প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত এক সরকারি চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অনুমতি বা ছুটি না নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে বিদেশে অবস্থানের অভিযোগ উঠেছে। ডা. শাহিনুর রহমান নামের ওই চিকিৎসক প্রায় সাড়ে তিন মাস ধরে কানাডায় অবস্থান করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এ সময় তিনি কর্মস্থলে উপস্থিত না থাকায় হাসপাতালের স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা কার্যক্রমে তাঁর অনুপস্থিতির বিষয়টি সামনে এসেছে।
ডা. শাহিনুর রহমান ওসমানীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মেডিকেল অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এর আগে তিনি সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলা হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। জেলা সিভিল সার্জনের আদেশে তাঁকে সংযুক্তি হিসেবে ওসমানীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মেডিকেল অফিসারের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর ওসমানীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগদান করেন ডা. শাহিনুর রহমান। সেখানে যোগদানের পর প্রায় আট মাস দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তবে চলতি বছরের ১ জুন থেকে তিনি কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি বা ছুটি না নিয়েই ওই সময় তিনি কানাডার উদ্দেশে দেশ ছাড়েন।
কর্মস্থলে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নজরে এলে তাঁকে দায়িত্বে ফিরে আসার জন্য কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি কাজে যোগদান না করায় বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। পরবর্তী সময়ে ওসমানীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তাঁর মেডিকেল অফিসার হিসেবে সংযুক্তিও বাতিল করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা।
ওসমানীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাইনুল আহসান বলেন, ডা. শাহিনুর রহমান হাসপাতালে কাজে যোগদান না করায় তাঁকে শোকজ করা হয়েছিল। তাঁকে কাজে যোগদানের জন্য বলা হলেও তিনি কর্মস্থলে ফিরে আসেননি। পরে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়। এরপর হাসপাতাল থেকে মেডিকেল অফিসার হিসেবে তাঁর সংযুক্তি বাতিল করা হয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, বিষয়টি শুধু কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে প্রশাসনিক পর্যায়েও পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে একজন চিকিৎসকের নিয়মিত উপস্থিতি রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় তাঁর অনুপস্থিতির বিষয়টি কর্তৃপক্ষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছে।
সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. মো. নাসির উদ্দিনও বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, ডা. শাহিনুর রহমান অননুমোদিতভাবে ছুটি না নিয়ে বিদেশে অবস্থান করছেন। তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
তবে ডা. শাহিনুর রহমান কেন কানাডায় গেছেন, বিদেশে অবস্থানের পেছনে ব্যক্তিগত বা চিকিৎসাজনিত কোনো কারণ রয়েছে কি না এবং তিনি কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো আবেদন করেছিলেন কি না—এসব বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানা যায়নি। ফলে অভিযোগের বিষয়ে তাঁর পক্ষের ব্যাখ্যা বা অবস্থান ছাড়া ঘটনাটির সব দিক সম্পূর্ণভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়।
সরকারি স্বাস্থ্য খাতে কর্মরত চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে কর্মস্থলে নিয়মিত উপস্থিতি এবং অনুমোদিত ছুটির বিধান অনুসরণ করা প্রশাসনিক দায়িত্বের অংশ। বিশেষ করে উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে চিকিৎসক সংকট বা জনবল সীমাবদ্ধতা থাকলে একজন চিকিৎসকের দীর্ঘ অনুপস্থিতি রোগীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে। স্থানীয় পর্যায়ে সাধারণ মানুষ প্রাথমিক ও জরুরি চিকিৎসার জন্য এসব স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওপর নির্ভর করেন।
ওসমানীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সও উপজেলার মানুষের চিকিৎসাসেবার অন্যতম প্রধান সরকারি প্রতিষ্ঠান। প্রতিদিন বিভিন্ন বয়সী মানুষ এখানে বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসেন। জরুরি সেবা, সাধারণ রোগের চিকিৎসা, মাতৃ ও শিশুসেবা এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর ভূমিকা রয়েছে। ফলে কোনো চিকিৎসক দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলে তাঁর ওপর নির্ধারিত দায়িত্ব অন্য চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর পড়তে পারে।
ডা. শাহিনুর রহমানের ক্ষেত্রে অভিযোগের সময়কালও উল্লেখযোগ্য। ১ জুন থেকে সাড়ে তিন মাস ধরে তিনি কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এত দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে উপস্থিত না থাকার পরও দায়িত্বে ফিরে না আসায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রথমে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে এবং পরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়েছে। শেষ পর্যন্ত তাঁর সংযুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এদিকে সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠানোর বিষয়টি প্রশাসনিক তদন্ত বা পরবর্তী ব্যবস্থার সম্ভাবনার কথাও সামনে আনছে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বিষয়। অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং প্রযোজ্য সরকারি বিধিবিধান অনুসারে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
সরকারি চাকরিতে অনুমোদিত ছুটি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি প্রশাসনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কর্মচারী বা কর্মকর্তা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে দেশের বাইরে যেতে চাইলে সাধারণত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। তবে কোনো নির্দিষ্ট কর্মকর্তার ক্ষেত্রে কী বিধান প্রযোজ্য এবং তিনি তা লঙ্ঘন করেছেন কি না, তা সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও কর্তৃপক্ষের তদন্তের ভিত্তিতেই চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব।
এই ঘটনার আরেকটি দিক হলো সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় জনবল ব্যবস্থাপনা। উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসকের সংখ্যা ও তাঁদের কর্মস্থলে উপস্থিতি রোগীদের সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে সরাসরি প্রভাব ফেলে। কোনো চিকিৎসক দীর্ঘ সময় অনুপস্থিত থাকলে তাঁর দায়িত্ব পুনর্বণ্টন করতে হয়। এতে অন্য চিকিৎসকদের ওপর কাজের চাপ বাড়তে পারে এবং রোগীদের অপেক্ষার সময়ও দীর্ঘ হতে পারে।
তবে ডা. শাহিনুর রহমানের অনুপস্থিতির কারণে নির্দিষ্টভাবে কতজন রোগী সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বা হাসপাতালের চিকিৎসাসেবায় কী ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো পরিসংখ্যান জানায়নি। তাই তাঁর অনুপস্থিতির সরাসরি প্রভাব সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই।
বর্তমানে মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে তাঁর বিদেশে অবস্থানের বৈধতা এবং কর্মস্থলে অনুপস্থিতির প্রশাসনিক ব্যাখ্যা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাঁকে শোকজ করা হলেও তিনি কাজে যোগ দেননি এবং পরে সংযুক্তি বাতিল করা হয়েছে। সিভিল সার্জন কার্যালয় জানিয়েছে, অননুমোদিতভাবে বিদেশে থাকার বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে নজর রয়েছে। প্রশাসনিক নথিপত্র, ছুটির আবেদন, বিদেশে যাওয়ার অনুমোদন এবং কর্মস্থলে অনুপস্থিতির কারণ যাচাই করে বিষয়টির নিষ্পত্তি হতে পারে। একই সঙ্গে চিকিৎসক হিসেবে তাঁর দায়িত্ব, সরকারি চাকরির বিধিবিধান এবং রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার বিষয়গুলোও বিবেচনায় আসবে।
সরকারি স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। উপজেলা পর্যায়ের একটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকদের উপস্থিতি শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের বিষয় নয়, স্থানীয় মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগের সঙ্গেও সম্পর্কিত। তাই কোনো চিকিৎসকের দীর্ঘ অনুপস্থিতির অভিযোগ উঠলে স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণ এবং বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
ডা. শাহিনুর রহমানের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে শোকজ, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিতকরণ এবং সংযুক্তি বাতিলের মতো পদক্ষেপ নিয়েছে। এখন তাঁর বিদেশে অবস্থানের কারণ, ছুটি বা অনুমোদনের বিষয়ে কোনো নথি রয়েছে কি না এবং প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কী হবে—সেটিই দেখার বিষয়।


