প্রকাশ: ৮ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
দেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তর ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন নিয়ে অপেক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে। আগামী সোমবার (১২ অক্টোবর) ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের বহুল প্রতীক্ষিত রোডম্যাপ ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ওই দিন কমিশনের বৈঠকে রোডম্যাপটি চূড়ান্ত করার পর তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে। এতে দেশের ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে কখন এবং কীভাবে ধাপে ধাপে ভোট আয়োজন করা হবে, তার একটি পূর্ণাঙ্গ কাঠামো তুলে ধরা হবে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে ব্রিফিংকালে এ তথ্য জানান নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। তিনি জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি এবং বিভিন্ন পর্যায়ের কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করতেই রোডম্যাপ প্রকাশ করা হচ্ছে।
ইউনিয়ন পরিষদ দেশের স্থানীয় সরকারের সবচেয়ে তৃণমূল পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। গ্রামাঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন জীবন, স্থানীয় অবকাঠামো, নাগরিক সেবা, সামাজিক উন্নয়ন এবং বিভিন্ন সরকারি কার্যক্রম বাস্তবায়নের সঙ্গে ইউনিয়ন পরিষদের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে। ফলে জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচনের বাইরে স্থানীয় পর্যায়ে ইউপি নির্বাচনও সাধারণ মানুষের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। নির্বাচনের সময়সূচি, ধাপ এবং প্রস্তুতির বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া গেলে সম্ভাব্য প্রার্থী, ভোটার, রাজনৈতিক দল এবং প্রশাসনের জন্যও পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া সহজ হবে।
নির্বাচন কমিশন এর আগে জানিয়েছিল, দেশে মোট ৪ হাজার ৫৮০টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে। এর মধ্যে ৪ হাজার ২৭২টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন আয়োজনের প্রয়োজন রয়েছে বলে কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এসব নির্বাচন একসঙ্গে আয়োজন না করে কয়েকটি ধাপে করার প্রাথমিক পরিকল্পনা নিয়েছে ইসি। সেপ্টেম্বর মাসে কমিশন জানিয়েছিল, প্রথম ধাপের ভোট ১২ নভেম্বর থেকে শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী সাত ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের কথা জানিয়েছিল কমিশন। সেই পরিকল্পনায় প্রথম ধাপের সম্ভাব্য ভোটের তারিখ ছিল ১২ নভেম্বর। এরপর ১৩ ডিসেম্বর, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৭ সালের ১৭ জানুয়ারি, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২২ এপ্রিল এবং ২৭ মে—এই তারিখগুলোকে পরবর্তী ধাপের সম্ভাব্য ভোটের দিন হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। তবে এগুলো ছিল প্রাথমিক পরিকল্পনা; চূড়ান্ত রোডম্যাপ প্রকাশের আগে বিভিন্ন বাস্তবতা বিবেচনায় সময়সূচিতে পরিবর্তন আসতে পারে।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ইউপি নির্বাচনের সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন জাতীয় ও সামাজিক বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বার্ষিক ও বোর্ড পরীক্ষা, ধর্মীয় উৎসব, রমজান এবং ঈদের মতো গুরুত্বপূর্ণ সময় যাতে ভোট আয়োজনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়, সেদিকেও নজর রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে আইনগত বাধ্যবাধকতা এবং সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদগুলোর মেয়াদ শেষ হওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
এর আগে ইসি জানিয়েছিল, প্রথম ধাপে ৮০টি উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদে ভোট আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিক পরিকল্পনায় দেশের ৬৩ জেলার এসব উপজেলা থেকে প্রথম ধাপের নির্বাচন শুরু করার কথা বলা হয়েছিল। তবে চূড়ান্ত রোডম্যাপে কোন কোন ইউনিয়ন কোন ধাপে থাকবে, সে বিষয়ে ১২ অক্টোবরের ঘোষণাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ইউপি নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেও আলোচনা করেছে নির্বাচন কমিশন। কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্যভাবে সম্পন্ন করতে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা প্রয়োজন। নির্বাচনের পরিবেশ, প্রস্তুতি এবং বিভিন্ন বাস্তব সমস্যা নিয়ে দলগুলোর মতামত নেওয়ার উদ্যোগও নিয়েছে ইসি। এর ফলে রোডম্যাপ ঘোষণার পর রাজনৈতিক অঙ্গনেও স্থানীয় নির্বাচনকে ঘিরে তৎপরতা বাড়তে পারে।
তৃণমূলের এই নির্বাচন নিয়ে সম্ভাব্য প্রার্থী ও ভোটারদের মধ্যেও আগ্রহ বাড়ছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সাধারণত স্থানীয় মানুষের সঙ্গে প্রার্থীদের সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করে। গ্রামের রাস্তা, সড়কবাতি, পানি ও স্যানিটেশন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, জন্মনিবন্ধনসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবার সঙ্গে ইউনিয়ন পরিষদের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক থাকায় স্থানীয় নেতৃত্ব নির্বাচনে ভোটারদের আগ্রহও থাকে। তাই নির্বাচন কমিশনের রোডম্যাপ প্রকাশের পর নির্বাচনী প্রস্তুতি আরও দৃশ্যমান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের আগ্রহের বিষয়টিও সামনে এসেছে। এদিন প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার। স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে ইসির সঙ্গে কাজ করার পরিকল্পনা ও সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
ব্রিফিংয়ে প্রবাসীদের ভোটাধিকার কার্যকর করার বিষয়েও কথা বলেন নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ। তিনি জানান, বাংলাদেশের প্রবাসী ভোটিং ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণে নেপাল আগ্রহ দেখিয়েছে। দেশটির নির্বাচন কমিশন বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে চায় এবং এ বিষয়ে দুই দেশের নির্বাচন কমিশনের মধ্যে যোগাযোগ ও মতবিনিময় হয়েছে।
বাংলাদেশে প্রবাসী ভোটারদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার উদ্যোগ সাম্প্রতিক সময়ে নির্বাচন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে সামনে এসেছে। দেশের বাইরে থাকা নাগরিকদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ তৈরি করতে নির্বাচন কমিশন যে প্রযুক্তি ও প্রক্রিয়াগত ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছে, সেটি অন্যান্য দেশও পর্যবেক্ষণ করছে। নেপালের আগ্রহ সেই আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণেরই একটি উদাহরণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে এখন সবচেয়ে বেশি নজর ১২ অক্টোবরের ইউপি নির্বাচনের রোডম্যাপের দিকে। কারণ এই রোডম্যাপের মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পরবর্তী ধাপগুলো সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। কোন পর্যায়ে প্রস্তুতি শেষ করতে হবে, কখন নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু হতে পারে এবং কতগুলো ধাপে ভোট আয়োজন করা হবে—এসব বিষয়ে কমিশনের পরিকল্পনা স্পষ্ট হবে।
ইউপি নির্বাচনের মতো বড় পরিসরের স্থানীয় নির্বাচন আয়োজন করতে ভোটকেন্দ্র প্রস্তুত, ভোটার তালিকা, নির্বাচনী কর্মকর্তা নিয়োগ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, ব্যালট ও অন্যান্য নির্বাচনী সামগ্রীসহ নানা বিষয় সমন্বয় করতে হয়। হাজার হাজার ইউনিয়নে ভোট আয়োজনের কারণে কমিশনের মাঠ প্রশাসনের ওপরও বড় ধরনের দায়িত্ব পড়ে। তাই আগেভাগে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করা হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ বাড়ে।
নির্বাচন কমিশনের জন্য এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচন আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচনের পর তৃণমূল পর্যায়ে ভোটের পরিবেশ কতটা শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক রাখা যায়, সেটিও নজরে থাকবে রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও সাধারণ ভোটারদের। বিশেষ করে ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সরাসরি হওয়ায় স্থানীয় পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা ও নির্বাচনী আচরণবিধি কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে ১২ অক্টোবরের রোডম্যাপ ঘোষণাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি আরও গতি পেতে যাচ্ছে। কমিশনের ঘোষিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা, প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা এবং ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন তৃণমূলের গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। এখন অপেক্ষা, ১২ অক্টোবর কমিশনের বৈঠক শেষে রোডম্যাপে ঠিক কী সিদ্ধান্ত আসে এবং সেই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে দেশের হাজার হাজার ইউনিয়নে নির্বাচনী কার্যক্রম কীভাবে এগিয়ে যায়।

