প্রকাশ: ৮ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে পানি বণ্টন দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। দুই দেশের অভিন্ন নদী, সীমান্তবর্তী জনপদ, কৃষি ও পরিবেশের সঙ্গে পানির প্রবাহ সরাসরি যুক্ত। ফলে নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা বাংলাদেশের জন্য কেবল কূটনৈতিক আলোচনার বিষয় নয়, দেশের মানুষের জীবন-জীবিকা ও ভবিষ্যৎ পানিনিরাপত্তার সঙ্গেও এটি গভীরভাবে সম্পর্কিত।
ভারতের সঙ্গে পানি সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকার দেশের স্বার্থে সর্বোচ্চটা আদায় করতে চাইবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তিনি বলেছেন, ভারত থেকে পানির ন্যায্য হিস্যা পাওয়াই বাংলাদেশের প্রত্যাশা। পানি বণ্টনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক আইনের অবস্থান রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ঢাকায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) আয়োজিত ‘পানির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন ভাবনা: তরুণ নেতৃত্ব, ন্যায়বিচার ও সহযোগিতা’ শীর্ষক সেমিনারে এক প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
সেমিনারে পানি সহযোগিতার ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ ও নিয়মিত সংলাপের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন হুমায়ুন কবির। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পানি নিয়ে বিদ্যমান ও ভবিষ্যৎ বিষয়গুলো আলোচনার মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়াই বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানের অন্যতম প্রধান পথ।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে পানি সহযোগিতা নিয়ে কাজ করার জন্য একটি কমিটি গঠন করেছে। একই সঙ্গে আলোচনায় ভারতীয় পক্ষের প্রতিনিধিদের যুক্ত করার লক্ষ্যে তাদের নাম চাওয়া হয়েছে। ভারতীয় প্রতিনিধিদের নাম পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে আলোচনা শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশ ভারতের কাছে প্রতিনিধিদের নাম চেয়েছে, যাতে দুই দেশের প্রতিনিধিরা সংলাপ ও আলোচনা শুরু করতে পারেন। এখন ভারতীয় পক্ষের জবাবের অপেক্ষা করছে ঢাকা। তাঁর আশা, খুব শিগগিরই এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যেতে পারে। এরপর আলোচনার মাধ্যমে পানি চুক্তি নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
পানি বণ্টনের প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থানের অন্যতম ভিত্তি আন্তর্জাতিক আইন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক আইনের অবস্থান বাংলাদেশের পক্ষে রয়েছে। একই সঙ্গে দেশের জনগণের সমর্থন ও পানির ন্যায্য হিস্যার আকাঙ্ক্ষাও আলোচনার টেবিলে বাংলাদেশের অবস্থানকে শক্তিশালী করে।
বাংলাদেশের জন্য পানি প্রশ্নটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশের অসংখ্য নদী উজান থেকে নেমে এসেছে এবং অনেক নদীর পানিপ্রবাহ সীমান্তের ওপারের ব্যবস্থাপনা ও ব্যবহার পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত। নদীর পানির প্রবাহে পরিবর্তন হলে তার প্রভাব পড়ে কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন, পরিবেশ ও স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রায়। শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রাপ্যতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বর্ষায় অতিরিক্ত পানির ব্যবস্থাপনাও দুই দেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পানি ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতাকে কেবল একটি নির্দিষ্ট নদী বা একটি চুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বৃহত্তর আন্তঃসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। আন্তর্জাতিক নদীর পানি ব্যবহারে পারস্পরিক সহযোগিতা, তথ্য বিনিময় এবং বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন ভবিষ্যতের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
পানি নিয়ে আলোচনায় তরুণদের সম্পৃক্ততার বিষয়টিও এবারের বিআইআইএসএস সেমিনারে গুরুত্ব পেয়েছে। অনুষ্ঠানের বিষয়বস্তুর মধ্যেই ছিল তরুণ নেতৃত্ব, ন্যায়বিচার ও সহযোগিতা। এর মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতের পানি কূটনীতিতে নতুন প্রজন্মের দক্ষতা ও অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে আনা হয়েছে।
আন্তঃসীমান্ত পানি নিয়ে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জও কম নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষিতে পানির চাহিদা, নগরায়ণ এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের পরিবর্তন—সবকিছু মিলিয়ে পানির গুরুত্ব আরও বাড়ছে। ফলে দুই দেশের মধ্যে পানি বিষয়ে আলোচনা কেবল অতীতের চুক্তি বা বর্তমানের বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতের কাছে ন্যায্য হিস্যার দাবি নতুন নয়। তবে নতুন করে কমিটি গঠন এবং ভারতীয় প্রতিনিধিদের নাম চাওয়ার বিষয়টি আলোচনাকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে এগিয়ে নেওয়ার একটি উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভারতীয় পক্ষের সাড়া পাওয়ার পর আলোচনার পরবর্তী ধাপ কীভাবে এগোয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে পানি একটি স্পর্শকাতর বিষয় হলেও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যে কূটনীতি ও সংলাপের মাধ্যমে মতপার্থক্য কমানোর বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। দুই দেশের নেতৃত্বের মধ্যে সহযোগিতার মানসিকতা থাকলে পানি নিয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ সমাধানের সুযোগ রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে পানির প্রশ্নের গুরুত্ব আরও ব্যাপক। দেশের কৃষক সেচের পানির ওপর নির্ভর করেন, নদীকেন্দ্রিক মানুষের জীবিকা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের সঙ্গে যুক্ত, আবার অনেক এলাকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যও নদী ও জলাভূমির পানির ওপর নির্ভরশীল। তাই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পানি নিয়ে যে আলোচনা হয়, তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জীবনেও পৌঁছে যায়।
বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানির প্রাপ্যতা কমে গেলে কৃষি ও পরিবেশে তার প্রভাব দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি ও আকস্মিক প্রবাহের বিষয়টিও সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফলে পানি ব্যবস্থাপনায় আগাম তথ্য বিনিময়, নদীর প্রবাহ পর্যবেক্ষণ এবং যৌথ উদ্যোগ ভবিষ্যতের সহযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে।
এ অবস্থায় বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি বিষয় সমান্তরালে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে—একদিকে আন্তর্জাতিক আইন ও দেশের স্বার্থের ভিত্তিতে ন্যায্য হিস্যার দাবি তুলে ধরা, অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে কার্যকর ও নিয়মিত সংলাপ জোরদার করা। ঢাকা ইতোমধ্যে কমিটি গঠন করে ভারতীয় প্রতিনিধিদের নাম চাওয়ায় সেই প্রক্রিয়ার প্রাথমিক কাঠামো তৈরি হয়েছে।
ভারতের পক্ষ থেকে কী ধরনের সাড়া আসে এবং পরবর্তী আলোচনায় কোন কোন বিষয় অগ্রাধিকার পায়, তা এখন দেখার বিষয়। তবে বাংলাদেশের অবস্থান যে আলোচনার মাধ্যমে দেশের স্বার্থে ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করার দিকে—পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে সেটিই স্পষ্ট হয়েছে। পানি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধানের জন্য দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা, আস্থা ও নিয়মিত সংলাপই সামনে এগিয়ে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ পথ হয়ে উঠতে পারে।


