প্রকাশ: ৮ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বিশ্বের অন্যতম বড় পোশাকের বাজার যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বছরের প্রথম আট মাসে কিছুটা চাপ দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে আগস্টের হিসাব যুক্ত হওয়ার পর একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান এক ধাপ নেমে গেছে। বাংলাদেশকে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে চীন। তবে একই সময়ে চীনের রপ্তানিতেও বড় ধরনের পতন হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের অবস্থান হারানোর ঘটনাটি কেবল দেশের নিজস্ব রপ্তানি কমার কারণে নয়, বরং প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর রপ্তানি প্রবণতার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের আওতাধীন অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেল বা অটেক্সার সর্বশেষ পরিসংখ্যানে জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসের এই চিত্র উঠে এসেছে। তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৫৩৯ কোটি ৩৪ লাখ ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এই রপ্তানি কমেছে ৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
অন্যদিকে, একই সময়ে চীন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রায় ৫৬৩ কোটি ৭ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। ফলে সামগ্রিক হিসাবে বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে দেশটি। তবে চীনের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দেশটির যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি প্রায় ২৯ শতাংশের বেশি কমেছে বলে সর্বশেষ বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশই চীনের চেয়ে এগিয়ে ছিল। ওই সাত মাসে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৪৬৫ কোটি ৮৯ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি করে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল। একই সময়ে চীনের রপ্তানি ছিল প্রায় ৪৫৫ কোটি ডলার। আগস্টের রপ্তানি যোগ হওয়ার পর চীন আবার বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে যায়।
তবে আট মাসের সামগ্রিক হিসাবের পাশাপাশি আগস্টের আলাদা চিত্র বাংলাদেশের জন্য কিছুটা আশাব্যঞ্জক। অটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি আগের বছরের একই মাসের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। অন্যদিকে, বছরের প্রথম দিকের দুর্বল পারফরম্যান্সের কারণে আট মাসের সামগ্রিক হিসাবে এখনো নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি রয়েছে।
বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রই বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্য। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আয়ের একটি বড় অংশ আসে এই বাজার থেকে। ফলে সেখানে রপ্তানি কমে যাওয়া কিংবা প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানের পরিবর্তন দেশের পোশাকশিল্পের উৎপাদক, রপ্তানিকারক এবং সংশ্লিষ্ট শ্রমবাজারের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
গত কয়েক বছরেও মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে ওঠানামা দেখা গেছে। ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে প্রায় ৯৭৩ কোটি ডলারে পৌঁছেছিল। এরপর ২০২৩ সালে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, সুদের হার বৃদ্ধি এবং ভোক্তা চাহিদার পরিবর্তনের প্রভাবে রপ্তানি কমে প্রায় ৭২৯ কোটি ডলারে নেমে আসে। ২০২৪ সালে তা সামান্য বেড়ে প্রায় ৭৩৪ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। ২০২৫ সালে আবার প্রবৃদ্ধি ফিরে আসে এবং রপ্তানি প্রায় ৮২০ কোটি ডলারে পৌঁছায়।
চলতি বছরের পরিস্থিতি অবশ্য শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক পোশাক আমদানি বাজারের জন্যও চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ৪৯০৮ কোটি ডলারের পোশাক আমদানি করেছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই আমদানি কমেছে প্রায় ৭ দশমিক ৪২ শতাংশ। অর্থাৎ বাংলাদেশের রপ্তানি কমার পেছনে শুধু দেশীয় সক্ষমতা বা প্রতিযোগিতার বিষয় নয়, মার্কিন বাজারের সামগ্রিক আমদানি সংকোচনের প্রভাবও রয়েছে।
বিশ্ববাজারে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানির এই পরিবর্তনের পেছনে ভোক্তা চাহিদা, পণ্যের দাম, মজুত ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতির মতো বিভিন্ন বিষয় কাজ করছে। একই সময়ে বিভিন্ন সরবরাহকারী দেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাবও দেখা যাচ্ছে। ফলে মার্কিন ক্রেতাদের সোর্সিং সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আসছে এবং সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হচ্ছে।
এই প্রতিযোগিতায় এখনো শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে ভিয়েতনাম। জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ১০৯৮ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ভিয়েতনামের রপ্তানি সামান্য কমলেও দেশটি অন্য সরবরাহকারী দেশগুলোর তুলনায় অনেক এগিয়ে রয়েছে।
ভিয়েতনামের অবস্থান বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিযোগিতামূলক বাস্তবতা তৈরি করছে। মার্কিন বাজারে ভিয়েতনাম তুলনামূলকভাবে উচ্চমূল্যের পোশাক, ক্রীড়া ও পারফরম্যান্স পোশাকসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্যে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। পাশাপাশি দ্রুত সরবরাহ ও পণ্যের বৈচিত্র্যও তাদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার অংশ। বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য এসব জায়গায় সক্ষমতা বাড়ানো ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক দিক হলো, চীন ও ভারতের মতো বড় প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম আট মাসে রপ্তানি কমার হার তুলনামূলকভাবে কম। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনের পোশাক আমদানি প্রায় ২৯ শতাংশ এবং ভারতের প্রায় ২৬ শতাংশের বেশি কমেছে। পাকিস্তানেরও রপ্তানি কমেছে, যদিও তুলনামূলকভাবে কম হারে। বিপরীতে কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো কয়েকটি দেশ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পেরেছে।
এই পরিসংখ্যান থেকে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট হচ্ছে—মার্কিন বাজারে চাহিদা কমলেও বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান পুরোপুরি দুর্বল হয়ে পড়েনি। বরং সামগ্রিক বাজার সংকোচনের মধ্যেও বাংলাদেশের রপ্তানি তুলনামূলকভাবে কম হারে কমেছে। আগস্টে রপ্তানি বৃদ্ধির প্রবণতাও ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা আশার জায়গা তৈরি করেছে। তবে সেটিকে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধিতে পরিণত করতে হলে কেবল বিদ্যমান পণ্যের ওপর নির্ভর না করে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী নতুন পণ্য ও উচ্চমূল্যের পোশাকে সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে ভবিষ্যতে আরও বেশি মূল্য সংযোজন, পণ্যের বৈচিত্র্য এবং কৃত্রিম তন্তুভিত্তিক পোশাক উৎপাদনের দিকে নজর দিতে হবে। কারণ বিশ্ববাজারে ক্রেতাদের চাহিদা পরিবর্তিত হচ্ছে। শুধু তুলাভিত্তিক প্রচলিত পোশাকের ওপর নির্ভর করলে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকা কঠিন হতে পারে।
এ ছাড়া জ্বালানি সরবরাহ, উৎপাদন ব্যয়, অবকাঠামো, ব্যাংকিং সুবিধা এবং নীতিগত ধারাবাহিকতার মতো বিষয়ও পোশাকশিল্পের সক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এখন শুধু কম দাম নয়, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ, মান, পরিবেশগত মানদণ্ড এবং উৎপাদনের স্থিতিশীলতাকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন।
মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের দ্বিতীয় অবস্থান হারানো তাই একক কোনো পরিসংখ্যান দিয়ে পোশাকশিল্পের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিচার করার সুযোগ দেয় না। একদিকে আট মাসের হিসাবে রপ্তানি কমেছে এবং চীন বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে গেছে। অন্যদিকে, চীনের পতন বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি এবং আগস্টে বাংলাদেশের রপ্তানিতে পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ফলে প্রতিযোগিতার এই অবস্থান সামনের মাসগুলোতে আবারও পরিবর্তিত হতে পারে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও কর্মসংস্থানের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় বাজারে অবস্থান ধরে রাখা তাই অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সাময়িক ওঠানামা সামলে দীর্ঘমেয়াদে বাজারের অংশ বাড়ানো এবং প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা।
অগাস্টের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি যদি পরবর্তী মাসগুলোতেও ধরে রাখা যায়, তাহলে বাংলাদেশের জন্য আবারও মার্কিন বাজারে অবস্থান শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তিত চাহিদা, মূল্য প্রতিযোগিতা এবং সরবরাহব্যবস্থার বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে পোশাকশিল্পকে আরও বৈচিত্র্যময় ও উচ্চমূল্যের পণ্যের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে দ্বিতীয় স্থান হারানোর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান তাই বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য একই সঙ্গে সতর্কবার্তা এবং নতুন করে প্রতিযোগিতায় ঘুরে দাঁড়ানোর একটি সুযোগ হিসেবেও দেখা যেতে পারে।


