প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রম সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে মাঠপর্যায়ের তথ্যসংগ্রহকারী ও সুপারভাইজারদের দুই দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ শুরু হয়েছে। শনিবার (১০ অক্টোবর) সকাল ৯টায় উপজেলা পরিষদের সভাকক্ষে উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের যৌথ আয়োজনে এ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়। প্রশিক্ষণ চলবে রোববার (১১ অক্টোবর) পর্যন্ত।
ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো উপযুক্ত পরিবার শনাক্ত করা এবং তাদের বিষয়ে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা। সেই প্রক্রিয়ায় মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করবেন তথ্যসংগ্রহকারী ও সুপারভাইজাররা। ফলে তাদের দক্ষতা, নিরপেক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার ওপর কার্যক্রমটির গ্রহণযোগ্যতা অনেকাংশে নির্ভর করবে। প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে দায়িত্বপ্রাপ্তদের এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
শাল্লা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা বিশ্বপতি চক্রবর্তীর সঞ্চালনায় প্রশিক্ষণ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পিয়াসচন্দ্র দাস। অনুষ্ঠানে স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
সভাপতির বক্তব্যে ইউএনও পিয়াসচন্দ্র দাস ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ের তথ্যসংগ্রহের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দায়িত্বপ্রাপ্ত তথ্যসংগ্রহকারী ও সুপারভাইজারদের অত্যন্ত সততা, স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রভাব, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্ক যেন তথ্য সংগ্রহ বা উপকারভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, প্রকৃত তথ্যের ভিত্তিতেই পরিবার নির্বাচন করতে হবে। তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনিয়ম, পক্ষপাত বা স্বজনপ্রীতি করা যাবে না। একটি পরিবার যাতে ন্যায্যভাবে তার প্রাপ্য সুবিধা পায় এবং যোগ্য কোনো পরিবার যেন ভুল তথ্যের কারণে বাদ না পড়ে, তা নিশ্চিত করা মাঠপর্যায়ের কর্মীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
ইউএনও আরও জানান, প্রতিটি পরিবার থেকে একজন করে ফ্যামিলি কার্ড পাবেন। ফলে একটি পরিবারকে একাধিক কার্ড দেওয়ার সুযোগ না থাকা এবং একই সঙ্গে প্রকৃত পরিবারের তথ্য সঠিকভাবে নথিভুক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য তথ্য সংগ্রহের প্রতিটি ধাপে সতর্কতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
ফ্যামিলি কার্ডের মতো জনকল্যাণমূলক কর্মসূচিতে মাঠপর্যায়ের তথ্যকে ভিত্তি করে উপকারভোগী নির্বাচন করা হলে সঠিক তথ্যের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। একটি পরিবারের সদস্যসংখ্যা, আর্থিক অবস্থা, জীবনযাত্রা ও প্রয়োজনীয়তার মতো বিষয় সম্পর্কে যথাযথ তথ্য না থাকলে প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝা কঠিন হতে পারে। ফলে তথ্যসংগ্রহকারীদের জন্য বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করে নির্ভুল তথ্য নথিভুক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
শাল্লার মতো অপেক্ষাকৃত প্রত্যন্ত ও নদী-হাওরপ্রধান এলাকার বাস্তবতায় মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। অনেক পরিবার এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত করে, কারও জীবিকা মৌসুমি কাজের ওপর নির্ভরশীল, আবার অনেক পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতিও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। এসব বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্তদের সতর্কতার সঙ্গে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। একই সঙ্গে কোনো পরিবার সম্পর্কে অনুমাননির্ভর তথ্য না দিয়ে বাস্তব পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন শাল্লা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক সিরাজুল ইসলাম সিরাজ, যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল করিম মাস্টার এবং দৈনিক শ্যামল সিলেটের শাল্লা প্রতিনিধি বকুল আহমেদ তালুকদার। বক্তারা ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রম বাস্তবায়নে সঠিক তথ্য সংগ্রহ এবং প্রকৃত উপকারভোগী শনাক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন।
তাঁরা বলেন, একটি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সফলতা শুধু কার্ড বিতরণের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না; বরং কারা কার্ড পাচ্ছেন, তারা প্রকৃতপক্ষে যোগ্য কি না এবং কার্যক্রমের সুবিধা সঠিক পরিবারের কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের সময় কোনো ধরনের প্রভাব বা পক্ষপাতের সুযোগ রাখা উচিত নয়।
প্রশিক্ষণে মাঠপর্যায়ের তথ্যসংগ্রহ ও তদারকির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হচ্ছে। দায়িত্ব পালনের সময় কীভাবে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে, কীভাবে তথ্যের যথার্থতা নিশ্চিত করা হবে এবং তদারকির ক্ষেত্রে কোন বিষয়গুলো গুরুত্ব দিতে হবে—এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহকে পুরো কার্যক্রমের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা যায়। কারণ একটি পরিবারের বিষয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে যে তথ্য নথিভুক্ত হবে, পরবর্তী যাচাই-বাছাই ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও সেটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই তথ্যসংগ্রহকারীদের দক্ষতা বাড়ানো এবং দায়িত্ব পালনের আগে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া কার্যক্রমের মান উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে।
স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও এই উদ্যোগের একটি বড় চ্যালেঞ্জ। স্থানীয় পর্যায়ে কোনো পরিবারকে নির্বাচন বা বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সামাজিক পরিচিতি কিংবা কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির সুপারিশ যাতে ভূমিকা না রাখে, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। একইভাবে তথ্যসংগ্রহকারীদের ওপরও যেন অযাচিত চাপ তৈরি না হয়, সে বিষয়েও প্রশাসনিকভাবে নজর রাখা প্রয়োজন।
কারণ জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির সুবিধা যখন মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হয়, তখন তালিকায় নাম থাকা বা না থাকার বিষয়টি একটি পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একটি যোগ্য পরিবার যদি বাদ পড়ে, তাহলে তারা কাঙ্ক্ষিত সহায়তা থেকে বঞ্চিত হতে পারে। আবার অযোগ্য কোনো পরিবার তালিকাভুক্ত হলে প্রকৃত উপকারভোগীর অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই প্রতিটি তথ্য যাচাই ও নথিভুক্তির ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা অপরিহার্য।
প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মধ্যে এই সচেতনতা আরও জোরদার করার চেষ্টা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, মাঠপর্যায়ে দক্ষ তথ্যসংগ্রহকারী ও সুপারভাইজাররা দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা বজায় রাখলে ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রমের বাস্তবায়ন আরও সুশৃঙ্খল হবে এবং প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে সুবিধা পৌঁছানোর সম্ভাবনা বাড়বে।
শাল্লায় দুই দিনব্যাপী এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ ও তদারকির কাজ আরও সক্রিয় হওয়ার কথা রয়েছে। প্রশিক্ষণ থেকে অর্জিত জ্ঞান বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হয়, তার ওপর পরবর্তী ধাপের সফলতা অনেকটাই নির্ভর করবে। শুধু প্রশিক্ষণ আয়োজন নয়, মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তদারকি, অভিযোগ গ্রহণ এবং প্রয়োজন হলে তথ্য সংশোধনের সুযোগ থাকাও গুরুত্বপূর্ণ।
ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রমের মাধ্যমে যদি প্রকৃতভাবে প্রয়োজনীয় পরিবারগুলোকে চিহ্নিত করে তাদের কাছে সুবিধা পৌঁছানো যায়, তাহলে এটি সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারগুলোর জন্য সরকারি সহায়তা সহজলভ্য করার ক্ষেত্রে এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে এর সফলতার জন্য তথ্যের নির্ভুলতা এবং উপকারভোগী নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
শাল্লার প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তা মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়নেও প্রতিফলিত হবে—এটাই এখন প্রত্যাশা। স্থানীয় পর্যায়ের প্রতিটি পরিবার যাতে যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয় এবং প্রকৃত যোগ্য ব্যক্তিরাই ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা পান, সেটি নিশ্চিত করা গেলে কর্মসূচিটির প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে।
শেষ পর্যন্ত একটি ফ্যামিলি কার্ড কেবল একটি সরকারি সুবিধার পরিচয়পত্র নয়; এর সঙ্গে একটি পরিবারের প্রত্যাশা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের কিছুটা নিশ্চয়তা জড়িয়ে থাকতে পারে। তাই তথ্য সংগ্রহের প্রতিটি ধাপে দায়িত্বশীলতা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখা প্রয়োজন। শাল্লায় শুরু হওয়া এই প্রশিক্ষণ মাঠপর্যায়ে সেই দায়িত্ব পালনের প্রস্তুতিকে আরও শক্তিশালী করবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।


