প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে ভারতীয় গরুসহ বিপুল পরিমাণ চোরাচালানি পণ্য জব্দ করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সিলেট ব্যাটালিয়ন (৪৮ বিজিবি)-এর আওতাধীন বিভিন্ন সীমান্ত ফাঁড়ির সদস্যরা এসব অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযানে জব্দ করা পণ্যের আনুমানিক বাজারমূল্য ১০ লাখ ৪৫ হাজার ১০০ টাকা।
বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান প্রতিরোধে নিয়মিত নজরদারির পাশাপাশি বৃহস্পতিবার বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। সিলেট ব্যাটালিয়ন ৪৮ বিজিবির অধীনস্থ সোনালী চেলা, ডিবির হাওর, প্রতাপপুর, বিছানাকান্দি, পান্থুমাই, সংগ্রাম, সোনারহাট, কালাইরাগ ও তামাবিল বিওপির টহল দল নিজ নিজ দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় অভিযান চালায়। সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকা, বিভিন্ন পথ ও চোরাচালানের সম্ভাব্য রুটে নজরদারি বাড়িয়ে বিজিবির সদস্যরা এসব পণ্য জব্দ করেন।
অভিযানে ভারত থেকে সীমান্ত পার করে আনা গরু ছাড়াও কম্বল, চিনি, গুঁড়ো দুধ, ফুচকা, প্রসাধনসামগ্রী এবং ট্রাকের রিম জব্দ করা হয়। পণ্যগুলোর প্রকৃতি ও পরিমাণ বিবেচনায় এগুলো বিভিন্নভাবে দেশের বাজারে প্রবেশের চেষ্টা করা হচ্ছিল বলে ধারণা করছে সীমান্তরক্ষী বাহিনী। তবে এসব পণ্যের সুনির্দিষ্টভাবে কোন পথে এবং কার মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরে আনার চেষ্টা করা হয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংশ্লিষ্ট তদন্তের মাধ্যমে জানা যাবে।
বিজিবি জানায়, সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান ঠেকাতে তাদের সদস্যরা নিয়মিত টহল ও বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে আসছেন। সীমান্তের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, দুর্গম এলাকা এবং বিভিন্ন ছোট পথকে কাজে লাগিয়ে চোরাচালানিরা পণ্য আনা-নেওয়ার চেষ্টা করে থাকে। এ কারণে সীমান্ত ফাঁড়িগুলোর সদস্যদের পাশাপাশি টহল দলগুলোকে বিভিন্ন সময়ে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হয়।
বৃহস্পতিবারের অভিযানে একাধিক সীমান্ত ফাঁড়ির সদস্যরা একযোগে নিজ নিজ এলাকায় অভিযান পরিচালনা করায় বিপুল পরিমাণ পণ্য জব্দ করা সম্ভব হয়েছে। বিজিবির দায়িত্বপূর্ণ এলাকার বিভিন্ন স্থানে পরিচালিত অভিযানের মধ্যে ভারতীয় গরুর বহর জব্দের ঘটনাও রয়েছে। সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে গবাদিপশু আনা-নেওয়ার বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই সীমান্তরক্ষী বাহিনীর নজরদারির মধ্যে রয়েছে।
সিলেটের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোর একটি বড় অংশ পাহাড়, টিলা, নদী ও ছড়ায় ঘেরা। এসব এলাকায় বৈধ বাণিজ্যের পাশাপাশি অবৈধভাবে পণ্য পরিবহনের ঝুঁকিও রয়েছে। সীমান্তবর্তী বিভিন্ন গ্রামের মানুষও অনেক সময় চোরাচালানিদের গতিবিধির মুখোমুখি হন। ফলে চোরাচালান প্রতিরোধ শুধু রাজস্ব রক্ষার বিষয় নয়, সীমান্ত এলাকার নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সঙ্গেও এটি জড়িত।
জব্দ করা পণ্যের মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন সামগ্রী রয়েছে। চিনি ও গুঁড়ো দুধের মতো খাদ্যপণ্য যেমন রয়েছে, তেমনি কম্বল, ফুচকা ও প্রসাধনসামগ্রীর মতো ভোক্তাপণ্যও রয়েছে। এসব পণ্য বৈধ আমদানি প্রক্রিয়া এড়িয়ে দেশে প্রবেশ করলে সরকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয় এবং বৈধ ব্যবসায়ীরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে পারেন। একই সঙ্গে অবৈধ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকলে সীমান্ত নিরাপত্তার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।
বিজিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জব্দ করা পণ্যগুলোর বিষয়ে দেশের প্রচলিত আইন ও নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। জব্দ করা পণ্যের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণের পর সংশ্লিষ্ট আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। অভিযানের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা সম্ভব হলে তাঁদের বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
সিলেট ব্যাটালিয়ন (৪৮ বিজিবি)-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নাজমুল হক অভিযান ও জব্দের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, চোরাচালানের মাধ্যমে আনা জব্দ করা পণ্যের বিষয়ে দেশের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান ও যেকোনো ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে বিজিবির নজরদারি ও অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি জানান।
বিজিবির এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান প্রতিরোধকে তারা নিয়মিত দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছে। সীমান্তের প্রতিটি এলাকায় একই ধরনের নজরদারি চালানো সম্ভব না হলেও গোয়েন্দা তথ্য, টহল এবং স্থানীয় পর্যায়ের পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে অভিযান পরিচালনা করা হয়। বৃহস্পতিবারের অভিযানে একাধিক বিওপির সদস্যদের অংশগ্রহণও সেই সমন্বিত নজরদারির অংশ।
সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে পণ্য প্রবেশের ক্ষেত্রে শুধু পণ্য জব্দ করাই নয়, এর পেছনে থাকা সরবরাহব্যবস্থা শনাক্ত করাও গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্তের ওপার থেকে পণ্য সংগ্রহ, সীমান্ত অতিক্রম, স্থানীয় পর্যায়ে পরিবহন এবং দেশের বাজারে পৌঁছানো—চোরাচালানের পুরো প্রক্রিয়ায় একাধিক ব্যক্তি বা গোষ্ঠী জড়িত থাকতে পারে। তাই জব্দের পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ চোরাচালান প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
সিলেটের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে এ ধরনের অভিযান স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী সাধারণ মানুষ চোরাচালানের বিষয়ে তথ্য দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতা করলে অপরাধ প্রতিরোধের কার্যক্রম আরও শক্তিশালী হতে পারে। একই সঙ্গে কোনো নিরীহ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়েও আইন অনুযায়ী সতর্কতা ও যথাযথ যাচাই প্রয়োজন।
অন্যদিকে, সীমান্ত বাণিজ্যের বৈধ পথগুলো সচল ও সহজ রাখা চোরাচালান কমানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। বৈধভাবে আমদানি করা পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক, কর ও অন্যান্য নিয়ম মেনে ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ থাকলে অবৈধ পথে পণ্য আনার প্রবণতা কমানো সম্ভব হতে পারে। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বৈধ বাণিজ্য এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্যে সমন্বয় তাই দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ।
বৃহস্পতিবারের অভিযানে ১০ লাখ ৪৫ হাজার ১০০ টাকা মূল্যের পণ্য জব্দ হওয়ার ঘটনা সিলেট সীমান্তে চোরাচালান প্রতিরোধে বিজিবির চলমান তৎপরতার একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। তবে একটি দিনের অভিযান দিয়ে চোরাচালান পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। সীমান্তের বিস্তৃত এলাকা, ভৌগোলিক জটিলতা এবং চোরাচালানিদের বিকল্প পথ ব্যবহারের প্রবণতার কারণে নিয়মিত অভিযান ও গোয়েন্দা নজরদারি প্রয়োজন।
বিজিবি জানিয়েছে, দেশ ও জাতির স্বার্থ রক্ষায় সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান ও যেকোনো অপরাধ প্রতিরোধে কঠোর নজরদারি অব্যাহত থাকবে। সেই ধারাবাহিকতায় ভবিষ্যতেও সীমান্তের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানোর পাশাপাশি জব্দ করা পণ্যের বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সীমান্ত নিরাপত্তা শুধু বাহিনীর দায়িত্বের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জাতীয় অর্থনীতি, রাজস্ব আদায়, বৈধ ব্যবসা এবং স্থানীয় জননিরাপত্তাও জড়িত। তাই চোরাচালান প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর সহযোগিতা এবং বৈধ বাণিজ্য ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। সিলেট সীমান্তে বৃহস্পতিবারের অভিযান সেই বৃহত্তর প্রচেষ্টারই একটি অংশ হিসেবে সামনে এসেছে।


