সিলেটে হামের উপসর্গে আরও দুই শিশুর মৃত্যু, উদ্বেগ বাড়ছে

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

সিলেট বিভাগে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জের এই দুই শিশুর মৃত্যু ছাড়াও নতুন করে সন্দেহজনক হাম রোগী হিসেবে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১২৫ জন। শিশুদের মৃত্যু, নতুন রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীর চাপ—সব মিলিয়ে বিভাগজুড়ে জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে অল্প বয়সী শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের আশঙ্কা এবং জটিলতা দেখা দেওয়ার বিষয়টি পরিবারগুলোর জন্য গভীর দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শনিবার (২৪ অক্টোবর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় পরিচালকের কার্যালয় থেকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, মারা যাওয়া দুই শিশু সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি ছিল। তাদের একজনের বয়স মাত্র তিন মাস, অন্যজনের বয়স ১০ মাস। দুই শিশুই সুনামগঞ্জ জেলার বাসিন্দা। তবে তাদের মৃত্যু এখনো নিশ্চিত হামজনিত মৃত্যু হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়নি; সন্দেহজনক হামজনিত মৃত্যু হিসেবেই নথিভুক্ত রয়েছে।

শিশুদের এমন অল্প বয়সে মৃত্যু স্থানীয় পরিবারগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করছে। জীবনের প্রথম বছরেই শিশুরা নানা সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকে। এ সময়ে জ্বর, কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া কিংবা শরীরে ফুসকুড়ির মতো উপসর্গ দেখা দিলে অনেক অভিভাবক শুরুতে সাধারণ অসুস্থতা ভেবে অপেক্ষা করতে পারেন। কিন্তু হাম একটি সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত শিশুর অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে তিন মাস ও ১০ মাস বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে অসুস্থতার লক্ষণকে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে শনিবার পর্যন্ত সিলেট বিভাগে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১১৫ জনে। বিভাগটির চার জেলাতেই আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সিলেট জেলায় ৪৪২ জন, সুনামগঞ্জে ৩৫৭ জন, মৌলভীবাজারে ১৫৮ জন এবং হবিগঞ্জে ১৫৮ জন নিশ্চিত হাম রোগী রয়েছেন। হবিগঞ্জের সংখ্যার মধ্যে রুবেলায় আক্রান্ত দুই রোগীও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জেলাভিত্তিক এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, সিলেট ও সুনামগঞ্জে নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। তবে অন্য দুই জেলাতেও সংক্রমণের উপস্থিতি রয়েছে। ফলে কোনো একটি জেলা বা নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে পরিস্থিতিকে সীমাবদ্ধ ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। সংক্রমণ প্রতিরোধে বিভাগজুড়ে নজরদারি, আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত শনাক্ত করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে সন্দেহজনক হাম রোগী হিসেবে ১২৫ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ৬০ জন, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪৮ জন, রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছয়জন এবং মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে ১১ জন ভর্তি হয়েছে। এক দিনে এতসংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় চিকিৎসাসেবা পরিচালনা এবং রোগীদের যথাযথ পর্যবেক্ষণে স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বর্তমানে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে সন্দেহজনক হাম নিয়ে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা ৪৬৮। এর মধ্যে এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০০ জন এবং শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ১৬৮ জন চিকিৎসাধীন রয়েছে। রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২২ জন এবং পার্কভিউ হাসপাতালে ২০ জন ভর্তি রয়েছে। এ ছাড়া সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে ১৯ জন, মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে ৩০ জন এবং নর্থ ইস্ট হাসপাতালে পাঁচজন চিকিৎসা নিচ্ছে। বিশ্বনাথ ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুজন করে রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছে।

হাসপাতালভিত্তিক এই হিসাব থেকে দেখা যায়, সিলেট নগরীর প্রধান কয়েকটি হাসপাতালে সন্দেহজনক হাম রোগীর বড় অংশ চিকিৎসা নিচ্ছে। রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকলে শয্যা, চিকিৎসক, নার্স, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সন্দেহজনক রোগীদের দ্রুত মূল্যায়ন, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং রোগের জটিলতা অনুযায়ী চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রস্তুতি প্রয়োজন। একই সঙ্গে রোগীর স্বজনদেরও চিকিৎসকদের নির্দেশনা মেনে চলা এবং হাসপাতালের সংক্রমণ প্রতিরোধসংক্রান্ত নিয়ম অনুসরণ করা জরুরি।

স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ পর্যন্ত সিলেট বিভাগে সন্দেহজনক হামজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ১৯২। অন্যদিকে নিশ্চিত হামজনিত মৃত্যু হয়েছে ১০ জনের। সন্দেহজনক ও নিশ্চিত—দুই ধরনের হিসাব মিলিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ২০২। তবে এই দুই শ্রেণির মধ্যে পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। সন্দেহজনক মৃত্যুর ক্ষেত্রে উপসর্গ ও প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে হামজনিত মৃত্যুর আশঙ্কা নথিভুক্ত করা হয়; আর নিশ্চিত মৃত্যুর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরীক্ষাসংক্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতে রোগের সংশ্লিষ্টতা নির্ধারণ করা হয়। তাই সব মৃত্যুকে নিশ্চিত হামজনিত মৃত্যু হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না।

জেলাভিত্তিক মৃত্যুর হিসাবেও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। সিলেট জেলায় সন্দেহজনক হামজনিত মৃত্যু ৭৯ জন এবং নিশ্চিত মৃত্যু চারজন। হবিগঞ্জে সন্দেহজনক মৃত্যু ২৮ জন ও নিশ্চিত মৃত্যু চারজন। মৌলভীবাজারে এ সংখ্যা যথাক্রমে ১৫ ও একজন। সুনামগঞ্জে সন্দেহজনক হামজনিত মৃত্যু ৭০ জন এবং নিশ্চিত মৃত্যু একজন। সর্বশেষ মারা যাওয়া দুই শিশুর ঘটনাও সুনামগঞ্জের পরিবারগুলোর জন্য নতুন করে শোক ও উদ্বেগের কারণ হয়েছে।

হাম সাধারণত জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং পরে শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেওয়ার মাধ্যমে প্রকাশ পায়। তবে সব শিশুর ক্ষেত্রে উপসর্গের ধরন বা তীব্রতা এক রকম হয় না। আক্রান্ত শিশুর নিউমোনিয়া, পানিশূন্যতা কিংবা অন্য জটিলতা দেখা দিতে পারে। অপুষ্টিতে ভোগা শিশু এবং খুব অল্প বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি হতে পারে। তাই উপসর্গ দেখা দিলে নিজে থেকে ওষুধ না দিয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

হাম প্রতিরোধে টিকাদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর বয়স অনুযায়ী নিয়মিত টিকাদানের সময়সূচি অনুসরণ করা এবং কোনো ডোজ বাদ পড়ে থাকলে স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। তবে শিশুর বর্তমান অসুস্থতা, বয়স এবং শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে চিকিৎসক বা টিকাদানকর্মীর কাছ থেকে সঠিক নির্দেশনা নেওয়াই নিরাপদ। আক্রান্ত বা সন্দেহজনক রোগীর সংস্পর্শে এলে কী করণীয়, সে বিষয়েও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

পরিবারের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং কমিউনিটি পর্যায়েও সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। জ্বর ও ফুসকুড়ি দেখা দেওয়া শিশুকে অসুস্থ অবস্থায় অন্য শিশুদের কাছ থেকে দূরে রাখা, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা ও চিকিৎসা নেওয়া এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছে রোগের তথ্য জানানো সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। তবে রোগীর পরিবারকে দোষারোপ বা আক্রান্ত শিশুকে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন না করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া জরুরি।

সিলেট বিভাগের বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বজায় রাখা এবং শিশুদের সুরক্ষায় কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। নতুন রোগী ভর্তি ও মৃত্যুর তথ্য নিয়মিত পর্যালোচনা করে কোন এলাকায় সংক্রমণের চাপ বেশি, কোথায় চিকিৎসাসেবার বাড়তি প্রয়োজন এবং টিকাদান কার্যক্রমে কোথায় ঘাটতি রয়েছে—এসব বিষয় মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

সুনামগঞ্জের দুই শিশুর মৃত্যু আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা কতটা জরুরি। স্বাস্থ্য বিভাগের প্রকাশিত পরিসংখ্যান পরিস্থিতির গুরুত্ব তুলে ধরলেও রোগ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, নির্ভরযোগ্য তথ্য, সময়মতো চিকিৎসা এবং জনসচেতনতা। শিশুদের অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া এবং নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করার মাধ্যমে পরিবার ও সমাজ—উভয় পর্যায়েই ঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখা সম্ভব।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

কানাডায় ভিসা জালিয়াতির অভিযোগে ৫ বাংলাদেশির বিরুদ্ধে মামলা

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে ফ্ল্যাট থেকে যুব মহিলা লীগ নেত্রীর মরদেহ উদ্ধার

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শ্রমিক ইউনিয়নে বহাল সজীব, মামলার পরও গ্রেপ্তার নিয়ে প্রশ্ন

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ ঠেকাতে ৭০ হাজার পুলিশ মোতায়েন

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতন রোধে কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি

প্রকাশ:২৪ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের...

বিষয়বস্তু

কানাডায় ভিসা জালিয়াতির অভিযোগে ৫ বাংলাদেশির বিরুদ্ধে মামলা

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শ্রমিক ইউনিয়নে বহাল সজীব, মামলার পরও গ্রেপ্তার নিয়ে প্রশ্ন

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ ঠেকাতে ৭০ হাজার পুলিশ মোতায়েন

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতন রোধে কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি

প্রকাশ:২৪ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের...

সরকারের ভুলের দায় বিরোধী দল নেবে কেন: শফিকুর রহমান

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শাহজালাল মাজারের দানের টাকা আপাতত ব্যাংকেই জমা হবে

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

হেফাজতের তত্ত্বাবধানে একসঙ্গে কাজ করবে ৭ ইসলামী দল

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ