প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারের দানকৃত অর্থের ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম ও অসাধু ভাগ-বাটোয়ারার অভিযোগের তদন্ত এবং বিতর্কিত একতরফা কমিটি বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন একদল সিলেটবাসী। ‘একতাবদ্ধ সিলেটবাসী’র উদ্যোগে রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) বিকেলে নগরীর কোর্ট পয়েন্টে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশে বক্তারা মাজারের দানকৃত অর্থের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানান। তাদের অভিযোগ, মাজারে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ভক্ত ও দর্শনার্থীদের দান করা অর্থের ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্ন রয়েছে। তারা দাবি করেন, এসব অর্থ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহারের সুযোগ থাকা উচিত নয়। একই সঙ্গে মাজার পরিচালনায় সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব ও আর্থিক কার্যক্রম সম্পর্কে স্পষ্টতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তারা।
তবে সমাবেশে উত্থাপিত অর্থ আত্মসাৎ বা অনিয়মের অভিযোগগুলোর বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো তদন্তের ফলাফল পাওয়া গেছে—এমন তথ্য প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। ফলে এসব বক্তব্যকে আয়োজকদের অভিযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য বা তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণের বিষয়টি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সমাবেশে বক্তারা মাজারের বর্তমান কমিটিকে ‘একতরফা’ ও ‘অবৈধ’ বলে অভিহিত করেন। তারা অবিলম্বে ওই কমিটি বাতিল করে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থাপনা কাঠামো গঠনের দাবি জানান। দাবি বাস্তবায়ন না হলে ভবিষ্যতে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে বলেও তারা হুঁশিয়ারি দেন।
‘একতাবদ্ধ সিলেটবাসী’র প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও ১১ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা মাওলানা রেজাউল করিম জালালীর সভাপতিত্বে সমাবেশটি অনুষ্ঠিত হয়। সিলেট ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য মইনুল ইসলাম আশরাফী কর্মসূচি সঞ্চালনা করেন।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার শুধু সিলেটের একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়; এটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থান। মাজারকে ঘিরে মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি ও দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য রয়েছে। ফলে এর দান, সম্পদ ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের আস্থা বজায় রাখতে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা প্রয়োজন।
কর্মসূচিতে এহছানুল হক তাহের, এম এ রহিম, আলহাজ্ব মোক্তার আহমদ তালুকদার, টিপু চৌধুরী, হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী, রুবেল আহমদ, এম এ রবিউল, মো. তোফায়েল আহমদ, আশরাফুল ইসলাম, জুলাই যোদ্ধা আব্দুশ শহীদ খান, আমিনুল ইসলাম বকুল, হাবিবুর রহমান হাবিব, ইমতিয়াজ রহমান ইনু, মাওলানা শফিকুর রহমান, মো. কামাল মিয়া, মীর মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন, ইমরান হোসাইন, মো. জামিল আহমদ লিটন, হাজী মো. আশরাফ আলী, শিপলু আহমদ, মনোয়ার হোসাইন, এসএ আলী জালালাবাদী, মো. জয়নাল আবেদীন, মো. মুজিবুর রহমান, মো. মাহফুজুর রহমান ও এম খাইরুল ইসলামসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
সমাবেশ শেষে বিক্ষোভকারীরা নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করেন। এ সময় তারা মাজারের দানকৃত অর্থের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং অর্থের অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
শাহজালাল মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে এর আগেও প্রশাসনিক পর্যায়ে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চলতি বছরের জুনে মাজারের দানের অর্থের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে কমিটির সদস্যসংখ্যা নিয়ে কিছু পার্থক্য দেখা গেলেও এর মূল উদ্দেশ্য হিসেবে মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনা এবং একটি কার্যকর ব্যবস্থাপনা কাঠামোর সুপারিশ তৈরির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর দানবাক্সের অর্থ প্রকাশ্যে গণনার উদ্যোগও নেওয়া হয়। জুলাই মাসে মাজারের দানবাক্স ও ডেগের অর্থ দ্বিতীয়বারের মতো প্রকাশ্যে গণনা করা হয়। এ কার্যক্রমে মাজার ব্যবস্থাপনা কমিটি, প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। গণনার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার উদ্যোগকে তখন মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল।
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়েও মাজারের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন সিদ্ধান্তের কথা প্রকাশ্যে আসে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, দানের অর্থ নিয়মিত গণনা ও ব্যবস্থাপনার জন্য নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং প্রতিদিন দানের অর্থ গণনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য হিসেবে আর্থিক স্বচ্ছতা ও ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের কথা জানানো হয়।
এই ধারাবাহিকতার মধ্যেই নতুন করে কমিটি বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ কর্মসূচি আয়োজন করায় মাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে জনপরিসরে বিতর্কটি আবার সামনে এসেছে। একদিকে প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দানের অর্থের হিসাব ও ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে; অন্যদিকে একটি অংশের নাগরিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিরা কমিটির গঠন ও পরিচালনা কাঠামো নিয়ে আপত্তি তুলছেন।
মাজারের মতো ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থানের ব্যবস্থাপনায় আস্থা বজায় রাখতে শুধু অর্থের হিসাব প্রকাশ করাই নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া, কমিটির কাঠামো, দায়িত্ব বণ্টন এবং আয়-ব্যয়ের তথ্যও পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন করা গুরুত্বপূর্ণ। এতে ভক্ত, স্থানীয় বাসিন্দা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে আস্থা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে কোনো অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই ও তদন্তের সুযোগও তৈরি হয়।
বিক্ষোভকারীদের পক্ষ থেকে ভবিষ্যতে আরও কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেওয়া হলেও পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট করা হয়নি। এখন মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, মাজারের ব্যবস্থাপনা ও দানের অর্থ নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ব্যাখ্যা দেয় এবং আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়।
শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ আসেন। তাদের দান ও সহযোগিতার সঙ্গে মাজারের ধর্মীয় কার্যক্রম, রক্ষণাবেক্ষণ এবং বিভিন্ন সেবামূলক ও উন্নয়নমূলক কাজের বিষয় জড়িত। ফলে এসব অর্থের ব্যবস্থাপনা নিয়ে মানুষের আস্থা ধরে রাখা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশ্য গণনা, কমিটি গঠন এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় নতুন কাঠামো তৈরির যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার কার্যকারিতা কতটা নিশ্চিত করা যায়—সেদিকেই এখন নজর থাকবে। একই সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে নিরপেক্ষ যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রকাশ পেলে পুরো বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে।
সিলেটের ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারের ব্যবস্থাপনা নিয়ে চলমান আলোচনা শেষ পর্যন্ত যেন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও জনআস্থার ভিত্তিতে একটি গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থাপনা কাঠামো তৈরির দিকে এগোয়—এটাই এখন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের প্রত্যাশা।

