রায়হান হত্যা: এসআই আকবরের মৃত্যুদণ্ড, সাজা আরও পাঁচজনের

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

সিলেটের বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে নির্যাতনে রায়হান আহমদ হত্যার আলোচিত মামলায় বহিষ্কৃত উপপরিদর্শক (এসআই) আকবর হোসেন ভূঞাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই মামলায় দুই পুলিশ সদস্যকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অপর তিন আসামিকে সাত বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিচার ও ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় থাকা রায়হানের পরিবারের জন্য এ রায় গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলেও আসামিদের অধিকাংশ পলাতক থাকায় দণ্ড কার্যকরের বিষয়টি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

বৃহস্পতিবার বিকেলে সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক আব্দুল মজিদ মুন্সী এ রায় ঘোষণা করেন। মামলার ছয় আসামির মধ্যে প্রধান অভিযুক্ত আকবর হোসেন ভূঞাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অন্য দুই পুলিশ সদস্য কনস্টেবল টিটু চন্দ্র দাস ও কনস্টেবল হারুন অর রশীদকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। বাকি তিন আসামি বহিষ্কৃত সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আশেক এলাহী, এএসআই হাসান উদ্দিন এবং সংবাদকর্মী আব্দুল্লাহ আল নোমানকে সাত বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ মুমিনুল ইসলাম মোমিন রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ছয় আসামির মধ্যে একমাত্র আশেক এলাহী কারাগারে রয়েছেন। অন্য আসামিরা পলাতক। ফলে আদালতের রায়ে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হলেও পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার এবং দণ্ড কার্যকরের বিষয়টি মামলার পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আদালত এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়। দুপুরে কারাগারে থাকা একমাত্র আসামি আশেক এলাহীকে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে আদালতে হাজির করা হয়। রায় ঘোষণার আগে আদালতে উপস্থিত হন নিহত রায়হান আহমদের মা সালমা বেগম। ছেলের মৃত্যুর বিচার পাওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে আদালত ও বিচারপ্রক্রিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকা এই মায়ের বক্তব্যে উঠে আসে বিচার পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি আসামিদের পলাতক হয়ে যাওয়ার হতাশা।

রায় ঘোষণার আগে সালমা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যাঁরা তাঁর ছেলেকে নির্যাতন করে হত্যা করেছেন, তাঁদের অনেকে পালিয়ে গেছেন। তাঁর কাছে কেবল কাগজে-কলমে রায় ঘোষণার চেয়ে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে সাজা কার্যকর হওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ অপেক্ষার পর আদালতের রায় এলেও আসামিরা আইনের আওতায় না এলে তাঁর কষ্টের অবসান হবে না—এমন উদ্বেগই প্রকাশ করেন তিনি।

সালমা বেগমের বক্তব্যে মামলাটির দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া এবং আসামিদের জামিন পাওয়ার বিষয়টিও উঠে আসে। তাঁর প্রশ্ন, আগে যাঁদের জামিন হয়নি, তাঁরা কীভাবে পরবর্তী সময়ে জামিন পেলেন এবং জামিন পাওয়ার পর কীভাবে পলাতক হয়ে গেলেন? তাঁর এই ক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছে ছেলের মৃত্যুর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রত্যাশা। একজন মায়ের কাছে আদালতের রায় তখনই পূর্ণ অর্থ বহন করে, যখন অপরাধের জন্য দায়ী ব্যক্তিরা আইনের আওতায় আসেন এবং দণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া বাস্তবে এগিয়ে যায়।

রায়হান আহমদ হত্যার ঘটনাটি সিলেটসহ সারা দেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ২০২০ সালের ১০ অক্টোবর রাতে সিলেট মহানগর পুলিশের বন্দরবাজার ফাঁড়িতে নিয়ে রায়হানকে নির্যাতন করা হয় বলে মামলার তদন্তে উঠে আসে। পরদিন ১১ অক্টোবর তাঁর মৃত্যু হয়। পুলিশি হেফাজতে থাকা অবস্থায় একজন ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনা জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব, হেফাজতে থাকা ব্যক্তির নিরাপত্তা এবং নির্যাতনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিয়ে তখন ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।

রায়হানের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে মামলা করেন। মামলাটির তদন্তে নির্যাতনের প্রমাণ পাওয়া যায় বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানানো হয়। ঘটনার পরপরই তৎকালীন বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবরসহ চার পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং আরও তিনজনকে প্রত্যাহার করা হয়। পরবর্তী সময়ে তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

ঘটনার পর কনস্টেবল হারুন অর রশীদসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পরে ২০২০ সালের ৯ নভেম্বর কানাইঘাট সীমান্ত এলাকা থেকে প্রধান অভিযুক্ত এসআই আকবরকে আটক করা হয়। তাঁর আটকের ঘটনাও তখন আলোচিত হয়ে ওঠে। মামলাটির তদন্তে পিবিআই ছয়জনকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র প্রস্তুত করে আদালতে জমা দেয়।

২০২১ সালের ৫ মে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়। এতে এসআই আকবর হোসেন ভূঞাকে প্রধান অভিযুক্ত করা হয়। অন্য আসামিদের মধ্যে ছিলেন এএসআই আশেক এলাহী, কনস্টেবল হারুন অর রশীদ, কনস্টেবল টিটু চন্দ্র দাস, এসআই হাসান উদ্দিন এবং আব্দুল্লাহ আল নোমান। অভিযোগপত্রে তাঁদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে ধরা হয়। একই বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে মামলার বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে চলে।

মামলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রধান অভিযুক্ত আকবরের জামিন ও পরবর্তী সময়ে পলাতক থাকার ঘটনা। আদালত সূত্রের বরাতে জানা যায়, তিনি হাইকোর্ট থেকে জামিন পাওয়ার পর কারাগার থেকে মুক্তি পান। পরবর্তী সময়ে তাঁর জামিন স্থগিত হলেও তিনি নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করেননি। এরপর থেকে তিনি পলাতক রয়েছেন। তাঁর দেশত্যাগের বিষয়েও খবর প্রকাশিত হয়েছে, যদিও এ বিষয়ে চূড়ান্ত ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে নিশ্চিত বক্তব্য দেওয়া প্রয়োজন।

আসামিদের পলাতক থাকার বিষয়টি মামলার রায়কে ঘিরে জনমনে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। কারণ, মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মতো গুরুতর সাজা ঘোষণার পরও দণ্ডিত ব্যক্তি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাগালের বাইরে থাকলে বিচারপ্রক্রিয়ার বাস্তব ফল নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। তবে আদালতের রায়, দণ্ড কার্যকরের আইনি প্রক্রিয়া এবং পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার—এগুলো পৃথক বিষয়। রায় ঘোষণার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হলো আইন অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা এবং দণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা।

রায়হান হত্যাকাণ্ডের বিচার শুধু একটি পরিবারের ন্যায়বিচারের প্রশ্ন নয়; এটি পুলিশি হেফাজতে মানুষের নিরাপত্তা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জবাবদিহির সঙ্গেও সম্পর্কিত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব হলো নাগরিকের জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। হেফাজতে থাকা ব্যক্তির ওপর নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে তার নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা জনআস্থা রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একই সঙ্গে কোনো মামলায় দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে ঘোষিত সাজা কার্যকর করা এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ আইনসম্মতভাবে সম্পন্ন করাও জরুরি। বিশেষ করে আলোচিত ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট মামলায় আদালতের রায়ের পাশাপাশি তদন্ত, গ্রেপ্তার এবং দণ্ড কার্যকরের অগ্রগতি সম্পর্কে স্বচ্ছতা মানুষের আস্থা বাড়াতে পারে।

দীর্ঘ ছয় বছরের অপেক্ষা, আদালতের ধারাবাহিক কার্যক্রম এবং আসামিদের পলাতক থাকার বাস্তবতা—সব মিলিয়ে রায়হান আহমদ হত্যা মামলাটি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। আদালতের ঘোষিত রায় নিহতের পরিবারের ন্যায়বিচারের প্রত্যাশাকে নতুন ভিত্তি দিলেও তাঁদের দীর্ঘদিনের কষ্টের পূর্ণ অবসান নির্ভর করছে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপের ওপর। পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার, আদালতের নির্দেশনা অনুসারে সাজা কার্যকরের উদ্যোগ এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই এই মামলার বিচারিক পরিণতি বাস্তব অর্থ পেতে পারে।

রায়হানের পরিবারের কাছে তাই এ দিনটি একদিকে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আদালতের সিদ্ধান্ত পাওয়ার দিন, অন্যদিকে বাকি পথ পাড়ি দেওয়ার নতুন অপেক্ষার সূচনা। আদালতের রায়কে বাস্তবায়নের মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা গেলে তা কেবল একটি পরিবারের ক্ষত উপশমে সহায়তা করবে না, বরং পুলিশি হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর মতো গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার বার্তাও দেবে।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

৫৭৩ কোটি টাকার ডাইক, তবু থামছে না কুশিয়ারা ভাঙন

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ঠাকুরগাঁও-১ এ ভোট শেষ, চলছে ফল গণনা

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর  ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

রাজনীতিতে আ.লীগের ফেরা জনগণ মেনে নেবে না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

প্রকাশ:  ২৯ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেট সীমান্তে ১০ লাখ টাকার ভারতীয় পণ্য জব্দ

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

তুরাগ নদে সাবেক বিমানবাহিনী কর্মকর্তার মরদেহ উদ্ধার

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর  ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

৫৭৩ কোটি টাকার ডাইক, তবু থামছে না কুশিয়ারা ভাঙন

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ঠাকুরগাঁও-১ এ ভোট শেষ, চলছে ফল গণনা

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর  ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

রাজনীতিতে আ.লীগের ফেরা জনগণ মেনে নেবে না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

প্রকাশ:  ২৯ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেট সীমান্তে ১০ লাখ টাকার ভারতীয় পণ্য জব্দ

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

তুরাগ নদে সাবেক বিমানবাহিনী কর্মকর্তার মরদেহ উদ্ধার

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর  ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

মার্কিন চুক্তি ও বন্দর ইজারা বাতিলের দাবিতে সিলেটে মশাল মিছিল

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শ্রীমঙ্গলে সাবানা হত্যা: চারজনের মৃত্যুদণ্ড

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ইসরায়েল নির্বাচনে চাপে নেতানিয়াহু, শক্তিশালী আরব দল

প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ