সাইবার আইনের খসড়ায় বাকস্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

বাংলাদেশের প্রস্তাবিত ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া নিয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং মানবাধিকারের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংগঠন। তাদের বক্তব্য, প্রস্তাবিত কয়েকটি বিধান অনলাইনে মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি করতে পারে এবং অস্পষ্ট কিছু শব্দের কারণে আইনের অপব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে।

তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি এখনো চূড়ান্ত আইন নয়। সেপ্টেম্বর মাসে সরকার খসড়াটি জনসাধারণের মতামতের জন্য প্রকাশ করেছে এবং বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নেওয়া হচ্ছে। ফলে খসড়ায় থাকা কোনো প্রস্তাবকে বর্তমানে কার্যকর আইন হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

সাইবার অপরাধ মোকাবিলা, ডিজিটাল নিরাপত্তা জোরদার এবং নাগরিকের তথ্য ও গোপনীয়তা রক্ষার জন্য কার্যকর আইন প্রয়োজন—এ বিষয়ে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে মূলত মতভেদ নেই। বিতর্কের জায়গাটি তৈরি হয়েছে আইন প্রয়োগের পরিধি, অপরাধের সংজ্ঞা, শাস্তির মাত্রা এবং অনলাইন কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা নিয়ে।

প্রস্তাবিত সংশোধনীর বিষয়ে উদ্বেগ জানানো সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে সিভিকাস, রবার্ট এফ কেনেডি হিউম্যান রাইটস, ফ্রন্ট লাইন ডিফেন্ডার্স এবং সাউথ এশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস। তাদের যৌথ অবস্থানের পাশাপাশি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশও খসড়াটির কয়েকটি বিধান নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে। টিআইবি বলেছে, খসড়ায় সাইবার অপরাধ, সাইবার নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের অধিকার—তিনটি ভিন্ন বিষয়কে একই আইনের কাঠামোর মধ্যে রাখা হয়েছে এবং কিছু বিধানের অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

খসড়াটি নিয়ে বিতর্কের অন্যতম বিষয় হলো ‘গুজব’, ‘অপতথ্য’, ‘মানহানি’, ‘অপমান’, ‘বুলিং’সহ বিভিন্ন শব্দের ব্যবহার। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বক্তব্য, এসব শব্দের সুনির্দিষ্ট ও যথেষ্ট পরিষ্কার সংজ্ঞা না থাকলে কোন বক্তব্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে, তা নিয়ে ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তাদের আশঙ্কা, এই ধরনের অস্পষ্টতা ভবিষ্যতে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যার জন্ম দিতে পারে।

প্রস্তাবিত সংশোধনীতে অনলাইনে গুজব ও অপতথ্য প্রকাশ বা ছড়িয়ে দেওয়াকে নতুন অপরাধ হিসেবে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। প্রকাশিত খসড়ার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত ধারা ২৬এ-তে এ ধরনের অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড, ৪০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ ধরনের শাস্তির বিধান নিয়ে উদ্বেগের জায়গাটি হলো, কোনো তথ্য সত্য, মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর বা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কি না—তা নির্ধারণের প্রক্রিয়া কতটা স্পষ্ট হবে। বিশেষ করে সাংবাদিকতা, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বা জনস্বার্থের তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে ভুল তথ্য ও ইচ্ছাকৃত মিথ্যা তথ্যের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

প্রস্তাবিত পরিবর্তনে মানহানি, অপমান বা বুলিংয়ের মতো বিষয়ও অনলাইন আচরণের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। দ্য ডেইলি স্টারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এসব পরিবর্তনের কিছু অংশ আগের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সমালোচিত বিধানগুলোর সঙ্গে সাদৃশ্য তৈরি করেছে।

এ কারণেই মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো বিষয়টিকে শুধু সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে মৌলিক অধিকার ও আইন প্রয়োগের ভারসাম্যের প্রশ্ন হিসেবে দেখছে। তাদের বক্তব্য, সাইবার অপরাধ দমন করতে গিয়ে যেন বৈধ মতপ্রকাশ, সাংবাদিকতা বা জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশ বাধাগ্রস্ত না হয়।

অন্যদিকে সরকার বলছে, প্রস্তাবিত আইনের উদ্দেশ্য মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বা গণমাধ্যমকে দমন করা নয়। ১০ সেপ্টেম্বর তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে খসড়াটি নিয়ে আয়োজিত পরামর্শ সভায় তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালীব রহমান বলেন, মুক্তচিন্তা, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বা সাংবাদিকদের দমনের উদ্দেশ্যে কোনো আইন করা হচ্ছে না। একই সঙ্গে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের, শিশুদের ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের হয়রানি এবং ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে ক্ষতিকর কনটেন্ট ছড়ানোর মতো বিষয় নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন।

ওই পরামর্শ সভায় সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি এবং সাংবাদিক সংগঠনের নেতারা অংশ নেন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সেখানে খসড়ার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা ও মতামত গ্রহণ করা হয়।

এর আগে সরকার খসড়াটি পর্যালোচনা ও চূড়ান্ত করার জন্য একটি মন্ত্রিসভা কমিটিও গঠন করে। জুলাইয়ে গঠিত পাঁচ সদস্যের ওই কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। কমিটির কাজ হচ্ছে খসড়াটি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ দেওয়া।

জুলাইয়ে কমিটির বৈঠকে খসড়ার বিভিন্ন ধারা নিয়ে আলোচনা হয় এবং প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে আইনকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা, সাইবার নিরাপত্তা জোরদার এবং নাগরিকের অধিকার সুরক্ষার বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়ার কথা জানানো হয়। আরও পর্যালোচনার পর খসড়া চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

এদিকে, প্রস্তাবিত আইনে অনলাইন কনটেন্ট অপসারণ বা ব্লক করার কাঠামো নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সমালোচকদের উদ্বেগ হলো, কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা বাড়ানো হলে সেটির ব্যবহার কীভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে এবং সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নাগরিকের প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ কতটা কার্যকর থাকবে—এসব বিষয় আইনে স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।

সাইবার নিরাপত্তা আইন নিয়ে বর্তমান বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আইনটি কোন পর্যায়ে রয়েছে। ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল সাইবার সুরক্ষা আইন প্রণীত হওয়ার পর ১ জুলাই পৃথক একটি সংশোধনী আইন করা হয়। এরপর সেপ্টেম্বরে আরও কিছু পরিবর্তনের প্রস্তাবসহ নতুন খসড়া প্রকাশ করা হয়েছে। অর্থাৎ সেপ্টেম্বরের এই খসড়া এখনো প্রস্তাবের পর্যায়েই রয়েছে এবং মতামত গ্রহণের পর এর বিধান পরিবর্তিত হতে পারে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, নতুন খসড়া প্রণয়নের ক্ষেত্রে সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, সুশীল সমাজসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাদের মতে, অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে আইন তৈরি হলে সাইবার অপরাধ মোকাবিলা এবং মৌলিক অধিকার সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য রাখা সহজ হবে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশও খসড়াটি সংশোধনের আগে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনদের মতামত এবং আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে।

অন্যদিকে সরকারের সামনে এখন দুটি বিষয় একসঙ্গে নিশ্চিত করার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একদিকে দ্রুত পরিবর্তনশীল ডিজিটাল পরিবেশে সাইবার অপরাধ, অনলাইন হয়রানি, প্রতারণা ও ক্ষতিকর কনটেন্ট মোকাবিলার জন্য কার্যকর আইনি কাঠামো প্রয়োজন। অন্যদিকে সেই কাঠামো প্রয়োগের সময় যেন বৈধ মতপ্রকাশ, সংবাদ সংগ্রহ ও জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশ অযথা বাধাগ্রস্ত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

শেষ পর্যন্ত প্রস্তাবিত সংশোধনী কোন রূপ পাবে, তা নির্ভর করবে পরামর্শ প্রক্রিয়া, সরকারি পর্যালোচনা এবং পরবর্তী আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার ওপর। তাই বর্তমান সময়ে খসড়াটিকে চূড়ান্ত আইন হিসেবে নয়, বরং আলোচনাধীন একটি প্রস্তাব হিসেবেই দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সাইবার নিরাপত্তা—দুই ক্ষেত্রেই নাগরিকের অধিকার এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তার প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে তৈরি করা যায়, সেটিই এই আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে থাকছে।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

প্রাথমিকে বঞ্চিত ৮১৭ জনের নিয়োগ ১ অক্টোবরের মধ্যে

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

আন্দোলনের মধ্যে সিকৃবিতে নতুন উপাচার্য শফি উল্লাহ

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

দুই হাজার ছাড়াল এলপিজির দাম, বাড়ছে ভোক্তার চাপ

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শাবিপ্রবির পূর্ণ অধিভুক্তির দাবিতে উত্তাল সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে হাম-ডেঙ্গুর একসঙ্গে বিস্তার, বাড়ছে হাসপাতালের চাপ

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

প্রাথমিকে বঞ্চিত ৮১৭ জনের নিয়োগ ১ অক্টোবরের মধ্যে

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

আন্দোলনের মধ্যে সিকৃবিতে নতুন উপাচার্য শফি উল্লাহ

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

দুই হাজার ছাড়াল এলপিজির দাম, বাড়ছে ভোক্তার চাপ

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শাবিপ্রবির পূর্ণ অধিভুক্তির দাবিতে উত্তাল সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে হাম-ডেঙ্গুর একসঙ্গে বিস্তার, বাড়ছে হাসপাতালের চাপ

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

মাদ্রাসায় যাওয়ার পথে সিলেটে কিশোর নিখোঁজ

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শাহজালাল মাজারের কমিটি বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ