবে।
সাংবাদিক নেতারা মনে করেন, হাসপাতালের মতো সংবেদনশীল ও জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের হামলার শিকার হওয়া উদ্বেগজনক। হাসপাতালের ভেতরে কোনো বিরোধ, অনিয়ম কিংবা রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ উঠলে তা সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে জনসমক্ষে আসতে পারে। সে ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের নিরাপদে তথ্য সংগ্রহের সুযোগ থাকা প্রয়োজন।
তাঁদের মতে, পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয় নয়; এটি তথ্য সংগ্রহ, সংবাদ প্রকাশ এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় তুলে ধরার পরিবেশকেও প্রভাবিত করে। এ ধরনের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত না হলে ভবিষ্যতে সাংবাদিকেরা দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন।
যৌথ সভায় উপস্থিত ছিলেন সিলেট প্রেসক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক জালালাবাদ পত্রিকার সম্পাদক মুকতাবিস উন নূর, সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক আধুনিক কাগজের সম্পাদক মঈন উদ্দিন, ইমজার সভাপতি ও যমুনা টেলিভিশনের ব্যুরো প্রধান মাহবুবুর রহমান রিপন।
এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন, সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাবের সভাপতি গুলজার আহমদ হেলাল, বাংলাদেশ ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সিলেট বিভাগীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হুমায়ুন কবির লিটন ও সাধারণ সম্পাদক আশকার আমিন রাব্বী এবং সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাহ দিদার আলম নবেল।
সভায় নেতারা নিজেদের সংগঠনের পাশাপাশি সিলেটের সব সাংবাদিক সংগঠন ও গণমাধ্যমকর্মীদের সমাবেশে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁদের প্রত্যাশা, সম্মিলিত কর্মসূচির মাধ্যমে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার দাবি আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে।
হামলার ঘটনার পর ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতির খবরও প্রকাশিত হয়েছে। স্থানীয় ও জাতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কর্মবিরতির কারণে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হয় এবং বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা রোগীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
একটি সরকারি হাসপাতাল অসংখ্য মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা। বিশেষ করে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও প্রত্যন্ত এলাকা থেকে রোগীরা উন্নত চিকিৎসার আশায় ওসমানী হাসপাতালে আসেন। সেখানে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হলে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন জরুরি চিকিৎসাপ্রত্যাশী রোগী, তাঁদের স্বজন এবং দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষ।
তাই হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ বিরোধ বা কোনো ঘটনার জেরে চিকিৎসাসেবা বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা সংবাদ সংগ্রহে বাধা সৃষ্টি হওয়া—দুটিই জনস্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক, রোগীর স্বজন এবং সাংবাদিকদের মধ্যে দায়িত্বশীল সমন্বয় বজায় রাখা জরুরি।
সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় কারা জড়িত, কী পরিস্থিতিতে হামলার ঘটনা ঘটেছে এবং হাসপাতালের নিরাপত্তাব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না—এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ উত্তর প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিবরণ যাচাই করে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র বের করা যেতে পারে।
একই সঙ্গে আহত সাংবাদিকদের চিকিৎসা ও নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সাংবাদিক নেতারা।
শনিবারের সমাবেশে সিলেটের সব সাংবাদিক সংগঠন ও গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। সমাবেশ শেষে স্মারকলিপি প্রদান এবং পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণার মধ্য দিয়ে প্রতিবাদ অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
ওসমানী হাসপাতালে দুই সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনা এখন শুধু একটি বিচ্ছিন্ন অভিযোগ নয়; এটি কর্মক্ষেত্রে গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা এবং হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রশ্নও সামনে এনেছে। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য ও প্রমাণ যাচাই করে দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার সুরাহা হওয়াই এখন প্রত্যাশা।


