প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট বিভাগে হামের উপসর্গ নিয়ে শিশু মৃত্যুর ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে বিভাগে হাম ও হামের উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬৮ জনে। একই সময়ে নতুন করে ১৯৩ জন রোগী হামের উপসর্গ নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ফলে বিভাগজুড়ে রোগীর চাপ যেমন বাড়ছে, তেমনি শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। মৃত শিশুদের বয়স সাড়ে সাত মাস থেকে তিন বছর আট মাসের মধ্যে। তাদের মধ্যে দুজনের বাড়ি সুনামগঞ্জে এবং অপর শিশুটির বাড়ি মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ এলাকায়। চিকিৎসকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মৃত শিশুরা হামের উপসর্গের পাশাপাশি অপুষ্টি ও বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিল।
শিশুদের মৃত্যু শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, প্রতিটি মৃত্যুর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের দীর্ঘদিনের আশা, উদ্বেগ ও অসহায়তার গল্প। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে গুরুতর অসুস্থ শিশুদের যখন উন্নত চিকিৎসার জন্য বিভাগীয় পর্যায়ের হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়, তখন অনেক ক্ষেত্রেই রোগের পাশাপাশি অপুষ্টি ও অন্যান্য শারীরিক জটিলতা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে। চিকিৎসকদের মতে, শিশুদের শারীরিক সক্ষমতা কম থাকলে সংক্রমণজনিত অসুস্থতা দ্রুত জটিল আকার ধারণ করতে পারে।
বুধবার ১৬ সেপ্টেম্বর সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় থেকে প্রকাশিত হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া নতুন রোগীর সংখ্যা ১৯৩ জন। এর মধ্যে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ৬২ জন, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৭১ জন, রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চারজন, নর্থ ইস্ট হাসপাতালে ছয়জন এবং পার্কভিউ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চারজন রোগী ভর্তি হয়েছেন।
এ ছাড়া বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঁচজন, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চারজন, ধর্মপাশায় একজন, সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ২৫ জন এবং মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ১১ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এসব হাসপাতালে নতুন রোগী ভর্তির তথ্য থেকে বোঝা যায়, হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষের চাপ শুধু সিলেট নগরীর হাসপাতালগুলোতেই সীমাবদ্ধ নেই; বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য।
বর্তমানে বিভাগীয় পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে ১৯২ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন আরও ১৫৪ জন। রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১২ জন, নর্থ ইস্ট হাসপাতালে ১৩ জন এবং পার্কভিউ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩০ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সব মিলিয়ে বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা পাঁচ শতাধিক।
চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুবরণ করা শিশুদের একটি বড় অংশ সুনামগঞ্জ ও সিলেটের প্রত্যন্ত এলাকার। দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের পরিবারগুলোর জন্য শিশুর অসুস্থতার শুরুতেই পর্যাপ্ত চিকিৎসা নিশ্চিত করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হওয়া বা শরীরে র্যাশের মতো উপসর্গ দেখা দেওয়ার পরও কোনো কোনো ক্ষেত্রে হাসপাতালে পৌঁছাতে সময় লেগে যায়। এর সঙ্গে যদি অপুষ্টি বা অন্য কোনো শারীরিক জটিলতা থাকে, তাহলে শিশুর অবস্থা দ্রুত অবনতির আশঙ্কা থাকে।
স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতিবেদনে জেলার ভিত্তিতে মৃত্যুর চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, সিলেট জেলায় সন্দেহজনক হামে এ পর্যন্ত ৬৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে চারজনের মৃত্যু নিশ্চিত হামে হয়েছে। হবিগঞ্জে সন্দেহজনক মৃত্যু হয়েছে ১৯ জনের এবং নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে চারজনের। মৌলভীবাজারে সন্দেহজনক মৃত্যুর সংখ্যা ১৪ এবং নিশ্চিত মৃত্যু একজনের। অন্যদিকে সুনামগঞ্জে সন্দেহজনক হামে মৃত্যুর সংখ্যা ৬২ এবং নিশ্চিত মৃত্যু একজনের।
এই পরিসংখ্যানের মধ্যে সন্দেহজনক ও নিশ্চিত মৃত্যুর পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। হামের উপসর্গ থাকা সব মৃত্যুই পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হাম হিসেবে গণ্য হয় না। তাই স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতিবেদনে সন্দেহজনক ও নিশ্চিত মৃত্যুর তথ্য আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের ক্ষেত্রেও হামের উপসর্গের ভিত্তিতে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। ফলে মোট মৃত্যুর সংখ্যা এবং পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া হামে মৃত্যুর সংখ্যা এক নয়।
স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিশুদের হাম থেকে সুরক্ষায় নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর নির্ধারিত বয়সে প্রয়োজনীয় টিকা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অসুস্থ শিশুর ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার পরিবারগুলোকে হাম বা হামের মতো উপসর্গ দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা না করে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করতে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
হাম একটি সংক্রামক রোগ হওয়ায় আক্রান্ত শিশুর আশপাশের অন্য শিশুদের মধ্যেও সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ কারণে আক্রান্ত বা উপসর্গযুক্ত শিশুকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার আওতায় আনার পাশাপাশি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক রোগী ভর্তি হওয়ায় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির পাশাপাশি মা ও শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করার বিষয়েও কাজ করা হচ্ছে। কারণ শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা শক্তিশালী রাখতে পর্যাপ্ত পুষ্টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের সংক্রমণজনিত জটিলতার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে বলে চিকিৎসকেরা মনে করেন।
সিলেট বিভাগে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও তিন শিশুর মৃত্যু এবং প্রায় দুইশ নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনায় পরিস্থিতির গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার শিশুদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা, টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা এবং পরিবারগুলোকে সচেতন করার পাশাপাশি শিশু ও মায়েদের পুষ্টি নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পাঁচ শতাধিক রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকায় পরিস্থিতি মোকাবিলায় চিকিৎসাসেবা ও নজরদারি অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।


