সিলেটে হৃদয়ের মহাকাব্যিক ইনিংস, হাতছানি ডাবল সেঞ্চুরি

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টেস্টে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে অসাধারণ ব্যাটিং করে বাংলাদেশকে লড়াইয়ে ফিরিয়েছেন তাওহীদ হৃদয়। একের পর এক অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান সাজঘরে ফিরলেও এক প্রান্ত আগলে রেখে অবিচল ছিলেন এই তরুণ ব্যাটার। ধৈর্য, আত্মবিশ্বাস এবং দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ের অনন্য সমন্বয়ে তুলে নিয়েছেন টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি। শুধু শতরান করেই থেমে থাকেননি, নিজের ইনিংসকে নিয়ে গেছেন আরও অনেক দূর। তৃতীয় দিনের দ্বিতীয় সেশন শেষে ১৯০ রানে অপরাজিত থেকে এখন ক্যারিয়ারের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরির হাতছানি পাচ্ছেন তিনি।

সিলেটের মাঠে হৃদয়ের এই ইনিংস বাংলাদেশের ক্রিকেটে নতুন এক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ, দল যখন একের পর এক উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ছিল, তখন তাঁর ব্যাটেই টিকে ছিল প্রতিরোধের আশা। অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতার মধ্যেও নিজের দায়িত্ব থেকে সরে যাননি তিনি। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলারদের সামনে মাথা নত না করে পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যাটিং করেছেন। কখনো রক্ষণাত্মক ভঙ্গিতে উইকেট আগলে রেখেছেন, আবার কখনো সুযোগ বুঝে খেলেছেন দৃষ্টিনন্দন সব শট।

তৃতীয় দিনের দ্বিতীয় সেশন শেষে বাংলাদেশের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৮ উইকেটে ৩১৮ রান। তখনও ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংসের চেয়ে ৩৮ রানে পিছিয়ে ছিল স্বাগতিকরা। বাংলাদেশের হয়ে তাওহীদ হৃদয় ১৯০ রানে অপরাজিত ছিলেন। তাঁর সঙ্গে ক্রিজে ছিলেন পেসার তাসকিন আহমেদ। ফলে দিনের বাকি সময় এবং পরবর্তী ব্যাটিংয়ের ওপর নির্ভর করছিল বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসে এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা।

দিনের শুরুতে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে আশার আলো দেখিয়েছিল তাওহীদ হৃদয় ও মুশফিকুর রহিমের জুটি। আগের দিনের লড়াইয়ের ধারাবাহিকতা ধরে রেখে তাঁরা দলকে বিপর্যয় থেকে বের করে আনার চেষ্টা করেন। মুশফিকের অভিজ্ঞতা এবং হৃদয়ের আত্মবিশ্বাসী ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশের স্কোরবোর্ডে রান যোগ হচ্ছিল। তবে মুশফিকুর রহিম ৩৪ রান করে ফিরে গেলে আবারও চাপে পড়ে স্বাগতিক দল।

মুশফিকের বিদায়ের পর সেই চাপ আরও বাড়তে থাকে। লিটন দাস, মেহেদী হাসান মিরাজ এবং হাসান মাহমুদের মতো ব্যাটসম্যানরা প্রত্যাশা অনুযায়ী অবদান রাখতে পারেননি। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বোলাররা নিয়মিত বিরতিতে উইকেট তুলে নিয়ে বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপকে বিপর্যস্ত করে দেন। বিশেষ করে ক্যারিবীয় স্পিনার জোমেল ওয়ারিক্যান বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠেন। তিনি একাই তুলে নেন তিনটি উইকেট।

এমন পরিস্থিতিতে সাধারণত ব্যাটসম্যানদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়। একজন সঙ্গীকে হারানোর পর নতুন ব্যাটসম্যান ক্রিজে আসেন, আবার কিছুক্ষণ পর তাঁকেও ফিরে যেতে হয়। এতে উইকেটে থাকা ব্যাটসম্যানের ওপর দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। তাওহীদ হৃদয় সেই কঠিন বাস্তবতাকে সামলে নিজের স্বাভাবিক ছন্দ বজায় রেখেছেন। দলের প্রয়োজনে ঝুঁকি কমিয়ে খেলেছেন, আবার রান করার সুযোগ পেলে তা কাজে লাগিয়েছেন।

টেস্ট ক্রিকেটে সাফল্যের জন্য শুধু আক্রমণাত্মক ব্যাটিং যথেষ্ট নয়। দীর্ঘ সময় উইকেটে টিকে থাকার মানসিকতা, প্রতিপক্ষের পরিকল্পনা বুঝে খেলা এবং পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হৃদয়ের ইনিংসে এসব বৈশিষ্ট্যের প্রতিফলন দেখা গেছে। প্রথমে নিজের উইকেটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন, পরে ধীরে ধীরে রান তোলার গতি বাড়িয়েছেন। তাঁর ব্যাটিংয়ে আত্মবিশ্বাসের পাশাপাশি দায়িত্বশীলতার পরিচয়ও পাওয়া গেছে।

এই ম্যাচে হৃদয়ের সেঞ্চুরি বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টিতে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিলেও টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম শতরানের অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। দীর্ঘ পরিসরের ক্রিকেটে সফল হতে হলে ব্যাটসম্যানকে যে ধৈর্য ও মানসিক দৃঢ়তার পরিচয় দিতে হয়, সিলেটের মাঠে সেটিই দেখিয়েছেন হৃদয়। প্রথম টেস্ট ফিফটির পর এবার প্রথম সেঞ্চুরি তুলে নিয়ে নিজের ক্যারিয়ারে গুরুত্বপূর্ণ একটি মাইলফলক স্পর্শ করেছেন।

তাঁর ইনিংসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, দলের কঠিন সময়ে দায়িত্ব নেওয়া। অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যানরা যখন একের পর এক ব্যর্থ হচ্ছিলেন, তখন তরুণ এই ব্যাটার নিজের ওপর আস্থা হারাননি। বরং প্রতিটি পরিস্থিতিতে নতুন করে পরিকল্পনা সাজিয়েছেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজের পেস ও স্পিন আক্রমণের বিপক্ষে তাঁর ব্যাটিং বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

হৃদয়ের সঙ্গে পরবর্তী সময়ে তাইজুল ইসলাম যোগ দিলে বাংলাদেশের ইনিংসে নতুন গতি আসে। দুই ব্যাটসম্যানের মধ্যে গড়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ জুটি। উইকেট হারানোর চাপ সামলে তাঁরা রান সংগ্রহ করতে থাকেন। বিশেষ করে অষ্টম উইকেটে তাঁদের ১১৭ রানের জুটি বাংলাদেশের ইনিংসকে নতুন ভিত্তি দেয়। টেস্ট ক্রিকেটে অষ্টম উইকেটে এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রানের জুটি হিসেবে উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠে।

তবে চা বিরতির ঠিক আগে ২২ রান করে আউট হন তাইজুল ইসলাম। তাঁর বিদায়ের মধ্য দিয়ে হৃদয়ের সঙ্গে গড়ে ওঠা গুরুত্বপূর্ণ জুটির সমাপ্তি ঘটে। আবারও এক প্রান্তে একা হয়ে পড়েন হৃদয়। কিন্তু ততক্ষণে তিনি নিজের ব্যাটিংয়ের মাধ্যমে ম্যাচে বাংলাদেশের অবস্থান অনেকটাই শক্ত করেছেন। তাইজুলের বিদায়ের পর ক্রিজে আসেন তাসকিন আহমেদ। শেষ উইকেটের ব্যাটসম্যান হিসেবে তাঁর সঙ্গে হৃদয়ের বোঝাপড়া বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এদিকে সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে হৃদয়ের ১৯০ রানের অপরাজিত ইনিংস নতুন রেকর্ডও গড়েছে। এই মাঠে টেস্ট ক্রিকেটে এটিই সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস। এর আগে এই ভেন্যুতে টেস্টে কোনো ব্যাটসম্যান এত বেশি রান করতে পারেননি। ফলে ব্যক্তিগত মাইলফলকের পাশাপাশি সিলেটের ক্রিকেট ইতিহাসেও নিজের নাম বিশেষভাবে যুক্ত করেছেন তিনি।

বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা হৃদয়ের ডাবল সেঞ্চুরি। টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের জন্য দ্বিশতরান সব সময়ই বিশেষ অর্জন। এমন মাইলফলক একজন ব্যাটসম্যানের দীর্ঘ সময় ধরে মনোযোগ ধরে রাখা, শারীরিক সক্ষমতা এবং মানসিক দৃঢ়তার পরিচয় বহন করে। ১৯০ রানে অপরাজিত থাকা হৃদয়ের সামনে সেই সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে তাঁর ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো বাংলাদেশকে প্রথম ইনিংসে লিড এনে দেওয়া এবং যতটা সম্ভব বড় সংগ্রহ গড়ে তোলা।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে এই টেস্টে বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু রান বাড়ানো নয়, বরং ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দিকে নিয়ে আসা। প্রথম ইনিংসে পিছিয়ে থাকা অবস্থায় শেষ উইকেটের ব্যাটসম্যানদের নিয়ে হৃদয়ের লড়াই কতটা দীর্ঘ হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। প্রতিপক্ষের বোলাররা দ্রুত শেষ উইকেট তুলে নিয়ে নিজেদের সুবিধা ধরে রাখতে চাইবেন। অন্যদিকে হৃদয় নিশ্চয়ই চেষ্টা করবেন ইনিংসকে আরও বড় করতে এবং দলকে প্রতিপক্ষের স্কোর ছাড়িয়ে এগিয়ে নিতে।

সিলেটের দর্শকদের জন্যও হৃদয়ের এই ব্যাটিং বিশেষ আনন্দের উপলক্ষ হয়ে উঠেছে। দলের বিপর্যয়ের মধ্যে একজন ব্যাটসম্যানের এমন দৃঢ়তা ক্রিকেটপ্রেমীদের নতুন করে আশাবাদী করেছে। তাঁর প্রতিটি রান এখন বাংলাদেশের সমর্থকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরির পর ডাবল সেঞ্চুরির সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় সবার নজর এখন সিলেটের উইকেটে।

সব মিলিয়ে তৃতীয় দিনের দ্বিতীয় সেশন শেষে তাওহীদ হৃদয় শুধু একটি ব্যক্তিগত মাইলফলকের সামনে দাঁড়িয়ে নেই, তিনি বাংলাদেশের ইনিংসের সবচেয়ে বড় ভরসায় পরিণত হয়েছেন। ১৯০ রানে অপরাজিত এই ব্যাটসম্যানের সামনে এখন ইতিহাস গড়ার সুযোগ। তাঁর ব্যাটে বাংলাদেশ কত দূর এগোতে পারে, সেটিই নির্ধারণ করবে ম্যাচের পরবর্তী পরিস্থিতি। সিলেটের মাঠে হৃদয়ের এই লড়াই শেষ পর্যন্ত ডাবল সেঞ্চুরিতে রূপ নেয় কি না, এখন সেই অপেক্ষায় দেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

সৌদিতে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নারী-শিশুসহ ৭ বাংলাদেশি নিহত

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান তারেক রহমানের

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

গভীর রাতে সড়ক উন্নয়নকাজে মন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শন

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেট-চট্টগ্রাম-নোয়াখালী পুনরুদ্ধারের দাবি বিজেপি এমপির

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

মসজিদ কমিটির বিরোধে প্রাণ গেল সালিশ ব্যক্তিত্বের, আহত ১০

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

সৌদিতে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নারী-শিশুসহ ৭ বাংলাদেশি নিহত

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান তারেক রহমানের

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

গভীর রাতে সড়ক উন্নয়নকাজে মন্ত্রীর আকস্মিক পরিদর্শন

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেট-চট্টগ্রাম-নোয়াখালী পুনরুদ্ধারের দাবি বিজেপি এমপির

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

মসজিদ কমিটির বিরোধে প্রাণ গেল সালিশ ব্যক্তিত্বের, আহত ১০

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

পোশাকশিল্পে অস্থিরতায় বিনিয়োগে প্রভাব পড়বে না: বাণিজ্যমন্ত্রী

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

এআই আতঙ্কে ওয়াল স্ট্রিটে ধস, উধাও আড়াই লাখ কোটি ডলার

প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

আ. লীগের রাজনীতির সুযোগ আর দেওয়া হবে না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ