প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
আন্দোলন ও প্রশাসনিক অচলাবস্থার মধ্যে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (সিকৃবি) উপাচার্য পরিবর্তন করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রিকালচার এক্সটেনশন অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফি উল্লাহ মজুমদার। রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলরের অনুমোদনে তাঁকে চার বছরের জন্য এ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে সহকারী সচিব মো. সুলতান আহমেদ স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে এ নিয়োগের বিষয়টি জানানো হয়। প্রজ্ঞাপনে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০০৬-এর ১০(১) ধারার কথা উল্লেখ করে নতুন উপাচার্য নিয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
নতুন উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফি উল্লাহ মজুমদার শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রিকালচার এক্সটেনশন অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগে অধ্যাপনা করছেন। নতুন দায়িত্বে তাঁর সামনে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা পুনর্গঠন এবং সাম্প্রতিক আন্দোলনের কারণে তৈরি হওয়া অচলাবস্থা কাটিয়ে ওঠার মতো একাধিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
এর আগে ২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড হাইজিন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আলিমুল ইসলাম। তাঁর মেয়াদেই বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনিক বিষয় নিয়ে শিক্ষক ও অন্য অংশীজনদের মধ্যে মতবিরোধের ঘটনা সামনে আসে।
সাম্প্রতিক সময়ে অধ্যাপক আলিমুল ইসলামের অপসারণের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী আন্দোলন শুরু করেন। আন্দোলনকারীরা উপাচার্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তাঁর পদত্যাগ দাবি করেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে সত্যতা নিশ্চিত করার মতো তথ্য পাওয়া যায়নি; ফলে অভিযোগগুলোকে আন্দোলনকারীদের বক্তব্য হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টানা প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলা আন্দোলনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রমে অচলাবস্থা তৈরি হয়। এ পরিস্থিতির মধ্যেই উপাচার্য পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত আসে।
তবে সিকৃবিতে অধ্যাপক আলিমুল ইসলামকে ঘিরে অসন্তোষের ঘটনা একেবারে নতুন নয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতেও তাঁর কার্যালয়ে শিক্ষক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল। সে সময় কয়েকজন আহত হন বলে দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছিল। শিক্ষকরা নিয়োগ ও প্রশাসনিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে উপাচার্যের সঙ্গে আলোচনা করতে গেলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
ওই ঘটনায় শিক্ষক পক্ষ থেকে উপাচার্যের আমলে নিয়োগ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে নানা অভিযোগ তোলা হয়েছিল। অন্যদিকে অধ্যাপক আলিমুল ইসলাম অভিযোগ করেছিলেন, একপর্যায়ে তাঁকে আক্রমণের চেষ্টা করা হয় এবং তাঁর কার্যালয়ের কর্মীদের সঙ্গে শিক্ষকদের সংঘর্ষ ঘটে। তিনি আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছিলেন। দুই পক্ষের বক্তব্যে ঘটনার বর্ণনায় পার্থক্য ছিল।
সাম্প্রতিক আন্দোলনের সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রসঙ্গও এসেছে বিভিন্ন প্রতিবেদনে। আন্দোলনকারীদের একটি অংশকে বিএনপিপন্থী শিক্ষক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে আন্দোলনের উদ্দেশ্য বা অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করা যায় না। উপাচার্যের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা সিদ্ধান্তের তথ্যই চূড়ান্তভাবে বিবেচনার বিষয়।
উপাচার্য পরিবর্তনের ফলে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম দ্রুত ফিরিয়ে আনা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ সময় ধরে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক অচলাবস্থা চললে তার প্রভাব শুধু প্রশাসনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; ক্লাস, পরীক্ষা, গবেষণা, নিয়োগ, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন একাডেমিক কার্যক্রমেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কৃষি শিক্ষা ও গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। তাই নেতৃত্বের পরিবর্তনের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশ স্থিতিশীল রাখা এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সব অংশীজনের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা নতুন প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
নতুন উপাচার্যের দায়িত্ব গ্রহণের পর সাম্প্রতিক আন্দোলন থেকে উঠে আসা অভিযোগ ও দাবিগুলো কীভাবে পর্যালোচনা করা হবে, সেটিও নজরে থাকবে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা, নিয়মতান্ত্রিকতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে নেতৃত্বের পরিবর্তন সাধারণত একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া হলেও সিকৃবির বর্তমান পরিস্থিতিতে এর তাৎপর্য কিছুটা ভিন্ন। কারণ নতুন উপাচার্য এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন, যখন পূর্ববর্তী প্রশাসনকে ঘিরে আন্দোলন তীব্র হয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার খবর এসেছে।
এখন নতুন প্রশাসনের প্রথম দিকের পদক্ষেপগুলোই অনেকটা নির্ধারণ করবে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ কোন দিকে এগোয়। শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করে আস্থার পরিবেশ তৈরি করা এবং একাডেমিক কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলে চলমান সংকট থেকে বেরিয়ে আসার পথ তৈরি হতে পারে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত পদক্ষেপ ও সিদ্ধান্ত নতুন প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপরই নির্ভর করবে।
রাষ্ট্রপতির আদেশে চার বছরের জন্য নতুন উপাচার্য নিয়োগের মধ্য দিয়ে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে আনুষ্ঠানিক পরিবর্তন এসেছে। এখন মূল প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তনের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক মতবিরোধ ও সাম্প্রতিক আন্দোলনের প্রভাব কতটা দ্রুত কাটিয়ে স্বাভাবিক একাডেমিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা যায়। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকসমাজের প্রত্যাশা, প্রশাসনের সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপ—সবকিছুর ওপরই সিকৃবির আগামী দিনের পরিবেশ অনেকাংশে নির্ভর করবে।


