প্রকাশ: ৬ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে স্থানীয় ক্রিকেটকে আরও সংগঠিত ও প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের বিকাশের সুযোগ তৈরি করতে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে শ্রীমঙ্গল ক্রিকেট একাডেমি। মঙ্গলবার সকালে ঐতিহ্যবাহী ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে একাডেমিটির উদ্বোধন করেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক। একই সফরে তিনি মাঠের সংস্কারকাজ, খেলোয়াড়দের জন্য নবনির্মিত ড্রেসিংরুম এবং শ্রীমঙ্গল উপজেলায় মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণের সম্ভাব্য স্থান পরিদর্শন করেন।
শ্রীমঙ্গলের ক্রীড়াঙ্গনে নতুন এই উদ্যোগকে ঘিরে স্থানীয় খেলোয়াড়, প্রশিক্ষক, সংগঠক ও ক্রীড়াপ্রেমীদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। আয়োজকদের প্রত্যাশা, একটি নিয়মিত প্রশিক্ষণভিত্তিক কাঠামোর মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে ক্রিকেটারদের দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে বয়সভিত্তিক ও উচ্চপর্যায়ের প্রতিযোগিতায় শ্রীমঙ্গলের খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণের সুযোগ আরও বিস্তৃত হবে।
স্থানীয় সূত্র ও প্রকাশিত কর্মসূচি অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে প্রতিমন্ত্রীর শ্রীমঙ্গলে পৌঁছানোর কথা ছিল। সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে তিনি ক্রিকেট একাডেমির উদ্বোধন করেন। এরপর বেলা ১১টার দিকে খেলোয়াড়দের জন্য নির্মিত ড্রেসিংরুম উদ্বোধন এবং সাড়ে ১১টার দিকে ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের সংস্কারকাজ পরিদর্শনের কর্মসূচি ছিল। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শ্রীমঙ্গলে মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণের জন্য প্রস্তাবিত স্থানও পরিদর্শনের কথা জানানো হয়েছিল।
ক্রিকেট একাডেমির উদ্বোধনকে কেবল একটি নতুন প্রতিষ্ঠান চালুর আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখছেন না স্থানীয় ক্রীড়া সংশ্লিষ্টরা। শ্রীমঙ্গলের মতো একটি উপজেলা শহরে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, উপযুক্ত মাঠ, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, দক্ষ কোচিং এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ—এই কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে নিশ্চিত করা গেলে তরুণদের ক্রিকেটে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। একাডেমির কার্যক্রম কতটা নিয়মিত ও মানসম্মতভাবে পরিচালিত হবে, সেটিই এখন বড় বিষয় হয়ে উঠছে।
শ্রীমঙ্গলে ক্রিকেটের চর্চা অবশ্য নতুন নয়। বিভিন্ন সময় স্থানীয় মাঠে স্কুল, ক্লাব ও একাডেমিভিত্তিক ক্রিকেট কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠও দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় ক্রীড়া আয়োজনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভেন্যু হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পুরোনো বিভিন্ন ক্রীড়া আয়োজনের তথ্যেও এই মাঠে স্কুল ও ক্রিকেট টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হওয়ার নজির পাওয়া যায়।
এ অঞ্চলের ক্রিকেটে সম্ভাবনাও কম নয়। এর আগে শ্রীমঙ্গল ও আশপাশের এলাকার তরুণ খেলোয়াড়দের বয়সভিত্তিক দল ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষণের সুযোগ পেয়ে অন্য জেলা বা বড় শহরে গিয়ে ক্রিকেটে এগিয়ে যাওয়ার উদাহরণও রয়েছে। ফলে নতুন একাডেমির সামনে শুধু অনুশীলনের জায়গা তৈরি নয়, প্রতিভা শনাক্ত করে ধাপে ধাপে তাদের উন্নয়নের একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।
একাডেমির কার্যক্রম সফল করতে প্রশিক্ষণের মান, কোচদের দক্ষতা, বয়সভিত্তিক প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা এবং নিয়মিত প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিশেষ করে স্কুলপড়ুয়া ক্রিকেটারদের পড়াশোনার সঙ্গে খেলাধুলার সমন্বয় রেখে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে স্থানীয় পর্যায় থেকে প্রতিভা তুলে আনা সহজ হতে পারে। একই সঙ্গে প্রশিক্ষণের সুযোগ যেন শুধু শহরকেন্দ্রিক না থাকে, উপজেলার বিভিন্ন এলাকার আগ্রহী ও সম্ভাবনাময় খেলোয়াড়দেরও যুক্ত করার বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে।
প্রতিমন্ত্রীর সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল শ্রীমঙ্গলের ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়টি। ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের সংস্কারকাজ পরিদর্শনের পাশাপাশি মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণের জন্য সম্ভাব্য স্থান দেখার কর্মসূচি ছিল সফরে। এর মাধ্যমে ক্রিকেটের পাশাপাশি অন্যান্য খেলাধুলার জন্যও স্থানীয় পর্যায়ে অবকাঠামোগত সুযোগ তৈরির বিষয়টি সামনে এসেছে।
ক্রিকেট একাডেমির উদ্বোধনের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক দেশের বিদ্যমান জেলা স্টেডিয়ামগুলো আধুনিকায়ন ও প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ ক্রীড়া অবকাঠামো হিসেবে গড়ে তোলার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, নতুন অবকাঠামো নির্মাণের আগে বিদ্যমান মাঠ ও স্টেডিয়ামগুলোকে যথাযথভাবে ব্যবহারোপযোগী করার ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। তৃণমূল থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত একটি সমন্বিত ক্রীড়া কাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যেও কাজ করার কথা জানান তিনি।
এই বক্তব্যের সঙ্গে শ্রীমঙ্গলে একাডেমি, ড্রেসিংরুম ও মাঠ উন্নয়নের উদ্যোগের একটি সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। কারণ খেলোয়াড় তৈরির জন্য শুধু একাডেমি থাকলেই হয় না; অনুশীলনের উপযোগী মাঠ, খেলোয়াড়দের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা, প্রশিক্ষণ এবং প্রতিযোগিতার ধারাবাহিকতাও প্রয়োজন। এসব সুবিধা একসঙ্গে তৈরি হলে একটি স্থানীয় ক্রীড়া কাঠামো ধীরে ধীরে কার্যকর হয়ে উঠতে পারে।
স্থানীয় ক্রীড়াপ্রেমীদের জন্য তাই নতুন একাডেমির উদ্বোধন একটি প্রত্যাশার জায়গা তৈরি করেছে। বিশেষ করে যেসব কিশোর-তরুণ নিয়মিত ক্রিকেট খেলেন, কিন্তু কাঠামোবদ্ধ প্রশিক্ষণের সুযোগ সীমিত, তাদের জন্য একাডেমিটি নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন হবে।
শ্রীমঙ্গলের ক্রীড়া উন্নয়নের আলোচনায় মিনি স্টেডিয়ামের সম্ভাব্য নির্মাণও গুরুত্বপূর্ণ। একটি আধুনিক ক্রীড়া ভেন্যু তৈরি হলে ক্রিকেটের পাশাপাশি ফুটবলসহ অন্যান্য খেলাধুলার আয়োজনের সুযোগ বাড়তে পারে। এতে স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতা আয়োজন, দর্শক তৈরি এবং তরুণদের খেলাধুলার সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত করার পরিবেশ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সফরসূচি অনুযায়ী, দুপুর ২টায় শ্রীমঙ্গলের গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্টে জেলা ক্রীড়া সংস্থা, মৌলভীবাজার আয়োজিত ‘জয়েন্ট স্পোর্টস কাউন্সিল, মৌলভীবাজার’-এও অংশ নেন প্রতিমন্ত্রী। এরপর বিকেলে তাঁর শ্রীমঙ্গল ত্যাগ করে ঢাকায় ফেরার কর্মসূচি ছিল।
সব মিলিয়ে শ্রীমঙ্গলে ক্রিকেট একাডেমির আনুষ্ঠানিক যাত্রা স্থানীয় ক্রীড়াঙ্গনে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। তবে উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে কাজ শেষ নয়; বরং এখান থেকেই শুরু হবে প্রকৃত পরীক্ষা। কতজন তরুণ নিয়মিত প্রশিক্ষণের সুযোগ পান, কতটা দক্ষ প্রশিক্ষণ নিশ্চিত হয়, প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের কীভাবে প্রতিযোগিতামূলক পর্যায়ে নেওয়া হয় এবং মাঠ ও অন্যান্য অবকাঠামো কতটা কার্যকর রাখা যায়—এসবের ওপর নির্ভর করবে উদ্যোগটির দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য।
একটি মাঠে ব্যাট-বলের অনুশীলন থেকে জাতীয় পর্যায়ের ক্রিকেটে পৌঁছানোর পথ দীর্ঘ। সেই পথের শুরুতে প্রয়োজন সুযোগ, প্রশিক্ষণ ও পরিচর্যা। শ্রীমঙ্গলের নতুন ক্রিকেট একাডেমি যদি সেই সুযোগটুকু নিয়মিতভাবে তৈরি করতে পারে, তাহলে চা-বাগান ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত এই জনপদ ভবিষ্যতে ক্রিকেট প্রতিভা তৈরির ক্ষেত্রেও নিজের আলাদা পরিচয় গড়ে তুলতে পারে।


