প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা এবং পাল্টাপাল্টি হামলায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। একই সঙ্গে চলমান সংঘাতের অবসানে দুই দেশকে দ্রুত আলোচনার টেবিলে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক। তাঁর মতে, সামরিক সংঘাতের প্রতিটি নতুন পর্ব বেসামরিক মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার ওপর বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করছে এবং এর প্রভাব কেবল মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না।
মানবাধিকার কাউন্সিলের এক বৈঠকে ভলকার তুর্ক বলেন, হামলা আবার শুরু হওয়ায় তিনি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে বেসামরিক মানুষের হতাহত হওয়ার খবর তাঁকে আরও বেশি উদ্বিগ্ন করেছে। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, সংঘাতের সামরিক ও কৌশলগত হিসাবের বাইরে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাগুলোর একটি।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধানের এই আহ্বান এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক কয়েক দিনের পাল্টাপাল্টি হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে উঠেছে। সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ আন্তর্জাতিক বাজার ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাসের বড় একটি অংশ এই জলপথ ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাজারে যায়। ফলে সেখানে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে তার প্রভাব দ্রুতই আঞ্চলিক সীমা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রণালিটিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার খবরও পাওয়া যাচ্ছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার পাশাপাশি তেলের দামও ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার চাপ তৈরি হয়েছে।
এরই মধ্যে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় হরমোজগান প্রদেশের কুহেস্তাক এলাকায় একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলার ঘটনা নতুন করে বেসামরিক হতাহতের বিষয়টি সামনে এনেছে। স্থানীয় ও ইরানি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি আবাসিক এলাকায় বিয়ের অনুষ্ঠান চলাকালে বিস্ফোরণে কয়েকজন নিহত এবং বহু মানুষ আহত হন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণেও ঘটনাস্থলের ক্ষয়ক্ষতি ও অস্ত্রের ধ্বংসাবশেষের ভিত্তিতে সেখানে মার্কিন অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। তবে হামলার দায় ও ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট নিয়ে তদন্তের বিষয়টি এখনো গুরুত্বপূর্ণ।
ঘটনাটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশেষ উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে, কারণ হামলার সময় সেখানে সাধারণ মানুষ, নারী ও শিশুসহ একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া লোকজন উপস্থিত ছিলেন। যুদ্ধ বা সামরিক সংঘাতের মধ্যে কোনো বেসামরিক স্থাপনায় হামলা হলে তার মানবিক মূল্য বহুগুণ বেড়ে যায়। একটি আনন্দঘন অনুষ্ঠান মুহূর্তের মধ্যে শোকের ঘটনায় পরিণত হওয়ার এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
জাতিসংঘের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরেই সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও বেসামরিক মানুষের সুরক্ষার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। ভলকার তুর্কের সাম্প্রতিক বক্তব্যেও সেই অবস্থানের প্রতিফলন দেখা গেছে। তিনি মনে করেন, চলমান পরিস্থিতি শুধু সামরিক সংঘাতে জড়িত দেশগুলোর জনগণের জন্যই বিপজ্জনক নয়, বরং পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপরও বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনার পেছনে একাধিক রাজনৈতিক, সামরিক ও কৌশলগত কারণ রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি, ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং জ্বালানি পরিবহনপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। সময়ের সঙ্গে এসব বিরোধ আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ফলে সামরিক উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভুল হিসাব বা কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার মাধ্যমে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের আহ্বানের গুরুত্ব এখানেই যে, সামরিক শক্তি প্রয়োগের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে সংকট মোকাবিলার সুযোগ এখনো রয়েছে। কূটনৈতিক যোগাযোগ সক্রিয় করা গেলে সংঘাতের মাত্রা কমানো, বেসামরিক হতাহত ঠেকানো এবং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সমুদ্রপথে নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ সংঘাত এড়ানোর জন্য একটি রাজনৈতিক কাঠামোও গড়ে তোলা সম্ভব হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় বিরোধের বিষয় নয়। এ পথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ পরিচালিত হওয়ায় সেখানে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে এশিয়া, ইউরোপ ও অন্যান্য অঞ্চলের অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে। জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে, উৎপাদন খাতে চাপ তৈরি হতে পারে এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওপর উত্তেজনার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। সামরিক সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে সরবরাহ ব্যবস্থায় আরও বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটতে পারে—এমন আশঙ্কা বাজার বিশ্লেষকদের মধ্যে রয়েছে। এর প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; পরিবহন, শিল্প উৎপাদন, খাদ্য সরবরাহ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়েও তার প্রতিফলন দেখা দিতে পারে।
অন্যদিকে সংঘাত যত দীর্ঘ হবে, তত বেশি মানুষের বাস্তুচ্যুতি, অবকাঠামোগত ক্ষতি এবং মানবিক সহায়তার প্রয়োজন তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সামরিক অভিযানের ফলে বেসামরিক এলাকায় বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে। বিশেষ করে শিশু, নারী, প্রবীণ ও আহত ব্যক্তিরা সংঘাতের সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মধ্যে থাকেন।
এই বাস্তবতায় ভলকার তুর্কের আলোচনায় ফেরার আহ্বানকে কেবল একটি কূটনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একই সঙ্গে বেসামরিক মানুষের জীবন রক্ষা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি কমানোর একটি আন্তর্জাতিক আবেদন। সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি রাজনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রাখার প্রয়োজনীয়তাই এতে সামনে এসেছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের জন্যই বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। সামরিক সক্ষমতা থাকলেও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত অর্থনীতি, বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ এবং সাধারণ মানুষের জীবনে ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে সংঘাত বিস্তৃত হলে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশও নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, কীভাবে সামরিক উত্তেজনা কমিয়ে কার্যকর কূটনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু করা যায়। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পক্ষের ভূমিকা সেখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। আঞ্চলিক দেশগুলোও যদি সংলাপ ও উত্তেজনা প্রশমনের উদ্যোগে সক্রিয় হয়, তাহলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার সুযোগ বাড়তে পারে।
তবে আলোচনায় ফেরার পথ সহজ নয়। দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস, নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধ বড় বাধা হয়ে রয়েছে। তারপরও বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির সম্ভাব্য ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কূটনৈতিক পথকে সক্রিয় রাখা জরুরি বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক মহলের একটি বড় অংশ।
বর্তমান সংঘাতের সবচেয়ে বড় মানবিক শিক্ষা হলো, সামরিক অভিযানের প্রভাব কখনো শুধু সামরিক স্থাপনায় সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি ভুল আঘাত, একটি ক্ষেপণাস্ত্র বা একটি বিস্ফোরণ মুহূর্তেই সাধারণ মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে। কুহেস্তাকের বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলার ঘটনাকে ঘিরে তৈরি হওয়া উদ্বেগ সেই বাস্তবতাকেই আরও স্পষ্ট করেছে।
জাতিসংঘের আহ্বানের মধ্য দিয়ে তাই আবারও আলোচনার পথকে সামনে আনা হয়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র যদি সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনাকে অগ্রাধিকার দেয়, তাহলে বেসামরিক মানুষের জীবন রক্ষার পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সামরিক শক্তির প্রদর্শনের চেয়ে সংলাপ, সংযম ও কূটনৈতিক উদ্যোগই যে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ—জাতিসংঘের সর্বশেষ আহ্বানে সেই বার্তাই আবারও স্পষ্ট হয়েছে।

