প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি বাতিল, চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার চুক্তি বাতিল এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার দাবিতে সিলেটে মশাল মিছিল ও সমাবেশ করেছে সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোটের জেলা শাখা। একই সঙ্গে আগামী ৩০ অক্টোবর ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য কেন্দ্রীয় সমাবেশ সফল করার আহ্বান জানানো হয়েছে কর্মসূচি থেকে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৬টার দিকে নগরীর রেজিস্ট্রারি মাঠ থেকে মশাল মিছিলটি বের হয়। পরে মিছিলটি বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে আয়োজকদের উদ্যোগে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। কর্মসূচিতে বিভিন্ন বামপন্থী ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা অংশ নেন।
শহীদ মিনারের সামনে অনুষ্ঠিত সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ জাসদ সিলেট মহানগর শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট জাকির আহমদ। বাসদ সিলেট জেলা সদস্যসচিব প্রণব জ্যোতি পাল সমাবেশটি সঞ্চালনা করেন। এতে বক্তব্য দেন সিলেট জেলা সিপিবির সভাপতি সৈয়দ ফরহাদ হোসেন, বাসদ জেলা আহ্বায়ক আবু জাফর, সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আনোয়ার হোসেন সুমন, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক সিরাজ আহমদ, বাসদ (মার্কসবাদী) জেলা সমন্বয়ক সঞ্জয় কান্ত দাস এবং সাম্যবাদী আন্দোলনের জেলা সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট মহীতোষ দেব মলয়সহ অন্যরা।
সমাবেশে বক্তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য চুক্তি এবং চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনাল পরিচালনার জন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে করা চুক্তি নিয়ে তাঁদের আপত্তির কথা তুলে ধরেন। তাঁরা বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি, বন্দর ও কৌশলগত সম্পদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে দেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
বক্তারা দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে, তা দেশের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাঁদের অভিযোগ, অনির্বাচিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত সরকার সেটি বাস্তবায়নের পথে এগিয়েছে। একই সঙ্গে সংসদের বিরোধী দলগুলোর অবস্থান নিয়েও তাঁরা সমালোচনা করেন। তবে এসব বক্তব্য আয়োজক সংগঠনগুলোর রাজনৈতিক অবস্থান ও অভিযোগ হিসেবে এসেছে।
নিউমুরিং টার্মিনাল নিয়ে বিরোধের বিষয়টিও সমাবেশে গুরুত্ব পায়। চলতি অক্টোবরেই চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং দুবাইভিত্তিক বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের মধ্যে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ১৫ বছরের কনসেশন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। চুক্তির আওতায় টার্মিনালের পাশাপাশি ওভারফ্লো কনটেইনার ইয়ার্ডও রয়েছে। সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, এর মাধ্যমে টার্মিনালের দক্ষতা, সক্ষমতা ও বন্দর ব্যবস্থাপনার মান বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।
অন্যদিকে, চুক্তিটির বিরোধিতা করে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও শ্রমিক সংগঠন শুরু থেকেই আন্দোলন করে আসছে। তাদের দাবি, দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই বন্দর অবকাঠামোর পরিচালনভার বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়া জাতীয় অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়। সিলেটের সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোটও একই অবস্থান থেকে চুক্তিটি বাতিলের দাবি জানিয়ে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করছে। এর আগে নগরীতে পথসভা ও লিফলেট বিতরণের কর্মসূচিও পালন করেছে সংগঠনটি।
সরকার অবশ্য নিউমুরিং টার্মিনালের চুক্তিকে দেশের সম্পদ বিক্রি বা হস্তান্তর হিসেবে দেখার বিরোধিতা করেছে। সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ বহাল থাকবে এবং ডিপি ওয়ার্ল্ড নির্দিষ্ট মেয়াদে টার্মিনাল পরিচালনা করবে। বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বন্দরটির কার্যক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।
চুক্তির সমর্থনে সরকারি পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট ১৫ বছরের মেয়াদ শেষে চুক্তি নবায়ন করা বা মেয়াদ শেষ হতে দেওয়ার সুযোগ থাকবে। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরও বলেছেন, টার্মিনাল পরিচালনার এই চুক্তির উদ্দেশ্য হলো বন্দরটির সক্ষমতা ও দক্ষতা বাড়ানো এবং দেশের উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যয় প্রতিযোগিতামূলক করা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, চুক্তির কারণে বন্দরের বর্তমান কর্মীদের চাকরি হারানোর আশঙ্কা নেই।
তবে আন্দোলনকারীরা সরকারের এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন। তাঁদের বক্তব্য, শুধু অর্থনৈতিক দক্ষতা বা বিনিয়োগের বিষয় দিয়ে বন্দর পরিচালনার মতো কৌশলগত সিদ্ধান্তকে মূল্যায়ন করা যথেষ্ট নয়। দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থ, নিরাপত্তা, শ্রমিকদের অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখতে হবে। তাঁদের মতে, এ ধরনের চুক্তি গ্রহণের আগে জনস্বার্থে আরও বিস্তৃত আলোচনা ও পর্যালোচনা প্রয়োজন।
সিলেটের সমাবেশে বক্তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি বাতিলের পাশাপাশি দেশের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। তাঁরা বলেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্তে জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। বিদেশি শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নটি সামনে রাখতে হবে বলেও তাঁরা মত দেন।
বক্তারা সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন প্রতিরক্ষা জোটের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তাঁদের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিভিন্ন উদ্যোগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান নিয়ে জনগণের মধ্যে আরও আলোচনা প্রয়োজন। তাঁরা মনে করেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ জরুরি।
তবে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান নিয়ে সমাবেশে যে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, সেগুলো সংশ্লিষ্ট বক্তাদের রাজনৈতিক মূল্যায়ন ও অভিযোগ। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দলগুলোর বক্তব্য বা ব্যাখ্যা আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একইভাবে বাণিজ্য চুক্তি বা প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বাস্তব প্রভাব মূল্যায়নের ক্ষেত্রে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্ত, অর্থনৈতিক হিসাব এবং রাষ্ট্রীয় নীতিগত সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা গুরুত্বপূর্ণ।
৩০ অক্টোবর ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জাতীয় সমাবেশের ঘোষণা দিয়ে সিলেটের কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষকে ওই সমাবেশে অংশ নেওয়ার জন্য সংগঠিত করা হবে। তাঁদের দাবি, মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বাতিল এবং নিউমুরিং টার্মিনাল পরিচালনার চুক্তি বাতিলের পাশাপাশি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে বৃহত্তর জনমত গড়ে তুলতে হবে।
সিলেটের মশাল মিছিলটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনাল নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। একদিকে সরকার ও চুক্তির সমর্থকেরা আন্তর্জাতিক অপারেটরের মাধ্যমে বন্দর ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা ও বিনিয়োগ বাড়ানোর যুক্তি দিচ্ছেন, অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলো জাতীয় স্বার্থ, বন্দর পরিচালনার কর্তৃত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বিষয়কে সামনে রেখে চুক্তি বাতিলের দাবি জানাচ্ছে।
এ অবস্থায় সিলেটের মশাল মিছিল ও সমাবেশ মূলত ওই বৃহত্তর জাতীয় বিতর্কেরই একটি অংশ হিসেবে সামনে এসেছে। কর্মসূচি থেকে আয়োজকেরা তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরার পাশাপাশি ৩০ অক্টোবরের কেন্দ্রীয় সমাবেশে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। আগামী দিনের কর্মসূচির মধ্য দিয়ে এই ইস্যুতে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয় কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়। একই সঙ্গে বন্দর পরিচালনা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি এবং দেশের কৌশলগত স্বার্থ নিয়ে চলমান বিতর্কে সরকার, রাজনৈতিক দল, শ্রমিক সংগঠন ও নাগরিক সমাজের অবস্থানও আরও স্পষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।


