জাফলংয়ে তরুণী হত্যা মামলায় দুজনের মৃত্যুদণ্ড

প্রকাশ:  ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলংয়ে গার্মেন্টকর্মী রুনা আক্তার সাথী হত্যা মামলায় তাঁর সাবেক স্বামীসহ দুজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে দণ্ডপ্রাপ্ত প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই মামলার রায়ে বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ তৃতীয় আদালত এ সিদ্ধান্ত দেন।

রায় ঘোষণা ঘিরে আদালত প্রাঙ্গণে মামলাটির দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া আবারও আলোচনায় আসে। আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, রায় ঘোষণার সময় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুজনই আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। তাঁদের অনুপস্থিতিতেই বিচারক শেখ নাজমুন নাহার রায় ঘোষণা করেন। আদালতের বেঞ্চ সহকারী মো. কবীর হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুজন হলেন গাজীপুরের জয়দেবপুরের বুরুলিয়া গ্রামের মুছা খানের ছেলে নাজমুল হাসান খান (২৩) এবং শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার লংপাড়া হাওলাচর গ্রামের আদম আলীর ছেলে সুজন মিয়া (২০)। মামলার নথি ও আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নিহত রুনা আক্তার সাথীর সঙ্গে নাজমুল হাসান খানের পরিচয়, প্রেম, বিয়ে, সন্তান এবং পরবর্তী বিচ্ছেদের ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়েই মামলাটির পটভূমি তৈরি হয়।

রুনা আক্তার সাথীর বাড়ি ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার আসারগাঁও এলাকায়। জীবিকার তাগিদে তিনি গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। সেখানেই তাঁর পরিচয় হয় একটি বাসের হেলপার হিসেবে কর্মরত নাজমুল হাসান খানের সঙ্গে। পরিচয় থেকে ধীরে ধীরে তাঁদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে তাঁরা বিয়ে করেন।

বিয়ের পর তাঁদের একটি ছেলে সন্তান জন্ম নেয়। কিন্তু সন্তান জন্মের পর থেকেই পারিবারিক জীবনে নানা জটিলতা তৈরি হয় বলে মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে। নাজমুল তাঁদের সন্তানকে তাঁর বন্ধু সুজন মিয়ার ফুফুর কাছে দত্তক দেন। সন্তানকে অন্যের কাছে দেওয়ার বিষয়টি সাথীর সঙ্গে তাঁর স্বামীর সম্পর্কে বিরোধের সৃষ্টি করে। নিজের সন্তানকে ফিরে পাওয়ার জন্য সাথী একাধিকবার চেষ্টা করেও সফল হননি বলে মামলার নথিতে বলা হয়েছে।

সন্তানকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই বিরোধ শেষ পর্যন্ত তাঁদের দাম্পত্য সম্পর্কে গভীর সংকট তৈরি করে। একপর্যায়ে নাজমুল ও সাথীর বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। কিন্তু বিচ্ছেদের পরও তাঁদের মধ্যকার পুরোনো বিরোধ পুরোপুরি শেষ হয়নি বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

মামলার নথি অনুযায়ী, বিবাহবিচ্ছেদের পরও নাজমুল হাসান খান গার্মেন্টে যাতায়াতের পথে সাথীকে বিরক্ত করতেন। পরে ছেলের সঙ্গে দেখা করিয়ে দেওয়ার কথা বলে ২০১০ সালের ১২ মে সাথীকে সিলেটে নিয়ে আসেন নাজমুল। সিলেটে আসার পরের দিন অর্থাৎ ১৩ মে তাঁকে জাফলংয়ের সোনাটিলা ফরেস্ট এলাকার একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয় বলে মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, ওই নির্জন এলাকায় নাজমুল ও তাঁর বন্ধু সুজন মিয়া সাথীকে হত্যা করেন। ঘটনাটি ছিল ১৯ বছরের এক তরুণীর জীবনের আকস্মিক ও মর্মান্তিক সমাপ্তি। সন্তানকে ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং পরিচিত মানুষের ওপর আস্থার জায়গা থেকেই তিনি সিলেটে এসেছিলেন বলে মামলার ঘটনাপ্রবাহে উঠে এসেছে। কিন্তু সেই যাত্রার পর তাঁর আর বাড়ি ফেরা হয়নি।

ঘটনার পর তিন দিন পেরিয়ে যায়। ১৫ মে নিহত সাথীর বাবা নাজমুল হক গোয়াইনঘাট থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। মেয়ের নিখোঁজ হওয়া এবং পরবর্তী সময়ে তাঁর হত্যার ঘটনায় পরিবারটি যে অনিশ্চয়তা ও শোকের মধ্য দিয়ে যায়, মামলার দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় সেই ঘটনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

মামলা দায়েরের পর পুলিশ তদন্ত শুরু করে। তদন্তের একপর্যায়ে নাজমুল হাসান খানকে গ্রেপ্তার করা হয়। মামলার নথি অনুযায়ী, পরে তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। ওই জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্ত শেষে ২০১১ সালের ৩১ জানুয়ারি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক শহীদুল্লাহ নাজমুল হাসান খান ও সুজন মিয়ার বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এর মাধ্যমে মামলাটি বিচারিক পর্যায়ে প্রবেশ করে। পরবর্তী সময়ে মামলার শুনানি ও সাক্ষ্যগ্রহণের প্রক্রিয়া চলতে থাকে।

মামলাটির বিচার শেষ হতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। আদালতে মোট ১০ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। সাক্ষীদের বক্তব্য, মামলার নথি এবং অন্যান্য উপস্থাপিত তথ্য পর্যালোচনা শেষে আদালত বুধবার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে নাজমুল হাসান খান ও সুজন মিয়াকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। পাশাপাশি তাঁদের প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে।

তবে রায় ঘোষণার সময় দুই আসামিই আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। তাঁদের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য জানা যায়নি। ফলে রায় ঘোষণার পর তাঁদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া কীভাবে এগোয়, সেদিকেও নজর থাকবে।

দীর্ঘদিন ধরে চলা একটি হত্যা মামলায় রায় ঘোষণার বিষয়টি নিহতের পরিবার ও সংশ্লিষ্টদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ২০১০ সালে ঘটে যাওয়া হত্যাকাণ্ডের বিচারিক প্রক্রিয়া এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলেছে। এই সময়ে মামলার সাক্ষ্য, তদন্ত, আসামিদের অবস্থান এবং আদালতের বিভিন্ন কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে বিচার এগিয়েছে। শেষ পর্যন্ত আদালতের রায়ের মাধ্যমে মামলাটির বিচারিক পর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ শেষ হলো।

মামলার ঘটনাপ্রবাহে পারিবারিক সম্পর্ক, সন্তানকে ঘিরে বিরোধ এবং বিচ্ছেদের পরবর্তী পরিস্থিতির বিষয়গুলো বিশেষভাবে উঠে এসেছে। একটি সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পরও যদি বিরোধ ও যোগাযোগের জটিলতা থেকে যায়, তা কখনো কখনো ভয়াবহ পরিণতির দিকে যেতে পারে—এই মামলার ঘটনাও সেই বাস্তবতার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে সামনে এসেছে। তবে হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ও প্রত্যেক আসামির ভূমিকা আদালতের নথি ও সাক্ষ্য-প্রমাণের আলোকে বিবেচিত হয়েছে।

নিহত সাথীর বয়স ছিল মাত্র ১৯ বছর। কর্মজীবনের শুরুতেই তাঁর জীবন থেমে যায়। পরিবার ও স্বজনদের কাছে তাঁর অনুপস্থিতি শুধু একজন মানুষের মৃত্যু নয়, বরং দীর্ঘ সময় ধরে বয়ে বেড়ানো এক শোকেরও নাম। তাঁর সন্তান তখনও ছোট ছিল। সন্তানকে ফিরে পাওয়ার চেষ্টা থেকেই যে পারিবারিক বিরোধের সূত্রপাত হয়েছিল বলে মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে, সেই সন্তানের জীবনেও এই হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়ার বিষয়টি মানবিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে রাষ্ট্রপক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) আল আসলাম মুমিন। আসামিপক্ষে আইনজীবী হিসেবে ছিলেন ফারহানা হাবিব চৌধুরী। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার পর উভয় পক্ষের বক্তব্য ও উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ বিবেচনায় নিয়ে আদালত রায় ঘোষণা করেন।

আইনগতভাবে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পরও বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে শেষ হয়ে যায় না। দণ্ড কার্যকর হওয়ার আগে প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ায় পরবর্তী ধাপ সম্পন্ন হওয়ার বিষয় থাকে। ফলে বুধবারের রায় মামলাটির বিচারিক প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলেও এর পরবর্তী আইনগত কার্যক্রমও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।

জাফলংয়ের একটি নির্জন এলাকায় ১৯ বছর বয়সী তরুণীর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দীর্ঘদিন পর আদালতের এই রায় স্থানীয়ভাবেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পরিবারের জন্য এটি বহু বছরের অপেক্ষার পর পাওয়া একটি বিচারিক সিদ্ধান্ত। একই সঙ্গে এই মামলার ঘটনাপ্রবাহ আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, পারিবারিক বিরোধ বা সম্পর্কের সংকট কখনো যেন সহিংসতায় রূপ না নেয়, সে বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা ও আইনগত প্রতিকার কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

আদালতের রায়ের মধ্য দিয়ে এখন মামলাটির পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া এগিয়ে যাবে। দীর্ঘ ১৬ বছরেরও বেশি সময় আগে ঘটে যাওয়া সেই হত্যাকাণ্ডে আদালতের সিদ্ধান্তের পর সংশ্লিষ্টদের নজর এখন দণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামির অবস্থান এবং পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের দিকে।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

জাফলং থেকে ফেরার পথে পর্যটক হয়রানি, ৪ পুলিশ বরখাস্ত

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ভাইরাল অডিওর পর ডিবিতে ক্যান্টনমেন্ট থানার সাবেক ওসি

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ছেলের মুখ দেখার আগেই সৌদিতে প্রাণ গেল মতিউরের

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সর্বজনীন পেনশনে মুনাফা বাড়ল, নমিনির সুবিধাও

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শ্রীমঙ্গলে বাড়ির আঙিনায় ১৮ ফুটের অজগর

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

জাফলং থেকে ফেরার পথে পর্যটক হয়রানি, ৪ পুলিশ বরখাস্ত

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ভাইরাল অডিওর পর ডিবিতে ক্যান্টনমেন্ট থানার সাবেক ওসি

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ছেলের মুখ দেখার আগেই সৌদিতে প্রাণ গেল মতিউরের

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সর্বজনীন পেনশনে মুনাফা বাড়ল, নমিনির সুবিধাও

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শ্রীমঙ্গলে বাড়ির আঙিনায় ১৮ ফুটের অজগর

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সর্বজনীন পেনশনে বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বাংলাদেশ-ফ্রান্স সম্পর্ক জোরদারে নতুন উদ্যোগ

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর  ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

হাতিয়ায় বিশাল শাপলা পাতা মাছ বিক্রি ৮২ হাজার টাকায়

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ