শ্রীমঙ্গলে সাবানা হত্যা: চারজনের মৃত্যুদণ্ড

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভূনবীর ইউনিয়নের পূর্ব লৈয়ারকুল গ্রামে সাবানা বেগম হত্যা মামলার দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার পর আদালত চার আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। একই মামলায় আরও দুই আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় পাঁচ আসামিকে খালাস দিয়েছেন আদালত। প্রায় এক দশক আগে পারিবারিক ও জমি-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে ঘটে যাওয়া এই হত্যাকাণ্ডের মামলায় বৃহস্পতিবার ঘোষিত রায়টি নিহতের পরিবারের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষার পর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক সিদ্ধান্ত হিসেবে এসেছে।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দুপুরে মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ প্রথম আদালতের বিচারক আনোয়ারুল হক এ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে চার আসামিকে মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে হাইকোর্ট বিভাগের অনুমোদন সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন পূর্ব লৈয়ারকুল গ্রামের ফারুক মিয়ার ছেলে মো. নাসির মিয়া, গিয়াস মিয়া, বিল্লাল মিয়া ও দুলাল মিয়া। আদালতের রায়ে তাঁদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে সাবানা বেগম হত্যার ঘটনায় দায় প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে চলা মামলার বিচার শেষে তাঁদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত আসে।

একই মামলার অপর দুই আসামির মধ্য থেকে মহিবুর রহমান ওরফে অমৃত মিয়াকে দণ্ডবিধির ৩২৬ ধারায় সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ২৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অর্থদণ্ড অনাদায়ে তাঁকে আরও ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। অন্যদিকে জয়নাল আবেদীনকে দণ্ডবিধির ৩২৩ ধারায় এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং এক হাজার টাকা অর্থদণ্ড দিয়েছেন আদালত। অর্থদণ্ড পরিশোধে ব্যর্থ হলে তাঁকে আরও ১৫ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।

আদালত একই সঙ্গে নির্দেশ দিয়েছেন, এই দুই আসামির পূর্ববর্তী হাজতবাসের সময় তাঁদের সাজা থেকে বাদ দেওয়া হবে। অর্থাৎ মামলার বিচার চলাকালে তাঁরা যে সময় কারাগারে বা হেফাজতে ছিলেন, আইন অনুযায়ী তা তাঁদের ঘোষিত সাজা থেকে সমন্বয় করা হবে।

মামলার আরও পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাঁদের খালাস দেওয়া হয়েছে। খালাসপ্রাপ্তরা হলেন জাবেদ মিয়া, হাসি বেগম, সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আবুল বাসার মিয়া, মো. আলী ইসলাম ও নাজমিন বেগম। আদালতের এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে মামলায় অভিযুক্ত মোট ১১ জনের মধ্যে চারজনের মৃত্যুদণ্ড, দুজনের কারাদণ্ড এবং পাঁচজনের খালাসের মধ্য দিয়ে বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ শেষ হলো।

আদালতের আদেশে অর্থদণ্ড হিসেবে আদায় করা অর্থ এজাহারকারীর পরিবারের সদস্যদের দেওয়ার নির্দেশও রয়েছে। নিহতের পরিবারের জন্য এই নির্দেশ আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি মামলার বিচারিক পরিণতির একটি অংশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে একজন স্বজনকে হারানোর যে শূন্যতা, কোনো অর্থদণ্ড বা আদালতের রায় দিয়ে তা পূরণ করা সম্ভব নয়। দীর্ঘদিন ধরে বিচারপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়া পরিবারের কাছে রায়ের গুরুত্ব তাই কেবল সাজা ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি তাঁদের প্রিয়জনের মৃত্যুর ঘটনায় দায় নির্ধারণেরও একটি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি।

সাবানা বেগম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে ২০১৬ সালের ৭ এপ্রিল। শ্রীমঙ্গল উপজেলার পূর্ব লৈয়ারকুল গ্রামে বাড়ির পানি নিষ্কাশনকে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত হয়। স্থানীয়ভাবে পরিচিত একটি বিরোধ একপর্যায়ে সহিংসতায় রূপ নেয়। অভিযোগ অনুযায়ী, সৎভাই ও তাঁদের স্বজনেরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে সাবানা বেগমের ওপর হামলা চালান। গুরুতর আহত অবস্থায় তিনি মারা যান। একটি পারিবারিক বিরোধ কীভাবে প্রাণঘাতী সংঘাতে পরিণত হতে পারে, এই হত্যাকাণ্ড তারই মর্মান্তিক উদাহরণ হয়ে রয়েছে।

ঘটনার পর নিহত সাবানা বেগমের ভাই হেলাল মিয়া বাদী হয়ে শ্রীমঙ্গল থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় মোট ১৪ জনকে আসামি করা হয়েছিল। তদন্ত ও পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হয়। সাক্ষ্য, নথিপত্র এবং মামলার অন্যান্য প্রাসঙ্গিক উপাদান পর্যালোচনার পর আদালত পৃথকভাবে আসামিদের দায় নির্ধারণ করেন।

মামলাটির দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া নিহতের পরিবারের জন্য ছিল অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপের একটি দীর্ঘ সময়। হত্যাকাণ্ডের পর একটি পরিবারকে যেমন স্বজন হারানোর বেদনা বহন করতে হয়েছে, তেমনি আইনি প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ অতিক্রম করে ন্যায়বিচারের অপেক্ষাও করতে হয়েছে। কোনো হত্যাকাণ্ডের বিচার কেবল আদালতের নথিতে থাকা একটি মামলা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের স্মৃতি, নিরাপত্তাবোধ, সামাজিক সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা উদ্বেগ।

বিশেষ করে পারিবারিক বিরোধ থেকে সংঘটিত সহিংসতার ঘটনা সমাজের জন্যও সতর্কবার্তা বহন করে। একটি বাড়ির পানি নিষ্কাশনের মতো স্থানীয় বিরোধ যদি আলোচনার পরিবর্তে সংঘাত ও প্রতিশোধের পথে যায়, তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, সাবানা বেগম হত্যাকাণ্ড তা স্মরণ করিয়ে দেয়। স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ মীমাংসার ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা, আইনের আশ্রয় নেওয়া এবং সহিংসতা এড়িয়ে চলার গুরুত্ব এ ধরনের ঘটনায় আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

আদালতের রায়ে চার আসামির মৃত্যুদণ্ড ঘোষণার পাশাপাশি দুই আসামির বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড এবং পাঁচজনকে খালাস দেওয়ার সিদ্ধান্ত বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রমাণের গুরুত্বও তুলে ধরে। একই মামলায় একাধিক ব্যক্তি অভিযুক্ত হলেও প্রত্যেকের বিরুদ্ধে অভিযোগের মাত্রা ও প্রমাণ আলাদাভাবে বিবেচনা করে আদালত সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। অভিযোগ প্রমাণিত না হলে খালাস এবং প্রমাণিত হলে আইনের আওতায় সাজা দেওয়ার মধ্য দিয়েই বিচারিক প্রক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হয়।

মৃত্যুদণ্ডের রায়ের ক্ষেত্রেও আইন অনুযায়ী পরবর্তী ধাপ রয়েছে। আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, হাইকোর্ট বিভাগের অনুমোদন সাপেক্ষে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। ফলে বৃহস্পতিবারের রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে বিচারিক সিদ্ধান্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ শেষ হলেও দণ্ড কার্যকরের ক্ষেত্রে আরও আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

প্রায় দশ বছর আগে নিহত সাবানা বেগমের পরিবারের জন্য বৃহস্পতিবারের রায় তাই শুধু একটি মামলার পরিণতি নয়, দীর্ঘ অপেক্ষার একটি অধ্যায়েরও সমাপ্তি। আদালতের সিদ্ধান্তে চারজনের সর্বোচ্চ সাজা এবং অন্যদের বিরুদ্ধে পৃথক দণ্ড নির্ধারিত হয়েছে। একই সঙ্গে পাঁচজন খালাস পেয়েছেন। এখন রায়ের পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া এবং আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নের দিকে তাকিয়ে থাকবে সংশ্লিষ্ট পরিবার ও স্থানীয় মানুষ।

সাবানা বেগমের মৃত্যু যে ক্ষত তৈরি করেছিল, তা সময় পেরিয়ে গেলেও পরিবারের কাছে নিশ্চয়ই অম্লান। তবে আদালতের রায় অন্তত এই বার্তা দিয়েছে যে দীর্ঘ সময় পরও একটি হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিণতির দিকে যেতে পারে। ন্যায়বিচারের এই পথ যত দীর্ঘই হোক, আইনের যথাযথ প্রয়োগ, প্রমাণভিত্তিক বিচার এবং আদালতের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই নিহতের পরিবারের প্রত্যাশিত বিচারিক স্বস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

৫৭৩ কোটি টাকার ডাইক, তবু থামছে না কুশিয়ারা ভাঙন

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ঠাকুরগাঁও-১ এ ভোট শেষ, চলছে ফল গণনা

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর  ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

রাজনীতিতে আ.লীগের ফেরা জনগণ মেনে নেবে না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

প্রকাশ:  ২৯ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেট সীমান্তে ১০ লাখ টাকার ভারতীয় পণ্য জব্দ

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

তুরাগ নদে সাবেক বিমানবাহিনী কর্মকর্তার মরদেহ উদ্ধার

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর  ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

৫৭৩ কোটি টাকার ডাইক, তবু থামছে না কুশিয়ারা ভাঙন

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ঠাকুরগাঁও-১ এ ভোট শেষ, চলছে ফল গণনা

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর  ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

রাজনীতিতে আ.লীগের ফেরা জনগণ মেনে নেবে না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

প্রকাশ:  ২৯ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেট সীমান্তে ১০ লাখ টাকার ভারতীয় পণ্য জব্দ

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

তুরাগ নদে সাবেক বিমানবাহিনী কর্মকর্তার মরদেহ উদ্ধার

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর  ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

মার্কিন চুক্তি ও বন্দর ইজারা বাতিলের দাবিতে সিলেটে মশাল মিছিল

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

রায়হান হত্যা: এসআই আকবরের মৃত্যুদণ্ড, সাজা আরও পাঁচজনের

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ইসরায়েল নির্বাচনে চাপে নেতানিয়াহু, শক্তিশালী আরব দল

প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ