প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে একটি বাড়ির আঙিনায় বিশাল আকৃতির অজগর সাপ দেখতে পেয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে স্থানীয়দের মধ্যে। বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) উপজেলার সিরাজনগর লামুয়া এলাকার কদর আলী মেম্বারের বাড়ির আঙিনায় প্রায় ১৮ ফুট লম্বা অজগরটি দেখতে পান স্থানীয়রা। পরে খবর পেয়ে বন্যপ্রাণী উদ্ধারকারী একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে সাপটিকে নিরাপদে উদ্ধার করে বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করে।
বাড়ির একেবারে কাছাকাছি এমন বিশাল আকৃতির অজগরের উপস্থিতি স্থানীয়দের জন্য ছিল বেশ উদ্বেগের। হঠাৎ করে আঙিনায় দীর্ঘদেহী সাপটি দেখতে পেয়ে অনেকেই প্রথমে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তবে স্থানীয়রা সেটিকে মেরে ফেলার পরিবর্তে উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়ায় অজগরটি শেষ পর্যন্ত অক্ষত অবস্থায় নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার বাড়ির আঙিনায় অজগরটি দেখতে পান কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা। সাপটির আকার দেখে তাঁরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেন এবং দ্রুত আব্দুল মজিদ নামে এক ব্যক্তিকে খবর দেন। পরে তিনি বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। খবর পাওয়ার পর সংগঠনটির সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান।
পরে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল এবং পরিবেশকর্মী রাজদীপ দেব দীপ ঘটনাস্থলে গিয়ে অজগর উদ্ধারের কার্যক্রম শুরু করেন। স্থানীয়দের সহযোগিতায় সতর্কতার সঙ্গে সাপটিকে নিয়ন্ত্রণে এনে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারের সময় অজগরটির কোনো ক্ষতি হয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
উদ্ধার কার্যক্রমের সময় বন বিভাগের চাউতলি বিট কর্মকর্তা সুব্রত সরকারও ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। বন্যপ্রাণী উদ্ধারকারীদের সঙ্গে সমন্বয় করে সাপটির নিরাপদ উদ্ধার ও পরবর্তী ব্যবস্থাপনার বিষয়টি তদারক করা হয়।
বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল জানান, অজগরটির বিষয়ে খবর পাওয়ার পর তাঁরা দ্রুত ঘটনাস্থলে যান। সেখানে গিয়ে সাপটিকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়। পরে সেটি বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
উদ্ধারের পর প্রায় ১৮ ফুট লম্বা অজগরটিকে শ্রীমঙ্গল বন বিভাগের রেঞ্জ কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে সাপটি আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়। বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, অজগরটি সুস্থ রয়েছে এবং সেটিকে উপযুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশে ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের শ্রীমঙ্গল রেঞ্জ কর্মকর্তা কাজী নাজমুল হক বলেন, ১৮ ফুট লম্বা অজগরটি সুস্থ অবস্থায় তাঁদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পরে সেটিকে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে অবমুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
শ্রীমঙ্গলের সিরাজনগর লামুয়া এলাকায় বাড়ির আঙিনা থেকে এমন বড় অজগর উদ্ধারের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে যেমন কৌতূহল তৈরি হয়েছে, তেমনি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সাধারণত বনাঞ্চলসংলগ্ন এলাকায় মানুষের বসতি বিস্তৃত হওয়া, খাদ্যের সন্ধানে বন্যপ্রাণীর বিচরণ এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থলের সঙ্গে মানুষের বসতির দূরত্ব কমে আসার কারণে বিভিন্ন সময়ে বন্যপ্রাণী লোকালয়ে চলে আসতে পারে।
অজগর বিষধর সাপ নয়। এটি শিকারকে পেঁচিয়ে ধরে শ্বাসরোধ করে শিকার করে। আকারে বড় হওয়ায় মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই ভয় তৈরি হতে পারে। তবে কোনো বন্যপ্রাণী লোকালয়ে চলে এলে আতঙ্কিত হয়ে সেটিকে হত্যা না করে সংশ্লিষ্ট বন বিভাগ বা প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী দলের সহায়তা নেওয়াই নিরাপদ ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ।
শ্রীমঙ্গলের এই ঘটনায় স্থানীয়দের সেই সচেতনতার একটি দৃষ্টান্ত দেখা গেছে। বিশাল আকৃতির অজগরটি দেখতে পেয়ে অনেকে আতঙ্কিত হলেও সেটিকে আঘাত না করে দ্রুত সংশ্লিষ্টদের খবর দেওয়া হয়। এর ফলে সাপটিকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করে আবারও তার প্রাকৃতিক আবাসস্থলে ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান শ্রীমঙ্গলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক বনাঞ্চল। এই অঞ্চলের বন ও আশপাশের পরিবেশ নানা ধরনের বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। সেখানে অজগরসহ বিভিন্ন সরীসৃপের বিচরণও রয়েছে। উদ্ধার হওয়া অজগরটিকে বনাঞ্চলে অবমুক্ত করা হলে সেটি আবারও প্রাকৃতিক পরিবেশে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পাবে।
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে এমন উদ্ধার ও অবমুক্ত কার্যক্রমের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি। বিশেষ করে বনাঞ্চলের কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষেরা বাড়ির আশপাশে কোনো বন্যপ্রাণী দেখতে পেলে সেটিকে ধরতে বা আঘাত করতে না গিয়ে দ্রুত বন বিভাগকে জানালে প্রাণী ও মানুষের উভয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।
একটি বড় অজগরের বাড়ির আঙিনায় চলে আসার ঘটনাটি স্থানীয়দের জন্য আকস্মিক হলেও এর শেষ হয়েছে ইতিবাচকভাবে। মানুষের আতঙ্ককে নিয়ন্ত্রণে রেখে সময়মতো উদ্যোগ নেওয়া এবং বন্যপ্রাণীকে নিরাপদে উদ্ধার করার কারণে প্রাণীটি প্রাণে বেঁচেছে। এখন বন বিভাগের পরিকল্পনা অনুযায়ী সেটিকে প্রাকৃতিক পরিবেশে ফিরিয়ে দেওয়া হলে শ্রীমঙ্গলের বনভূমিতে আরও একটি বন্যপ্রাণী তার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পাবে।
প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থান নিশ্চিত করতে এমন দায়িত্বশীল আচরণ গুরুত্বপূর্ণ। লোকালয়ে বন্যপ্রাণীর উপস্থিতি কখনো আতঙ্কের কারণ হলেও প্রতিটি ঘটনার সমাধান যে প্রাণী হত্যার মাধ্যমে করতে হবে, তা নয়। প্রয়োজন সচেতনতা, দ্রুত যোগাযোগ এবং প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারীদের সহায়তা। শ্রীমঙ্গলের এই অজগর উদ্ধারের ঘটনাটি সেই বার্তাই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।


