জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে শূন্য হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে নতুন প্রার্থী ঘোষণা করেছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগের পর শূন্য হওয়া সংরক্ষিত নারী আসন-২৩-এ দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এলিজা জামান। সোমবার (২৬ অক্টোবর) দুপুরে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে তাঁর মনোনয়নের বিষয়টি জানানো হয়। এর মধ্য দিয়ে আসনটিতে দলের প্রার্থী বাছাইয়ের প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। এখন নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী মনোনয়নপত্র জমা, যাচাই-বাছাই, প্রার্থিতা প্রত্যাহার ও প্রতীক বরাদ্দের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার অপেক্ষা।
এলিজা জামানের মনোনয়নকে কেন্দ্র করে বিএনপির নারী নেতৃত্ব, সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং জাতীয় রাজনীতিতে সংরক্ষিত নারী আসনের প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দলীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত নেত্রী হিসেবে পরিচিত এলিজা জামান এবার সংসদে যাওয়ার সুযোগের মুখে দাঁড়িয়েছেন। তবে মনোনয়ন পাওয়া এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সব ধাপ শেষে সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করা এক বিষয় নয়। তাঁকে নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। তফসিল অনুযায়ী, সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে আগামী ১২ নভেম্বর ভোট গ্রহণের কথা রয়েছে।
এলিজা জামান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পিরোজপুর-১ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। পিরোজপুর সদর, নাজিরপুর ও ইন্দুরকানি উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন তিনি। তবে ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত দলীয় মনোনয়ন পাননি। এবার সংরক্ষিত নারী আসনের উপনির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ায় তাঁর রাজনৈতিক জীবনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
দলীয় রাজনীতিতে মনোনয়ন পাওয়া একজন নেতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর সঙ্গে যুক্ত থাকে সাংগঠনিক দায়িত্ব, রাজনৈতিক প্রত্যাশা এবং জনগণের প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন। বিশেষ করে সংরক্ষিত নারী আসনের ক্ষেত্রে সংসদে নারীদের অংশগ্রহণ, নীতিনির্ধারণী আলোচনায় তাঁদের ভূমিকা এবং নারীসমাজের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এলিজা জামান মনোনীত হওয়ায় তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা সংসদীয় কার্যক্রমে কীভাবে কাজে লাগতে পারে, তা নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
এর আগে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগের মধ্য দিয়ে আসনটি শূন্য হয়। মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগকে কেন্দ্র করে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গত ১ অক্টোবর তিনি সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন। ঘটনাটি ঘিরে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা তৈরি হয়। তাঁর পদত্যাগের পর আসনটি পূরণের জন্য নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু করে নির্বাচন কমিশন।
স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের মতো ঘটনা জনস্বাস্থ্যসেবা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। এ ধরনের ঘটনায় অভিযোগের যথাযথ তদন্ত, দায় নির্ধারণ এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রমাণ ও আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন। মিষ্টির পদত্যাগের পর সংরক্ষিত নারী আসনটি শূন্য হওয়ায় নতুন প্রতিনিধি নির্বাচনের সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, সংরক্ষিত নারী আসন-২৩-এর উপনির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন ২৬ অক্টোবর। পরদিন ২৭ অক্টোবর মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করা হবে। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে ১ নভেম্বর এবং ২ নভেম্বর প্রতীক বরাদ্দের কথা রয়েছে। সবশেষে ১২ নভেম্বর ভোট গ্রহণের দিন ধার্য করেছে নির্বাচন কমিশন। নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী এসব ধাপ সম্পন্ন হলে আসনটির নির্বাচনী প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাবে।
এই উপনির্বাচন সামনে রেখে গত ১৬ অক্টোবর দলীয় মনোনয়ন ফরম বিতরণ শুরু করেছিল বিএনপি। সংরক্ষিত নারী আসনে দলের প্রার্থী হতে আগ্রহী মোট ৭০ জন নারী মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন। তাঁদের মধ্যে ৬৮ জন আবেদন জমা দেন। আবেদনকারীদের মধ্য থেকে এলিজা জামানকে বেছে নিয়েছে দলটি। এতসংখ্যক নারী নেত্রীর মনোনয়নপ্রত্যাশী হওয়া বিএনপির অভ্যন্তরে সংরক্ষিত নারী আসনকে কেন্দ্র করে আগ্রহের মাত্রা তুলে ধরে। একই সঙ্গে প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে দলীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত যে গুরুত্বপূর্ণ, সেটিও স্পষ্ট হয়েছে।
সংরক্ষিত নারী আসন বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থায় নারীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো। সাধারণ আসনে সরাসরি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি সংরক্ষিত আসনের মাধ্যমে নারীরা জাতীয় সংসদে ভূমিকা রাখার সুযোগ পান। এসব আসনের সদস্যদের কাছ থেকে নারী অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা এবং স্থানীয় উন্নয়নসংক্রান্ত বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা প্রত্যাশা করা হয়। ফলে একজন মনোনীত প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি তাঁর সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা, জনসম্পৃক্ততা এবং সংসদীয় দায়িত্ব পালনের সক্ষমতাও আলোচনায় আসে।
এলিজা জামান বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য। পাশাপাশি তিনি পিরোজপুর জেলা বিএনপি ও কেন্দ্রীয় মহিলা দলের সঙ্গে যুক্ত। দলীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে তাঁর এই সম্পৃক্ততা মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক রাজনৈতিক পরিচয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তাঁর পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয়ের দিক থেকেও পিরোজপুর অঞ্চলের সঙ্গে সংযোগ রয়েছে। তাঁর বাবা সরদার সুলতান মাহমুদ সাবেক সংসদ সদস্য ছিলেন। তবে সংসদে প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে পারিবারিক পরিচয়ের পাশাপাশি ব্যক্তিগত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা এবং জনস্বার্থে ভূমিকা রাখার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ।
এখন নির্বাচন কমিশনের যাচাই-বাছাইসহ পরবর্তী আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার দিকে নজর থাকবে। মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা, প্রার্থিতা প্রত্যাহার এবং প্রতীক বরাদ্দের ধাপ শেষে নির্ধারিত নিয়মে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন হওয়ার পরই আসনটির প্রতিনিধিত্ব নিয়ে চূড়ান্ত অবস্থান স্পষ্ট হবে। বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে এলিজা জামানের সামনে এখন সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনৈতিকভাবে এই উপনির্বাচন একটি শূন্য আসন পূরণের আনুষ্ঠানিকতা হলেও এর তাৎপর্য নারী প্রতিনিধিত্বের সঙ্গেও যুক্ত। সংসদে নারীদের অংশগ্রহণ তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তাঁরা আইন প্রণয়ন, নীতিনির্ধারণ, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিতর্ক এবং নাগরিকদের সমস্যা তুলে ধরার ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন। এলিজা জামান নির্বাচনী প্রক্রিয়া শেষে সংসদে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ পেলে তাঁর কাছেও এমন দায়িত্ব পালনের প্রত্যাশা তৈরি হবে।
সব মিলিয়ে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগে শূন্য হওয়া সংরক্ষিত নারী আসনে এলিজা জামানকে মনোনয়ন দেওয়ার মধ্য দিয়ে বিএনপি তাদের প্রার্থী নির্ধারণ করেছে। এখন নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম এগোবে। নির্ধারিত ১২ নভেম্বরের ভোট এবং এর আগে সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকা আনুষ্ঠানিক ধাপগুলোই নির্ধারণ করবে আসনটির প্রতিনিধিত্বের পরবর্তী অধ্যায়।


