প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় জুরী নদীর অব্যাহত ভাঙনে একের পর এক বসতভিটা, কৃষিজমি ও গ্রামীণ সড়ক নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বিশেষ করে উপজেলার সাগরনাল ইউনিয়নের বরইতলী গ্রামের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নদীভাঙনের সঙ্গে লড়াই করলেও কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় তাঁদের উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে। নদীর তীরবর্তী এলাকায় বসবাসকারী পরিবারগুলো এখন প্রতিদিন আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটাচ্ছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে অবশিষ্ট ঘরবাড়ি, কৃষিজমি এবং গ্রামের একমাত্র যোগাযোগ সড়কও পুরোপুরি নদীগর্ভে হারিয়ে যাবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভারত থেকে নেমে আসা জুরী নদী বরইতলী গ্রামের পাশ দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। কয়েক দশক আগেও নদীর প্রবাহ ছিল সীমান্তঘেঁষা। নদীর তীরজুড়ে ছিল উর্বর কৃষিজমি, ফলজ ও বনজ গাছপালা এবং অসংখ্য পরিবারের বসতবাড়ি। বহু প্রজন্ম ধরে এসব জমিতে কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছিলেন স্থানীয় কৃষকরা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হতে শুরু করলে ভাঙনের মুখে পড়ে পুরো এলাকা। ধীরে ধীরে নদী বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবাহিত হতে থাকায় একের পর এক জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
বরইতলী গ্রামের কৃষক আব্দুল আহাদ, আব্দুস শুকুর, জিল্লুর রহমান, হোছন আহমদ ও ইয়াকুব আলীসহ একাধিক বাসিন্দা জানান, গত প্রায় পাঁচ দশক ধরে জুরী নদীর ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি বসতবাড়ি সম্পূর্ণ নদীগর্ভে চলে গেছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে অন্যত্র ঘরবাড়ি সরিয়ে নিলেও তাঁদের ভিটেমাটি, কৃষিজমি এবং গাছপালা রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। স্থানীয়দের দাবি, নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে তাঁদের মালিকানাধীন প্রায় ৪০ থেকে ৫০ একর কৃষিজমি এখন ভারতের দিকের চরাঞ্চলে চলে গেছে। জমির মালিকানা থাকলেও আন্তর্জাতিক সীমান্তের বাস্তবতায় সেখানে গিয়ে কৃষিকাজ করা বা জমি ব্যবহার করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। ফলে তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে রয়েছেন।
নদীভাঙনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থায়। স্থানীয়দের মতে, বরইতলী গ্রামের মানুষের চলাচলের একমাত্র সড়কের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ২৫ থেকে ৩০টি পরিবার নদীর তীরবর্তী এলাকায় বসবাস করছে, যার মধ্যে অন্তত চার থেকে পাঁচটি বাড়ি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। যেকোনো সময় এসব বাড়ি নদীতে তলিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বাসিন্দারা।
গ্রামবাসীরা জানান, এই সড়ক শুধু বরইতলী গ্রামের মানুষের জন্য নয়, পাশের মন্ত্রীগাঁওসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষেরও কৃষিজমিতে যাতায়াতের প্রধান পথ। প্রতিদিন শিক্ষার্থী, কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ এবং সাধারণ পথচারীরা এই সড়ক ব্যবহার করেন। বিকল্প কোনো রাস্তা না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই যাতায়াত দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে রোগী পরিবহন, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাওয়া এবং কৃষিপণ্য বাজারে নেওয়ার ক্ষেত্রে চরম ভোগান্তির সৃষ্টি হচ্ছে।
ভাঙন ঠেকাতে স্থানীয়রা নিজেদের উদ্যোগে কয়েক দফা অস্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। সম্প্রতি গ্রামবাসী নিজস্ব অর্থায়নে বাঁশ, মাটি ও বালুর বস্তা দিয়ে সড়ক রক্ষার চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রবল পানির স্রোতে সেই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ভেঙে যায়। ফলে আবারও নতুন করে ভাঙন শুরু হয় এবং নদীর পাড় আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়েক বছর আগে নদীর ভাঙন রোধে সরকারি উদ্যোগে নদীতীরে বল্লি বা লম্বা সরু গাছ পুঁতে প্রতিরোধের চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে তাঁদের দাবি, সেই উদ্যোগ কার্যকর হয়নি। বরং নদীর তলদেশের প্রবাহের পরিবর্তনের কারণে ভাঙনের তীব্রতা আরও বেড়েছে। এখন তাঁরা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধানের জন্য নদীর বাঁক অংশে পাথর ফেলে কংক্রিট ব্লক স্থাপন ছাড়া অন্য কোনো কার্যকর বিকল্প নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্তবর্তী নদীগুলোর ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ড্রেজিং না হওয়া, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে পরিবর্তন, অতিবৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং তলদেশে পলি জমার কারণে নদীভাঙনের ঝুঁকি বাড়তে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেও বর্ষা মৌসুমে নদীর প্রবাহ ও স্রোতের তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা নদীতীরবর্তী জনপদের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। তাই শুধু জরুরি প্রতিরক্ষা নয়, দীর্ঘমেয়াদি নদী ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনাও জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নদীভাঙনের কারণে স্থানীয় কৃষকদের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণও বাড়ছে। অনেক পরিবার কৃষিজমি হারিয়ে জীবিকার প্রধান উৎস থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ফলে কেউ কেউ বিকল্প পেশায় যুক্ত হচ্ছেন, আবার অনেকেই কাজের সন্ধানে দেশের বিভিন্ন শহরে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। গ্রামে থেকে যাওয়া পরিবারগুলোও প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। নদীর পানি বাড়লেই তাঁদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো) মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদ বিন অলীদ বলেন, জুরী নদীর ভাঙন প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় চাহিদাপত্র ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। সরকারি বরাদ্দ পাওয়া সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা কাজ বাস্তবায়ন করা হবে। তিনি জানান, বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে রয়েছে এবং বরাদ্দ নিশ্চিত হলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সচেতন মহলের মতে, বরইতলীসহ জুরী নদীর তীরবর্তী ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে দ্রুত স্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ এবং কংক্রিট ব্লক স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন, কৃষিজমি রক্ষায় কার্যকর পরিকল্পনা এবং বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় প্রতি বর্ষা মৌসুমে নতুন নতুন এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার পাশাপাশি সীমান্তবর্তী জনপদের মানুষের জীবন-জীবিকা আরও সংকটের মুখে পড়বে।
জুরী নদীর ভাঙন শুধু কয়েকটি পরিবারের ব্যক্তিগত ক্ষতির বিষয় নয়; এটি সীমান্ত অঞ্চলের পরিবেশ, কৃষি, যোগাযোগ এবং জনজীবনের সঙ্গে জড়িত একটি দীর্ঘমেয়াদি সংকট। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দ্রুত সরকারি উদ্যোগে টেকসই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হলে তাঁদের বসতভিটা, কৃষিজমি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। ততদিন পর্যন্ত নদীর পাড়ে বসবাসকারী শতাধিক মানুষের প্রতিটি দিনই কাটবে অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ এবং নতুন ভাঙনের আশঙ্কা নিয়ে।


