প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট বিভাগে একসঙ্গে বাড়ছে হাম ও ডেঙ্গুর সংক্রমণ। সেপ্টেম্বরের শেষদিকে এসে দুটি সংক্রামক রোগের নতুন রোগী শনাক্তের পাশাপাশি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মানুষের সংখ্যাও উদ্বেগ তৈরি করছে। বিশেষ করে হাম-সদৃশ উপসর্গ নিয়ে শিশুদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যেই গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন আট মাস বয়সী আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় থেকে প্রকাশিত পৃথক প্রতিবেদনে এ পরিস্থিতির তথ্য উঠে এসেছে। স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাবে, গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগে নতুন করে ১৬ জনের শরীরে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে ১২ জন নতুন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। অর্থাৎ এক দিনেই দুই রোগে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা ২৮ জন।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে এ পর্যন্ত সিলেট বিভাগে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৯ জনে। এর পাশাপাশি হামের সন্দেহজনক রোগীও প্রতিদিন হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হাম নিয়ে আরও ১৬৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। সব মিলিয়ে বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে সন্দেহজনক হাম নিয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৫৬৩ জন।
হাম পরিস্থিতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হলো শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর ঘটনা। ২৭ সেপ্টেম্বরের স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, নিশ্চিত হাম ও সন্দেহজনক হাম মিলিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১৭৮ জন। পরদিন আরও একজন শিশুর মৃত্যুর পর সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭৯ জনে। মৃতদের মধ্যে ১০ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হামে এবং ১৬৯ জনের মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গ নিয়ে।
জেলাভিত্তিক হিসাবেও মৃত্যুর চিত্রে বড় পার্থক্য রয়েছে। মোট ১৭৯ মৃত্যুর মধ্যে সিলেট জেলায় ৭২ জন, সুনামগঞ্জে ৬৬ জন, হবিগঞ্জে ২৬ জন এবং মৌলভীবাজারে ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সিলেটে হামের উপসর্গ নিয়ে শিশু মৃত্যুর খবর একাধিকবার সামনে এসেছে। ২৭ সেপ্টেম্বরও ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছিল। তাদের বয়স ছিল ১০ মাস ও ৯ মাস। তার এক দিন পর আরও এক শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেল। ফলে সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহেও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর ধারাবাহিকতা থামেনি।
হামের পাশাপাশি এবার ডেঙ্গুর সংক্রমণও নতুন করে নজর কাড়ছে। স্বাস্থ্য বিভাগের ২৮ সেপ্টেম্বরের হিসাব অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগে নতুন করে ১২ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে চারজন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, একজন জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং সাতজন হবিগঞ্জের বিভিন্ন হাসপাতালে শনাক্ত হয়েছেন।
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সিলেট বিভাগে মোট ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন ৩৯৮ জন। এর মধ্যে হবিগঞ্জে ১৭২ জন, সিলেটে ৮৭ জন, সুনামগঞ্জে ৮৫ জন এবং মৌলভীবাজারে ৪১ জন আক্রান্ত হয়েছেন। এ ছাড়া বিভাগের বাইরে থেকে আসা ১৩ জনের শরীরেও ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে।
ডেঙ্গুতে চলতি বছর এ পর্যন্ত বিভাগে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। সিলেট, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে একজন করে মৃত্যুর তথ্য রয়েছে। তবে ২৮ সেপ্টেম্বরের আগের ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে নতুন কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি। বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ৩২ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
হাসপাতালভিত্তিক হিসাবেও ডেঙ্গু রোগীর চাপ স্পষ্ট। ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১২ জন, জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনজন এবং হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালে আটজন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ ছাড়া লাখাই, মাধবপুর ও চুনারুঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালেও ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন।
স্বাস্থ্য বিভাগের এই পরিসংখ্যান বলছে, সিলেটে একই সময়ে দুটি ভিন্ন সংক্রামক রোগের চাপ সামলাতে হচ্ছে চিকিৎসাব্যবস্থাকে। একদিকে হাম-সদৃশ উপসর্গ নিয়ে বিপুলসংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন, অন্যদিকে ডেঙ্গুতে নতুন রোগী শনাক্ত হওয়া অব্যাহত রয়েছে। ফলে হাসপাতালের শয্যা, চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে হাম প্রতিরোধে টিকাদান, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং আক্রান্ত ব্যক্তিকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার আওতায় আনা গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও চলতি বছর বাংলাদেশে হামের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। এপ্রিলের এক পরিস্থিতি প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানিয়েছিল, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতে সন্দেহজনক ও নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছিল এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরাই আক্রান্তদের বড় অংশ ছিল। তখন জাতীয় পর্যায়ে ঝুঁকি উচ্চ বলে মূল্যায়ন করেছিল WHO।
অন্যদিকে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশার প্রজননস্থল কমানো, বাড়ি ও আশপাশের পানি জমে থাকার স্থান পরিষ্কার রাখা এবং জ্বরসহ উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে রোগী বা পরিবারের ক্ষেত্রে নিজে থেকে রোগ নির্ণয় না করে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
সিলেটে হাম ও ডেঙ্গুর একসঙ্গে বিস্তার এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন বর্ষা-পরবর্তী পরিবেশে মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই স্বাস্থ্য বিভাগকে সতর্ক থাকতে হয়। একই সঙ্গে হাম নিয়ে দীর্ঘদিনের সংক্রমণ পরিস্থিতি পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের জায়গা হয়ে উঠেছে শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা। একের পর এক শিশু হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। এমন পরিস্থিতিতে আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত চিকিৎসার পাশাপাশি রোগের বিস্তার ঠেকাতে জনসচেতনতা, নজরদারি ও প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সিলেট বিভাগের সর্বশেষ স্বাস্থ্যচিত্র তাই কেবল নতুন রোগীর সংখ্যা দিয়ে বিবেচনার বিষয় নয়। হাম ও ডেঙ্গু—দুই রোগের সংক্রমণ একসঙ্গে চলতে থাকায় পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ, হাসপাতালগুলোর প্রস্তুতি এবং প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ আরও কার্যকর রাখার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে। স্বাস্থ্য বিভাগের পরবর্তী প্রতিবেদনগুলোতে নতুন শনাক্ত রোগী, হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর সংখ্যার পরিবর্তন পরিস্থিতির গতিপ্রকৃতি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।


